মাশকুর রাতুলের ৪ কবিতা

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২২, ২০১৯

ধ্বংসলীলা

শালিকের আনাগোনা এই ছাদবাগানে নেই।
বিরাট টবে আমগাছটার প্রতিটি পাতা গুণে বলে দেয়া যায়,
এ শহরের স্বপ্নগুলো কত ছোট, লোক দেখানো!
কংক্রিটের স্তূপ থেকে বেরিয়ে আসে শিক্ষিত চড়ুই,
তাদের ঝাপটা দেয়া ডানায় উড়তে থাকা উন্নতির
ধুলোর প্রতিটি কণায় লিখে রাখা শিশুর ভবিষ্যৎ
নিউক্লিয়ার বোমার আওয়াজ তুলে বলে—
তোরা ধ্বংস হ! ধ্বংস হ! ধ্বংস হ!
ধ্বংসের লীলাখেলায় মত্ত শহরবাসী ধ্বংসের স্বপ্ন
এঁকে চলে পিচঢালা কালো ক্যানভাসে।
আত্মার পরিপুষ্ট অহংকার জমে ঘোলা হয় নদীর পানি,
শিল্পের ছোঁয়ায় বোমারু বিমান আকাশে ওড়ে
চিলেকোঠায় ছুড়ে ফেলে রঙচঙা দুঃস্বপ্ন!
আবেগের সুতোই বোকাট্টা ছোট্টবেলার স্মৃতি।
স্কুলমাঠের ঘাসগুলো ফিকে হয় যায় সব,
একের পর এক যুদ্ধ চলে মগজে মগজে।
ভোরের কাক ডাকে অমাবস্যার আগমনী গীতি,
আজানের সুরে ভেসে আসে—
ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি!
তবুও, কেয়ামতের আলামত খুঁজছে জাহান্নামির দল।

কবিতা কেউ পড়ে না

কবিতা কেউ পড়ে না
তাই কবিরা আর লেখে না
টাইপে হয় কপিরাইট
নিয়ন আলোয় বিজ্ঞাপন।
কপালের ভাঁজে চিন্তা লুকোই,
তাই রমণীরা টিপ পরে না
শাড়ির আঁচল ধুলোই মেলে,
কামিজটা আজ বড্ড চলে।
প্রেমিকেরা তাই হাত ধরে না
প্রেমের নামেও প্রেম করে না
চাহিদা আর স্বপ্নের ভিড়ে
মাধবীলতা ফেরে না।
কবিতা কেউ পড়া না
তাই কবিরা আর লেখে না।

শহর জুড়ে বইছে মেলা
কর্ম জুয়ার বিরাট খেলা!
প্রেমিক সেথায় বেকার বসে
দেখছে শহর শেষ আক্রোশে।
যানের জটে থমকে শহর
ভিআইপিদের মস্ত বহর!
শহরটা তাও বেজায় বেগে
ছুটছে কেমন টকবগিয়ে!
কবিরা সব অফিস ঘরে
পেট যে আগে কাব্য পরে,
কবিতার খাতা খালি থাকে তাই
কবিতা কেউ পড়ে না
কবিরাও আর লেখে না।

শহর শহর মস্ত শহর!
গ্রাম বহুদূর নেই যে মোহর
চাষাভুষা সব রিকশা চালায়
রাত কাটে সব ইস্টিশনে।
বিশ্বায়নের উন্নয়নে
গ্রীষ্ম-বর্ষা এক চয়নে,
শীতকাল যে আসে না
হিম হাওয়া আর বহে না,
নকশিকাঁথাও চলে না
তাই কবিতা কেউ পড়ে না,
কবিরাও আর লেখে না।

শহুরে মানুষ জ্যান্ত রোবট!
ধুলোজমা ওই নিশ্বাসে তাই
বুকে দুঃখ জমে না।
সুখের খোঁজে দুঃখ খুন হয়
প্রেমিকেরা তাই টেকে না।
সুখের শহর সুখের বাড়ি
কাব্য যে সব বাড়াবাড়ি!
কাব্যের আজ বাজার যে নাই
কপিরাইটেই কাজ চলে তাই
কবিতা কেউ পড়ে না,
কবিরাও আর লেখে না।

রূপক, প্রেম ও ইশ্বর

রূপকগুলো সব হারিয়ে গেছে
তাই তোমার-আমার প্রেম আজ রক্তশূন্য!
স্মৃতিগুলো ঠিক আছে, তবে রুগ্ন।
ঠিক যেন ইয়েমেনে অপুষ্ট এক শিশু,
যে চিৎকার করছে দু’টুকরো খোরমার আশায়!
ঢিপ ঢিপ শব্দে হৃদয়খানি
বেরিয়ে আসতে চাইছে ওর শুকনো-ক্লিষ্ট পাঁজর ভেঙে!

তোমার-আমার প্রেমে তাই রূপক টানবো না আর,
হাতে হাত রেখে বিস্তর সমুদ্র তীরে আর হাঁটবো না।
ভরা বরষায় নদীর ধারে—
তোমার ভিজে যাওয়া চুলে বিলি কাটবো না,
আর্দ্র ঠোঁটে আর স্পর্শ করা হবে না তোমার চিবুক।

আমাদের কোনও বর্তমান নেই,
সময়ের অল্প অংশই আজ হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ
যেখানে তুমি বিরাট সৌদি বাদশা,
আর আমি রক্তাক্ত প্যালেস্টাইনি বালক
কিবলা পানে কপাল ঠেকিয়ে অপেক্ষায় আছি চির মুক্তির!

ভুলে যাব সকল অতীত।
ভুলে যাব, কিভাবে রোহিঙ্গা তরুণীর মতো ছুটে এসেছিলাম তোমার পানে, চেয়েছিলাম আশ্রয়!
তুমি ছিলে সেই পাষাণ পুরোহিত যার পবিত্রতার চরম চাহিদায়
মন্দিরের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না এক দলিত মা!

আমি সেই পোলেতারিয়েত, যার হাতুরি ভাঙা প্রেমেই তুমি গড়েছিলে তোমার পুঁজির প্রেমমহল!
তোমার প্রেমের সাম্রাজ্যে আমি ছিলাম নাম না-জানা এক সৈনিক
যার এম-ফোর রাইফেলের প্রতিটি বুলেট ছিদ্র করে চলেছে হাজারো পাঁজর!
অথচ, আমার প্রেম সেই মারমা তরুণের একবুক স্বপ্ন, যা বিক্রি হবার নয়!
আমি আছি আমি থাকবো,
বেঁচে আছি আমি বাঁচবো,
আমি ইয়েমেনি অপুষ্ট শিশু, প্যলেস্টাইনি বালক,
রোহিঙ্গা এক তরুণী, দলিত মা!
আমি উচ্ছ্বসিত বারিধারা, সর্বহারা!
আমার প্রেম আমার স্বপ্ন,
আমার স্বপ্ন আমার লড়াই, বেঁচে থাকার বড়াই!
আমি অবিনশ্বর!
আমিই প্রেম!

প্রেম দিলে না

আমি ছিলাম নিরেট প্রেমিক
তবু তুমি প্রেম দিলে না
প্রেম দিলে না
প্রেম দিলে না।

আমি শুধু প্রেম দেব হায়—
প্রেমিক আমি
প্রেম বুঝি তাই
প্রেমিক হয়েও
প্রেম করি নাই,
অল্প তোমার প্রেম চেয়েছি
প্রেমের নামে জান দিয়েছি
তবু তুমি নির্বোধ হায়,
প্রেম দিলে না
প্রেম দিলে না!

রূপকথার ওই জাদুর কাঠি
ফিরিয়ে দিলে তুমি
কাঠির আগায় প্রেম ছিল হায়
ধ্বংস হলাম আমি!

তোমার প্রেমেই ভাবুক হয়ে,
এঁকেছি কত কবিতা
লিখেছি সেই ছবিটা
গেয়েছি এক গল্প
আমি বলেছি দুটো গান,
এরপরেও তুমি দেখনি
আমার হৃদয়ের যত টান!
তাইতো আমি প্রেমিক ছিলাম
অন্ধ প্রেমেই ঢিল ছুড়লাম
তবুও তুমি
প্রেম দিলে না
প্রেম দিলে না
প্রেম দিলে না!

এই বুকেতে প্রেম নিয়ে তাই
যাচ্ছি আমি দূর অজানায়
নির্বাণ লাভ করবো যেদিন
গল্প প্রেমের লিখবো সেদিন
জ্ঞানরাজ এক বুদ্ধ হব,
আম্রপালির সঙ্গ নিয়ে
দেখিয়ে দেব
প্রেম কারে কয়
প্রেম কারে কয়!

ওই যে হায় কালবৈশাখী
বইছে দেখো এই শ্রাবণে
তেমনি আমি প্রেমিক হয়ে
আসবো ফিরে পার্বণে পার্বণে।

কবি পরিচিতি: ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়