বো কারপেলান
বো কারপেলানের ৭ কবিতা
অনুবাদ: মাসুদ খানপ্রকাশিত : মার্চ ১৭, ২০২০
স্বর্গ ও পৃথিবী
স্মরণ করো সেই সকালটির কথা
যখন তোমাকে খেতে হতো পরিজ
স্মরণ করো নিকোটিনের দাগে-ভরা বুড়ো আঙুলের কথা
যা নুন ঘষত ওই দাগের ওপর।
স্মরণ করো সেই কামরাটির কথা
যা জড়িয়ে ধরত নিজেই নিজের আঁধারকে
স্মরণ করো সেই আভা-ছড়ানো তুষারের কথা
যা ঝরত অভ্যন্তরে তোমার।
স্মরণ করো সেই দরোজাটির কথা যা দরাম করে
বন্ধ হতো সিঁড়ি নম্বর ‘সি’র নীরবতার ভেতর।
তোমার ভেতরকার কিছু একটা দেখছে ওই বেহেশতটাকে
আর তার চেয়েও ভারি কিছুকে, পৃথিবীকে।
জন্ম
যখন আমি জন্ম নিলাম, ফিরে গেলাম এমন এক জগতে যাকে আমি
আমার বাবা-মায়ের চেয়ে ভালো জানি বলে মনে হলো। খুব অচেনা ঠেকল আমার সঙ্গে তাদের প্রথম কথোপকথন; আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে তারা আমার চাহনিকে ডুবিয়ে দিল ছায়ার ভেতর; ঘুমিয়ে পড়লাম আমি; স্বপ্নে দেখলাম, যেন আমি এক ছোট্ট শিশু। আমি কি বদলে গেলাম স্বপ্নের ভেতর? চিৎকার দিয়ে জেগে উঠলাম আমি।
সকাল, সন্ধ্যা
ঠাণ্ডা, ঘাসেরা বিশ্রাম নিচ্ছে,
এই তো সকাল, সন্ধ্যা,
জীবনে তোমার।
তোমার পথের পাশ দিয়ে
চলে যায় অন্তিম দিবস।
লুকানো— হয়তো গাছের সব পাতায় পাতায়,
হয়তো চুপচাপ শান্ত সব শহরে শহরে,
যেখানে অশ্রুত হয়ে রয় চিৎকার তোমার।
সূচনাবিন্দু
যে হেঁটেছে রাস্তায় নিজে নিজে,
শুনতে শুনতে আর লক্ষ করতে করতে পথচারীদের,
নিঃসঙ্গ সে, স্রেফ নিঃসঙ্গ,
যদি-না একটি কণ্ঠস্বর, জ্বলন্ত কাঠের মতো একটি হাত
নাজেহাল করে শান্ত সময়গুলিকে, জীবনের সুরক্ষাগুলিকে।
যে হেঁটেছে রাস্তা ধরে, একা-একা,
আর নির্জনতা যাকে যায়নি ছেড়ে,
আর তার রয়েছে সূচনাবিন্দু এক।
জলরং
পানিতে-দ্রুত-চুবিয়ে-তোলা একটি তুলি যেই বুলিয়ে দিলাম গাছটির ওপর, অমনি তা ঝাপসা হতে শুরু করল মৃদু-মৃদু। অথচ ছিল আরো কিছুটা সময়, যখন ঘন নীলরঙে রাঙিয়ে দিলাম আকাশ, যে-আকাশ আলতো করে বাড়িয়ে দিল আমার কামরাটিকে, করে তুলল গভীর আর ডুবিয়ে দিল এক পড়ন্ত অন্ধকারে; উঁচুতে কালো একটি দাগ আঁকলাম বাতাসের ভেতর; তারপর কামরাটি ডুবে গেল নৈশ নীরবতায়, আমার হাতখানা আর দেখল না ওই শেষ-হওয়া জলরং, যা আমাকে ঘিরে রেখেছে তার জল আর গাছগাছালির সৌরভে। পরদিন সকালে দেখলাম শুকিয়ে গেছে ভূচিত্র; জানালার বাইরে তাকালাম যখন, দেখলাম ফাঁকা জায়গা আর পত্রপত্রালি, ঠাণ্ডা ও স্থির।
বেঁচে আছে তারা
তারা বেঁচে আছে, থাকবে
এখানে
যতদিন মনে রাখবে তাদের,
দূরে-দূরে,
আবৃত, আচ্ছাদিত,
কী যেন বলছে তারা—
হাঁটছে কাঁটাঝোপের আড়ালে আড়ালে,
তাদেরকে পেয়ে যাচ্ছ প্রায় নাগালের মধ্যে
কিংবা হাওয়া,
বিবর্ণ, লিনেনের মতো।
রাত্রি, অপেরায়
অনুষ্ঠান যেই শুরু হলো, মা ঢুকে পড়লেন বোনকে মদত দিতে, উৎসাহ যোগাতে; আমার বোন তখন অপেরার বৃন্দ-দৃশ্যের মামুলি এক একস্ট্রা। স্রেফ এক দুর্মর উদ্দীপনায় ভর করে, অনেকটা সংগ্রাম করে মঞ্চে উঠলেন মা, আর নায়কের আবির্ভাবের আগে বাজতে থাকে যে-সংগীত, তারই এক বিরতির ফাঁকে মা আমার গাইতে শুরু করে দিলেন ছোট্ট একটি গান; আমার বোন তখন আনন্দে আত্মহারা, ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ধূলিমাখা উইংসের আড়ালে। দর্শকেরা সঙ্গে-সঙ্গে তাল মেলাতে লাগল সুরে, আনন্দে গাইতে লাগল মায়ের সাথে গলা মিলিয়ে। গানের জোয়ারে ভাসতে থাকল সমগ্র অপেরা হাউজ, আমাদের পরিবারের একমাত্র আমিই কেবল রইলাম সুস্থির। অনুষ্ঠান-শেষের পরিবেশ একেবারে অভিভূত করে ফেলল আমাকে, পা বাড়ালাম আমি বেরিয়ে যাবার জন্য। দরোজা থেকে সাবধানে তাকালাম যখন নিচের জগতে, দেখলাম কীভাবে সমগ্র অপেরা হাউজ দুলছে মৃদুমন্দ এদিক-থেকে-ওদিক, ওদিক-থেকে-এদিক, বোনের ফোঁপানির শব্দে-গড়া সুতায়-ঝোলানো কাচের চকচকে এক মাতাল বলের মতো, আর বোনের ওই কান্নাই একমাত্র শব্দ যা আমার কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল। আর অশ্রু চেপে রাখতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল আমার।
কবি পরিচিতি: বো কারপেলানের জন্ম ১৯২৬ সালের ২৫ অক্টোবর। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। তিনি ফিনিসীয় ভাষার একজন কবি। তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। কবিতা ছাড়াও তিনি উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনা করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সুইডিশ একাডেমির নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।























