অলঙ্করণ: মারিয়া সালাম
মাসুদ খানের একগুচ্ছ প্রেমের কবিতা
প্রকাশিত : মে ১৯, ২০১৮
সাক্ষাৎ
আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে বহুদিন পর।
মন যেন আজ হাবল-পূর্ববর্তী উপদ্রবহীন
তারাঘন মায়াময় রাতের আকাশ—
নিরিবিলি নীরব নিঝুম।
বহুকাল পর আজ দেখা হবে তোমার সহিত।
জোনাকি-ফুটিয়ে-তোলা রাতের আকাশ ঝেঁপে নেমে আসবে
বিলের পানিতে। ফুটে উঠবে অগণন তারামাছ ।
ধ্রুবকের মতো জ্বলবে তাদের প্রতিটি কৌণবিন্দু।
কতদিন হলো তুমি নেই এই দেশে।
উঠানে বরইয়ের গাছে চুপচাপ
ঘনিয়ে-জড়িয়ে-থাকা স্বর্ণলতাগুলি
এতদিনে বদলে গেছে জং-ধরা তামার তন্তুতে।
মৌমাছিরা সেই কবে উড়ে গেছে দূরের পাহাড়ে
ফাঁকা-ফাঁকা স্মৃতিকোষ হয়ে ঝুলে আছে
এখনো মৌচাক, কৃষ্ণচূড়া গাছে।
গুঞ্জনের রেশ, মধু ও মোমের অবশেষ, কিচ্ছু নেই কোনোখানে।
অভিমান করে নদী সরে গেছে দূরে
নাইয়র-নিতে-আসা নৌকাসহ।
তবুও এখনো
সংসারে-হাঁপিয়ে-ওঠা, ক্রমশ-ফুরাতে-থাকা
নাম-না-জানা কোনো গৃহবধূ
বিরহবিলাপ সুরে খুনখুনিয়ে গেয়ে যাচ্ছে অস্ফুট কাকুতিগান—
‘ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যাও বাঁশি আল্লার দোহাই
এ পরানের বিনিময়ে তোমার পরান দিয়ো হাসি আল্লার দোহাই...’
কারণবায়ু
প্রতিটি কালোকে আরো কালো করে দিয়ে
তবেই তো আলোকিত হয়ে ওঠো হে আলোকছন্দা।
বহু নক্ষত্রকে ম্লান করে দিয়ে,
ঠেলে দিয়ে হিমকৃষ্ণ-গহ্বরের নিয়তির দিকে
তারপরেই-না তুমি অতি-আলোমতি প্রেমকুমারী জ্যোতিষ্কগন্ধা।
আমাদের অগণিত ছোট-ছোট বহুবর্ণ মিথ্যা—
সেসব কুড়িয়ে নিয়ে শোধন ও শ্বেতীভূত করে
তবেই তো সত্যবতী তুমি সত্যানন্দা।
যে-নিয়মে নিয়মিত গ্রহদের বাঁকা বিচলন
সে-নিয়মে কুসুমিত একইসাথে বন আর মন।
প্রেম ও পাতক
বিভিন্ন নির্ণয় থেকে নানাভাবে উঠে এসে
তুমি স্পর্শ করেছ আমাকে, কৃতস্পর্শা।
নানা অমীমাংসা থেকে, অপূর্ণ পাপেচ্ছা আর অর্ধ-জাগরণ থেকে
কতভাবেই-না ছুঁয়ে গেছ তুমি।
শস্যের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে নিঃস্ব পড়ে থাকে মাঠ
মন-হুহু-করা সিটি দিয়ে ঢুলতে ঢুলতে চলে যায় ট্রেন
অখ্যাত স্টেশন ছেড়ে, কুয়াশায়, মধ্যরাতে।
তোমার অনেক আগে চলে যাব আমি
তোমারই সুকৃতিবলে, শুভেচ্ছায়, ধীরে ধীরে
কণা-উপকণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ব সবখানে।
একসময় ধুয়ে মুছে মিশে যাব নদীতে সাগরে।
এরপর এই ভূমণ্ডলের যে কোনো প্রান্তে, যে কোনো উপকূলে,
যেখানেই যাও, যেখান থেকেই নাও এক আঁজলা জল,
সেখানেই পেয়ে যাবে তোমার স্পর্শ ও তাপধন্য
এই তাপিষ্ঠের ঘন অনুতাপ-চিহ্নিত কোনো-না-কোনো দেহ-উপকণা।
সংসার
সীমন্তিনী, তোমার ও-সিঁথিপথ থেকে,
উজ্জ্বল সিঁদুর থেকে, জেগে উঠছে ছোট ছোট শিখা।
সেসব শিখারা একদিকে কাছে টেনে নিচ্ছে
দোদুল চিত্তের স্নিগ্ধ সুবোধ পতঙ্গদের।
অন্যদিকে আবার তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূরে
মাথার ওপর উড়তে-থাকা বাজ ও গৃধিনীদের।
পুবাল হাওয়ার মিষ্টি মর্জির ওপর ভর করে
ধীরে ভেসে চলেছে এখন
ছাড়া-পাওয়া, মৃদু-তাড়া-খাওয়া মিহি এই মন।
ইঁদুরেরা রুষ্ট হলে শত ছিদ্রে ভরে যায় সোনার সংসার।
অপর
ওপারে যাবার পর মাঝে মাঝে আসত সে স্বপ্নের ভেতর।
বেশ স্মার্ট আর মুখর লাগত তাকে।
তারপর কেটে গেছে বহুকাল।
এখনও সে ধরা দেয় স্বপ্নে, তবে কদাচ ক্কচিৎ।
কেমন শিথিল, শ্লথ! মুখে নেই সেই বাকস্ফূর্তি, মুখরের।
একদম ঝাপসা হয়ে গেছে অবয়বখানি।
এখন যেদিনই আসে, মমীভূত, মহাস্থবির হয়ে,
কাল্পনিক হয়ে, বসে থাকে মেঝের ওপর।
না-হয় সে বাস করে ভবান্তরে, বহুকাল ধরে,
তাতেই কি হয়ে পড়ে প্রিয়মুখ এতটা অপর?
আজকের এ পাগল-করা, জ্বালা-ধরানো অসহ্যশোভা এক দিব্য
দিনের দোহাই—
এরপর থেকে যদি সে না আসে আগের মতন
উজ্জ্বলন্ত ময়ূরের মতো উড়ে উড়ে, ফ্ল্যাশ দিতে দিতে আগ্নেয় পালকে-পেখমে,
আটকিয়ে দেব তবে স্বপ্নে ঢুকবার পথখানি তার
উঁচু থেকে নামিয়ে-আনা শতশত পাহাড়ি মেষের ব্যারিকেডে।
পারাপার
কথা ছিল, দেব যৌথসাঁতার। অথচ কথা ভেঙে
একক ডুবসাঁতারে একা চলে এলাম এপারে
তোমাকে ছাড়াই, ওগো সহসাঁতারিণী।
অনেক তো হলো পরলোকে!
এইবার সাঙ্গ করি পরপারলীলা
দিই আরো একটি অন্তিম ডুব।
ভেঙে দিয়ে এপার-ওপার মেকি ভেদরেখা
এক ডুবে ছুটে আসব পরপার থেকে
সোজা ইহপারেই আবার।
তোমাকে দেখার কী যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমার!
গিয়ে দেখে আসি— ওহে মুক্তকেশী,
আজ কোন লকলকে লাউডগা সাপে
বেঁধেছ তোমার
শিথিল চুলের রাশি?























