মাসুদ খানের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০২০

দ্রবণে, দ্রব্যগুণে

ক্রমশ-প্রাচীন-হয়ে-পড়া এই রংচটা ঘুণধরা আসবাব
তার মধ্য থেকে সাত-সাতটি সপ্তমী ধ্বনি তোলে
এক ক্ষুদ্র খ্যাপাটে তক্ষক
তার লালারশ্মি, তার অভিশাপ... রে বাস্তুতক্ষক,
তোর ঝুলে-পড়া গলকম্বলের দিব্যি-লাগা ঢ্যারা-কাটা বাস্তুর আশ্রয় ছেড়ে
প্রায়ই কর্কটদের জলসীমানার খুব কাছে চলে যাওয়া, ফের ফিরে আসা...

নিভুনিভু চিতা, ঝাপসা-হয়ে-আসা দাবানল,
স্খলিত মোমের দাহ, মৃদু-মৃদু পাপপ্রক্ষালন,
বাস্তুতক্ষকের তেড়ে-আসা ভর্ৎসনা,
ভ্রষ্টমতি পোষা ডাহুকের রক্তাবশেষ...
দ্রবণে, উপরিভাগে পুঞ্জ-পুঞ্জ আয়ন।

দ্রব্যের মতোই বেঁচে থাকা— দ্রবণে ও দ্রব্যগুণে।
যতদিন দ্রবীভূত আছি...

লিরিক ৩০

তুমিই যদি যাও ছেড়ে তো কোথায় আমি রই তবে!
তুমি ছাড়া এই অধীনের আর কে আছে এই ভবে?

তোমার মনের মেঘরোদ্দুর
বুঝতে আমার অনেকটা দূর
তুমি আমায় ফেললে হায় এ কেমনতর কৈতবে!
তুমি ছাড়া এই অধীনের আর কে আছে এই ভবে?

সম্পর্কের স্বরূপ কেমন,
শুধুই কি তা হরণপূরণ?
তুচ্ছ জ্ঞানে একটু দিয়ো তোমার অতুল বৈভবের।
তুমি ছাড়া এই অধীনের আর কে আছে এই ভবে?

ক্ষণেই সুরের মেলবন্ধন
ক্ষণেই আবার ছন্দপতন
তবু দীনহীনকে ফেলে দীননাথ-বা কই রবে?
তুমি ছাড়া এই অনাথের আর কে আছে এই ভবে?

হোমাপাখি

পড়তে থাকা শুরু হলে একবার, জানি না কতটা পতনের পর সূচিত হয় উত্থান আবার—

ভাবছি তা-ই আর মনে পড়ছে সেই হোমাপাখিদের কথা যারা থাকে আকাশের অনেক উঁচুতে। আকাশেই ডিম পাড়ে। পড়তে থাকে সেই ডিম। কিন্তু এত উঁচু যে পড়তে থাকে দিনের পর দিন। পড়তে পড়তেই ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। তখন বাচ্চা পড়তে থাকে। পড়তে পড়তেই বাচ্চার চোখ ফোটে, ডানা হয়, পালক গজায়। একদিন দেখতে পায় সে পড়ে যাচ্ছে। অমনি শাঁই করে উড়ে যায় মায়ের দিকে। উঠে যায় অনেক উঁচুতে। এত উঁচুতে যে পাখিরা আকাশের গায়ে ইতস্তত ভাসমান তিলচিহ্ন হয়ে ফুটে থাকে।

ওই পক্ষিকুলে জন্ম পুনর্জন্ম আমাদের, ওই পক্ষিকুলেই পালন-পোষণ-পতন-উত্থান-উড্ডয়ন...

ব্যাপন

গোয়ালিনীটির ছোট্ট মেয়ে,
মনের আনন্দে
একটু একটু করে পানি মিশিয়ে চলেছে
সারি-সারি দুগ্ধভাণ্ডে, অলক্ষ্যে সবার।
আহা, কী যে অনাবিল দুধে-জল-মেশানোর সুখ!

খিলখিল-হাসি-মেশানো, স্নিগ্ধ-ফাঁকি-মেশানো
ঊনঘনত্বের ওই দুধ মুগ্ধমনে যাবে মদিনায়, মথুরায়, উরুবিল্ব, নিশাপুর...
ছলকে ছলকে দেশ-কাল-পাত্র-পরিস্থিতি পেরিয়ে অনাবিষ্কৃত উপমহাদেশে,
বিচিত্র অচেনা পাত্রে, অজানা পরিস্থিতিতে
নানারূপ তঞ্চন-মন্থনশেষে পৌঁছে যাবে ননিচোরের ননি ও মাখনে,
সুজাতার পরমান্নে, দরগার শিরনিতে, ঠাকুরের প্রসাদে,
বেদুইন পশুচারকের গামছায়-বাঁধা কাঁচা-কাঁচা ক্ষীরশায়,
ঠা-ঠা রোদ্দুরের মধ্যে হঠাৎ গায়েবি দৈবাদেশ থেকে বিকীর্ণ হাওয়াই সন্দেশে, সংশয়ে...

বীজাণু ও বিস্ফোরক

বারুদের ভেতরে বীজাণু ঢুকে ঘটাবেই ঘন বিস্ফোরণ।
দ্রুত, অনিবার্য।

সে-কারণেই তো চাই অনুঘটকের অনুপ্রবেশ, বারুদে বীজাণুর—
যাতে ধ্বনির আগেই ঘটে প্রতিধ্বনি
রাগের আগেই জাগে অনুরাগ
স্রষ্টার পূর্বেই ছেয়ে যায় তার সৃষ্টি।