নেপালে বন্যায় নিহত ‘৬২, নিখোঁজ ৪০০

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : আগস্ট ২৭, ২০২৬

নেপালে বন্যায় ১৬২ জন নিহত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে চারশো মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। বুধবার সকালে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় দেশটির ৩টি জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লহেন্দে নদীর প্রবাহ একটি তুষারধসে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপে আটকে যায়। পরে সেই পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত ভোতেকোশি নদীতে নেমে বন্যার সৃষ্টি করে। ওই এলাকায় বৃষ্টিপাত না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো আগাম সতর্কতা পায়নি।

রাসুয়া জেলার তিমুরে বাজারে প্রথম আঘাত হানে বন্যার স্রোত। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, মুহূর্তের মধ্যেই বাজারের বড় একটি অংশ পানির তোড়ে ভেসে যায়। সীমান্তের কাস্টমস চেকপোস্টে অপেক্ষমাণ ৩০০টির বেশি গাড়ি ও ট্রাকও বন্যার পানিতে ভেসে যায়।

রাসুয়া জেলার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা বলেন, “সকালে মাটি কাঁপতে দেখে প্রথমে আমি ভূমিকম্প হয়েছে বলে মনে করেছিলাম। বাইরে বের হয়ে উজান থেকে ধেয়ে আসা বিশাল পানির দেয়াল দেখতে পাই। পানির ঢেউ প্রায় ১০০ মিটার উঁচু মনে হচ্ছিল এবং চোখের সামনে বাজারটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।”

বন্যার স্রোত তীব্র হয়ে আরও নিচের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ বিদেশি নাগরিক ও ৪৪ নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে।

বন্যায় অন্তত ৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৯টি শাখা ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।

নুওয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল বলেন, “সোলে থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত শত শত ঘরবাড়ি বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে যেতে পারলেও বহু শিশু ও প্রবীনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, অনেক এলাকায় রাস্তা ও সেতু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ জলবিদ বিনোদ পরাজুলি বলেন, “বুধবার সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে বন্যার তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছায়। এরপর মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে নিম্নবর্তী এলাকাগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। তবে ততক্ষণে বন্যা রাসুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছে গেছে।”

ভোতেকোশি নদীর উজানে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় বন্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোও পানির তোড়ে ভেসে যায়। ফলে নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করলেও সেগুলো কোনো সতর্কবার্তা পাঠাতে পারেনি।

পরাজুলি আরও বলেন, “রাসুয়ায় সময়মতো সতর্কতা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে নুওয়াকোটসহ নদীর নিম্নাঞ্চলে পাঠানো সতর্কবার্তার কারণে কয়েকশ মানুষ নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।”

বন্যার পর নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের কর্মকর্তারা বুধবার বিকেলে ভার্চুয়াল বৈঠক করে। বৈঠকের পর চীন নেপালকে জানিয়েছে, সীমান্তের চীনা অংশে নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে তারা দ্রুত নেপালকে তথ্য দেবে।

নেপাল ও চীনের মধ্যে দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো ও জরুরি পরিস্থিতিতে সহযোগিতার বিষয়ে ২০১৯ সালে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে তথ্য আদান-প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কার্যক্রমে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল।

তবে বুধবারের ভয়াবহ বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, কাগজে-কলমে চুক্তি থাকলেও সীমান্তপারের দুর্যোগ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। সূত্র: কাঠামান্ডু পোস্ট