মারুফ ইসলামের গল্প ‘আত্মবিলাপ’

প্রকাশিত : মে ১৪, ২০১৯

যেতে যেতে পথে, আসাদ গেটের মোড়ে, দেখা হয়ে গেল মন্তাজ খালুর সঙ্গে। গৌরবর্ণ, সুঠাম দেহের মন্তাজ খালু আর আগের মতো নেই। তার গাল ভেঙে গেছে, চোখ কোটরাগত। গলার হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসে ‘বিউটি বোন’ হয়েছে। থুতনিতে ক’গাছি দাড়ি বৃথাই বাতাসে উড়ছে। রিকশার প্যাডেলে এক পা উঠিয়ে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, যাত্রীর অপেক্ষায়।

মন্তাজ খালুকে চিনতে আমার বেশ বেগ পেতে হলো। প্রায় মিনিট দেড়েক নিবিড় নিরীক্ষণ শেষে চিনলাম, ইনি মন্তাজ খালুই বটে। কিন্তু স্বাস্থ্যের একি হাল! শেফালি খালার খোঁজে মাঝে আমাদের মেসে যখন আসতেন তখন তো এমন ছিলেন না। কী সুঠাম আর পেটানো শরীর ছিল তার। আর কি চকচকে গায়ের রং! আমাদের মেসের দরজায় টোকা দিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করে কাছিমের মতো গলা বাড়িয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলতেন, শেফালি আইছেনি?

সেই মন্তাজ খালু, সেই মন্তাজ খালু এখন হাড়ের খাঁচার মতো শরীর নিয়ে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন!
‘আপনি মন্তাজ খালু না?’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।
মন্তাজ খালু হা করে তাকিয়ে থাকেন। তার চোখেমুখে অসহায়ত্ব।
আমি বলি, ‘চিনতে পারছেন না? আরে… বগুড়ায় একটা মেসে শেফালি খালা কাজ করত না, রান্নাবাড়ি করে দিত, সেই মেসে আমি থাকতাম। আপনি আসতেন মাঝে মধ্যে শেফালি খালার খোঁজ করতে। মনে নাই আপনার?’
‘ও…। শেফালি তো ম্যালা মেসেই কাম কইত্তো। আপনি যে কোনডাতে আছিলেন…।’ থতমত করেন মন্তাজ খালু। যেন আমাকে চিনতে না পারা তার বিরাট অন্যায় হয়েছে।

আমি মন্তাজ খালুর কাঁধে রাখি। ‘আপনি ঢাকায় কেন খালু? শেফালি খালা কেমন আছে?’
খালু উত্তর দেন না। বলেন, কই যাইবেন, ওঠেন।
আমি মন্তাজ খালুর রিকশায় উঠতে উঠতে বলি, দ্যাশের এ্যাতো উন্নতি হইতেছে, আপনার হইল অবনতি। এটা কোনো কথা, খালু?
মন্তাজ খালু আমার দিকে পিঠ দিয়ে প্যাডেল চালাতে চালাতে কথা শুরু করেন, ‘শেফালি তো নাই মামা। মইরা গেছে। মেসে কাম করতে গিয়া গ্যাসের চুলা ধরানোর সময় সিলিন্ডার বাস্টো হইয়া মইরা গেছে। জস্টি মাস আইলে তিন বচ্ছর হইব।’

আমি কিছু বলতে পারি না। হতভম্ব হয়ে যাই। আমার চোখের সামনে মন্তাজ খালুর ঘামে ভেজা পিঠ। প্যাডেল চালানোর তালে তালে ওঠা নামা করছে। তার চোখও কী ভিজে উঠেছে এমন? দেখতে পাচ্ছি না।

মন্তাজ খালু বলেই চলেছেন, ‘হের পর একটা সারের কারখানায় কাম নিছিলাম। হ্যারাও ছয় মাস আগে আমারে ছাটাই কইরা দিল। তারপর ঢাকায় আইছি।’
মন্তাজ খালুর চোখ দেখতে না পেলেও গলা শুনতে পাই। গলাটা ধরে এসেছে তার।

আমি প্রসঙ্গ ঘুরাতে শায়েস্তা খাঁর আমলের গল্প শুরু করি। ‘খালু, শায়েস্তা খাঁর নাম শুনছেন নি? বাংলার নবাব ছিল। তার আমলে এক টাকায় আট মন চাল পাওয়া যাইত। তারমানে সবাই যে খেয়ে পড়ে সচ্ছ্বল জীবনযাপন করত তা কিন্তু না। দেখা গেছে, যদি আবহাওয়া ভালো থাকত, তাহলে সারা দেশেই অনেক বেশি ফলন হতো। এতে কৃষকের কোনো লাভ হতো না। তখন টাকায় আট, এমনকি নয় মণ চালও পাওয়া যেত। আবার এমনও হয়েছে দাম এতটাই কমে যেত যে কৃষকেরা মাঠ থেকে ফসল তুলতই না। ধান মাঠেই পচে যেত। সেই পচা ধান জমিতে সারের কাজ করলেও চাষির জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত। কৃষকের হাতে কোনো টাকা থাকত না। অর্ধাহারে, অনাহারে, দুর্ভিক্ষে মারা যেত মানুষ।’

প্রসঙ্গ ঘুরানোতে কাজ হয়েছে। মন্তাজ খালু ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসী গলায় প্রশ্ন করেন, ধানের দাম কম দেইখা এক চাষী নাকি পাকা ধানের ক্ষ্যাতে আগুন লাগাই দিছে। হাছা নাকি মামা?

আমি বলি, হ্যাঁ, ঘটনা সত্যি। টাঙ্গাইলে ঘটছে এই ঘটনা। কৃষকের নাম আব্দুল মালেক সিকদার। কিন্তু খালু, দেশে তো উন্নয়ন হইতেছে ঠিকই। তারপরও মানুষ কেন এমন করতেছে?

ক্ষেপে যান মন্তাজ খালু। আবারো ঘাড় ঘুরিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলেন, ‘আমার চুলের উন্নয়ন হইছে! শায়েস্তা খাঁর আমলেও মানুষ না খাইয়া মরছে, এখন মরতাছে। এ্যাতো উন্নয়ন ফুন্নয়ন কইরা লাভটা কী হইল, কন?’