মাহমুদ শাওন

মাহমুদ শাওন

মাহমুদ শাওনের কবিতা ‘গোরখোদকের গান’

প্রকাশিত : মে ০৪, ২০২০

এক.
পূর্বমেঘে কিছু বিদ্যুৎ হারানো গিয়েছে— এই মর্মে ধূলিঝড়
গ্রহ আর গৃহে রটিয়েছে কথা
উড়ুখবরের ভেতর, রূপকথার মতো
কাছাকাছি কোথাও বাল্যকাল লুকিয়ে থাকে।
সমস্ত প্রত্যাশা দিনের শুরুতে ফেলে, ধারের টাকায়
কেনা আপেল অসুস্থ মায়ের শিথানে রেখে; সেও কৌতুকে,
অব্যাহত হারিয়ে হারিয়ে, কোথাকার এক আঁজলা জলে
মুখ রেখে কাঁদে
এ বজ্রবেদনা, এই ব্যাকুলক্রিয়া সমুদ্রবালিতে লিখেছিল কে?

শ্মশানে চাঁদ উঠলে, একবার এই দিকে এসো

দুই.
একবার এইদিকে এসো, শ্মশানবন্ধুরা শোনো,
অসুস্থ মায়ের শিথান থেকে আপেল চুরি গেছে কাল
পার্শ্বরোগিনীর কিশোর ছেলেটি আজও মাকে দেখে গেছে
দেখো—
মিষ্টভাষী জাদুকর, রহস্যগম্ভীর, বিনয়ী আর ধূর্ত চোখের জাদুকর
রুমাল থেকে
পকেট থেকে
কলার থেকে
বাড়িয়ে দিচ্ছে আপেল
গড়িয়ে দিচ্ছে আপেল
ছড়িয়ে দিচ্ছে আপেল

শ্মশানে একটিও আপেল গাছ নেই
আপেল কাঠ ভালো জ্বলে বর্ষায়

তিন.
আলনায় অর্ধটা ঝুলন্ত রেখে
বাকি অর্ধেকটা লাফিয়ে পালালো— এ দৃশ্য
দেখে দেখে ধরেই নিয়েছি, হয়তো আমি
অতিরিক্ত কেউ
যোনি নেই, লিঙ্গ নেই— ডাকিনি মন্ত্রের দিকে ছুটে চলা
মৌলিক মানুষ
পৃথিবীর অর্ধেক বয়সের মতো যুদ্ধ-খুনের পাশে
অর্ধ বয়সের মতো বুদ্ধের অশ্বথ ছায়াকাশে
মুখের বদলে, চোখের বদলে, দাঁত ও নখের
বদলে, মোমগাঢ় বেদনা ছাপিয়ে
নিমফুল ছড়িয়েছি

তোমরা দেখেছো ব্যক্তিগত ধূসরতা? উট? ভূগোলের
কুচি-মেদ-চিরুনি?
অট্টহাস্যে দাঁড়ানো পৃথিবীর যৌনবাহী হাওয়া?

চার.
হঠাৎ বোন বলে উধাও বনে, বোন বোন ডাকি
অভিসম্পাতের দেয়াল পেরিয়ে তারা সবেমাত্র
ঢুকেছে সেই সপ্তচতুষ্কোণে
সেখানে পরাভয়, আদি রথ, লুপ্ত পুথি, ক্ষয়
পূর্বপুরুষের হারানো কঙ্কালের ভেতর জমে থাকা
শীত, বরফপাথর, দরিদ্র মন্দিরের ঘণ্টা...

আমার বোনের চোখে অবিকল মায়ের জল দেখা যায়
আমার মায়ের চোখে অবিকল বোনের জল ঝরে যায়;
আমি তাদের অভিশপ্ত গহীন পরিখা।    
কোনো কৌশলী যুদ্ধবাজ হয়ে, গোরখোদকের বেশে, বিনম্র পরিব্রাজক!

আর সমুদয় শোকের কথা ভেবে, বন ও বোনের মাঝে
আমি কোনো তফাৎ দেখি না।

পাঁচ.
দরিদ্র মন্দিরের পাশে বিষণ্ণ ঘণ্টাবাদক শুয়ে আছে
যেমন নিঃসঙ্গ মানুষের মনে একজন বংশীবাদক থাকে,
বাঁশি বাজায়, শিস্ দেয়
তাই নিকট আকাশ দিয়ে উড়ে যায় উপেক্ষার দেবতারা

মানুষের মন কখনো দরিদ্র দেবালয়— এ কথা জানার পর
বহুকাল ঘণ্টা হয়ে ঝুলে আছি বংশীবাদকের মনে...

ছয়.
‘সুদিন পথের মোড়েই অপেক্ষা করে, একটু এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরতে হয়’— একথা শোনার পর, অজস্র মোড় পেরিয়ে এসে চুপি চুপি ভেবেছি, ভাড়ায় নেয়া সাইকেলের পিছে ছুটিয়ে, ক্লান্ত দুর্বল আর পিপাসার্ত করে কোথাও ফেলে আসব সব দুঃসময়। ফেরার পথে তুলে নেব যত সুদিন; ভিখিরির থালায় মুঠোভর্তি পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে কিনে আনব স্মৃতির নীল ঘুড়ি, লাল জামা...

প্রতিটি মোড় পেরিয়ে এসে দেখি, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রুপালি মুদ্রা হাতে হাস্যজ্জ্বল দুঃসময়!

ভাবি, এতটা পথ তবে কে কার পিছে ছুটে আসে?

সাত.
সময়ের অনন্ত ফাটলের ভেতর তোমার মুখ,
রূপকথার মতো,
ঈষৎ অনুপস্থিত।
কোল বদলের দিনে, দোলনা ঠেলে ঠেলে যে গান শুনিয়েছিলে,
আজ তার স্বরলিপি রক্ষিত নেই কোথাও। কেবল অস্পষ্ট রেখার মতো,
‘এইখানে কিছু একটা ছিল’, আর তা হাতড়ে যতটুকু যাওয়া যায়,
ততটুকুই তুমি
মা, কোনো অবয়বে নেই, কোথাও থাকে না
কল্পকথার ভেতর হঠাৎ ঢুকে পড়া কোনো মুখ, অসমাপ্ত গল্পের

আট.
সব নারীর দেহে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের সুবাস থাকে, যেমন পানশালায়
নারী ও পানশালার পাশ দিয়ে হেঁটে যায় একজন কফিন কারিগর
যেহেতু, পুরুষের মৃত্যু কেবল দুইয়ে
আর তারা গান গায় ধূসর কণ্ঠ উহ্য রেখে
আর তারা গান গায় ডাকনাম মনে রেখে
উপকূল ছেড়ে যাওয়া বাতাস দূর বন্দরে গোপন প্রেমিক পাবে,
মাতাল পুরুষ পাবে ভিন্ন ফুলের সুবাস

নয়.
পথচারীর হঠাৎ হাসিমিশ্রিত গানে দীর্ঘবিরতি শেষে
গোপন চুমুর অভিজ্ঞতা থাকে।
অকস্মাৎ চোরের মতো, ছলনা উহ্য রেখে, অন্ধকারে
ঘুমন্ত নারীর গালে ফুটে থাকা চুমু; সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে
পথচারীর গানে ভাষা পায়; হঠাৎ, হাসিমিশ্রিত

দূরের জানালায় প্রতিবেশি ভাবির চোখে রাজ্যের ঘুম, তবু
কণ্ঠ শোনা যায়, চেনা কোনো গান...

দশ.
আমাকে অতিক্রম করে এগোতে পারো না বলে, দেয়াল,
দাঁড়িয়ে আছো দেয়ালে
এই স্থির, অবিচল ভঙ্গির ভেতর গৌরব আছে, বেদনাও
তোমাকে পাহারায় রেখে, সম্পর্কের হাতে তুলে দেয়া
সন্দেহতালা, চিরদিন তোমার সম্মুখে গড়ায়,
পায়ের তলায়
চাপা পড়ে থাকে তোমার গম্ভীর চোয়াল, চিৎকার

অজস্র ফাটল নিয়ে, দেয়াল, তুমি দাঁড়িয়ে থাকো দেয়ালে

এগারো.
যেকোনো সড়কের মোড়ে, মনে হয় স্ট্যাচু হয়ে যাই
দু’হাত প্রসারিত করে, ঘুমের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকি
যেন একটি পাখি— এইমাত্র উড়তে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে
যেহেতু যিশুর মাথার ওপর দিয়ে কিছু মেঘ চিরকাল উড়ে যায়

আর মনে হয়, বহু শতাব্দী পর, ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে পাওয়া
আমার আধভাঙা হাত, বৃদ্ধাঙ্গুলি ও ছিন্ন মাথার ধারণা নিয়ে
কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকের চোখে কৌতূহল হয়ে বাঁচি

যেকোনো শতাব্দীর মোড়ে আমি ক্রুশবিদ্ধ যিশু

বারো.
অজস্র যুদ্ধের দাগ মুছে দিয়ে, আততায়ী, বিপরীত
বাতাসে ফিরিয়ে নিলে মুখ
জনশ্রুত গল্পের নায়িকার মতো গুচ্ছ চুমুর বিনোদন
নগড়জুড়ে অহেতু গুঞ্জরিত আজ
যেন কিছু প্রশ্ন, কিছু সন্দেহ অধ্যুষিত এই ভিনদেশি পোতাশ্রয়ে
খুব গোপনে ফেলে এসেছো প্রেমিকার স্তনজুড়ে
কারো দন্তক্ষতের মালা

তেরো.
একটা প্রাণ থেকে আরেকটা প্রাণে যাই, মাছি হই,
ঘাসফড়িং, কেঁচো, গাছ, নদী, মাছ; শুধু মানুষের প্রাণে
সঞ্চারণের ভার দিও না, মানব!
সকল মুখ ঘিরে অবিশ্বাস, সকল মুখ ধরে প্রশ্ন,
সকল মুখ জুড়ে সন্দেহ; মানুষ কোথায়?

কে যেন পেছনে এসে দাঁড়ায়। কাঁধে হাত রাখে।
কে?
মানুষ
কে!
মানুষ।
নির্ভরতার এক কণ্ঠ বলে ওঠে— ‘মানুষ এক অনন্ত খননের নাম’।

চৌদ্দ.
ভাসতে ভাসতে আমিও জেনেছি, সকল প্রবাহের নিজস্ব গোপনতা আছে
প্রতিটি পাথর গায়ে গোপন প্রেমিক রাখে প্রিয় অঙ্গটি, শীৎকার
একদিন ত্রিকালদর্শী জাদুকর তার মুঠোর তালা খুলে দেখাবে
সম্পর্কের গোপন-গোপনীয়তা; দূরত্বের ব্যাসার্ধ আর ভঙ্গুর বিশ্বাসের দৃশ্যাবলি
কোথায় মুখ লুকোবে তখন? ঈশ্বরের বাম হাতের তালুতে, সবুজ
ঘাসের পাশে শুয়ে আছে সম্পর্কহীন এক অন্ধ বাদুড়; অদূরে তোমার মুখ
জলধোয়া, জ্যোৎস্নায়