সংগৃহীতঃ ডনারা মাঙ্ক
ফিরে আয় কালাচান
জুয়েল মাজহারপ্রকাশিত : এপ্রিল ০৭, ২০১৮
১.
আগুনে শান দেয়া একটি তলোয়ার
আকাশে মেঘেদের করছে ফালি ফালি
--বাষ্প দিয়ে গড়া যেন বা তরমুজ!
দুপুরে হাওরের ঈশানে-নৈঋতে
পরেছে লাল জামা বিপুল রোদগুলি;
পরেছে জড়ি আর সোনালি আঙ্রাখা
ডালেতে ঘুঘু এক ডাকছে উদাসীন
জলের কৈতর উড়ছে দিশাহীন;
একটি টিট্টিভ এসব দ্যাখে আর
লেজের বৈঠায় বাতাসে ঢেউ তোলে।
একপা তুলে তার নাচল দইগল।
ক্ষেতের আল ঘেঁষে বসল বাপ-বেটা;
একটু আগে তারা জমিতে হাল চষে
জমিতে মই দিয়ে হিদলভর্তায়
মাখিয়ে ডাল-ভাত খেয়েছে পেটপুরে
এখন হুকাটিতে সাজিয়ে তাম্বুক
ফাটিয়ে কলকেটা টানছে দমে দম
হাওয়ায় উড়ছে ধোঁয়ার মাশরুম!
নেত্রকোণা আর সুনামগঞ্জের
খাইল্যাজুড়ি আর ইটনা মদনের
হাওর-বাওরেতে আফাল গর্জায়!
বুইত্তামারা ঢেউ দেখলে ডর লাগে!
রূপালি পেটি আর চ্যাপ্টা লেজ নেড়ে
চিতল-বোয়ালেরা হিজল-ক্যানোপির
নিচে যে টলটলে রয়েছে বুকজল
চলেছে তাকে চিরে; আহা কী মসৃণ!
এদিকে দলছুট একটি মহা শোল
পাহাড়ি নদীটির অতলে ডুব দিয়ে
----যেনবা ধ্যানযোগ----করছে শবাসন
জেলেটি টেঁটা হাতে ধরতে চায় তাকে; কিন্তু পারবে না!
ডিঙ্গাপোতা নদী, মগরা, ধনুগাঙ
নৌকা সারি সারি সেসবে ভেসে যায়
দু্ইটা ব্যাটাছেলে সামনে ঝুঁকে ধীরে
চলেছে গুন টেনে। কাছেই বিরিশিরি
মাঝিরা গলা ছেড়ে গাইছে ভাটিয়ালি;
দূরেতে আড়বাঁশি করছে দিগদারি;
তাতে কি আউলায় কাহারো রান্ধন?
খিড়কি খুলে যায়্। হঠাৎ মন ডাকে:
‘থামা রে বাঁশি তোর নিঠুর কালাচান !’
সিনান করবার ঠুনকো অছিলায়
বউটি জলে নেমে শরীর রগড়ায়
গতর মাঞ্জন করে সে অতি ধীরে
তাকায় বারেবারে তাকায় আড়চোখে
কোথাও কাছেপিঠে রয়েছে মনচোর !
যেনবা এই ভব ‘কালিনী নইকূল’,
মনেতে রাজে এক যমুনা বে-আকুল
২.
এদিকে কী আপদ! নদীর ঘাটলায়
সিনানরত দুই পড়শি মেয়েছেলে
মেতেছে ঝগড়ায়! চলছে সিনাজুরি
বলছে অবিরত চেঁচিয়ে বাজখাঁই:
`নটীর বেটি তুই; দেইখা লমু তোরে!
বেহায়া বেতমিজ!`
লাঠিতে ভর দিয়ে ফোকলা দাঁত মেলে
ঘাটের-মড়া এক বুড়ি তা দেখছে;
খোমার ভেল্কিতে হাসছে খিল-খিল
আকাশে রাংতার মতোন ঝিক্মিক্
ক্রমশ ফিকে হয়ে দুপুর মরে আসে;
আসছে ছয় পায়ে বিকাল পিলপিল।।
মাঠেতে খুঁটিবাঁধা গরু ও বকরিরা
হাম্বা আর ভ্যাঁ-ভ্যাঁ ডাকছে রাখালেরে,
আদরে কামলারে ডাকছে মিয়াসাব;
আজকে মিঠা বোল! আজ যে হাটবার!
ঘাটেতে কলরব আজকে গোদারার !
মাথায় কান্ধেতে সদাই-পাতি নিয়ে
হাটুরে ছেলেবুড়া হচ্ছে নদী পার;
দুইটা বাটকুন ঘোড়াও সঙ্গী।
৩.
এসব দেখবার নাছোড় লোভে আমি
কাউকে না জানিয়ে সাখড়া-পাথারিয়া,
সান্দিকোণা আর বিদ্যাবল্লভ
বেকুরহাটি আর চিকনি পার হয়ে
ভাঙ্গা সাইকেলে প্যাডেল মেরে জোরে
আমার শৈশবে গোপনে চলে যাবো
মেঘের জানালার ভেতরে চোখ রেখে
বাইদে পচা জলে স্বপ্নে ঝাঁপ দেব
এ দুটি পোড়া চোখে আবার ঝিলকাবে
আমার নাড়িপোঁতা অচিন সেই গ্রাম
বাতাস বলে যাবে আমার ডাকনাম
পুরনো দহলিজে গিয়ে কি ফিরে পাবো
হারানো মুখগুলি কথায়-আড্ডায়
ধামাল-মালজোড়া পুথির সুর-গান?
এসব কই গেল কোন সে প্রেত আর
কোন সে আজদাহা নিমেষে গিলে নিল!
কোন্ সে সাপ এসে নীরবে দংশিল!
আমায় থামায়ো না, আমায় যেতে দাও
শহুরে নরকের আগল ভেঙে আজ।
শান্ত নদীতীরে বসবো; গলা ছেড়ে
গাইব আজ ফের অগীত যতো গান!
ঘাটেতে বাঁধা কোনো নৌকা চুরি করে
অসীম সায়রেতে ভাসব সারাদিন
কথার কাটা-ঘুড়ি ধরতে ছুটে যাবো
সঙ্গে এমদাদ, সঙ্গে ছবিকুল, মতি ও ইনসান
চোখের আঁকশিতে চাঁদকে পেড়ে এনে
---যেন সে ভীরু পাখি---আদরে কোলে নেবো;
ও যদি রাজি থাকে, তাহলে বাড়ি নিয়ে
চোখের রেকাবিতে সাজিয়ে রেখে দেব
জলের আয়নায় নিজেরই ভাঙা মুখ
যে গাছ দেখে যায়, করবো গলাগলি;
আজকে তারে আমি ধরবো আঞ্জায়া
আমারে আর তার হয়তো মনে নাই
৪.
আমি তো সেই লোক; ভিখারি আর রাজা
কালকে জয়ী আর আজকে পরাজিত
প্রতিটি মরণের ভেতর থেকে তবু
জাগছে ক্রমাগত আমার শিরদাঁড়া!
রক্ত-অশ্রুর রুমাল নেড়ে আজ ডাকছি নিজেকেই:
গোপাট-জাঙ্গালে বাইদে খালেবিলে
হারানো বাঁশি নিয়ে আয় রে কালাচান!























