মুস্তফা আনোয়ারের দশটি কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০১৮

বইটি আগে প্রকাশিত হয়নি। তবে মুস্তফা আনোয়ার এর চূড়ান্ত প্রুফ দেখা ও সূচি নির্ধারণ করে গেছিলেন।

অনেক দিন ধরে তাঁর একটা দোলাচল চলছিল - কবিতা নিয়ে, দর্শন নিয়ে, চিন্তা নিয়ে। কোন কিছুতেই সুস্থিত হতে পারছিলেন না।

একটা সময় আগ্রহী হলেন লালন সাঁই-য়ের গানে ও দর্শনে। মেলামেশা শুরু করলেন লালনের চিন্তা অনুসারীদের সাথে। সাধক, গায়ক ও ভক্তবৃন্দের সাথে। এক ধরনের নৈকট্য খুঁজে পেলেন এদের সাহচর্যে।

এই সময়ের সঙ্গী কবি শশী হক, ধানমণ্ডি সাতাশ নম্বরে লালন সংসদের মধ্যমণি দেলু ভাই, নরসিংদির লালন সাধক হুমায়ুন সাধু ছাড়াও লালনের অসংখ্য গায়ক ও ভক্তবৃন্দ ছিল তাঁর প্রায় প্রতিদিনকার বান্ধব।

 

শশী হক বলেছেন, মুস্তফা আনোয়ার তখন এই কবিতাগুলি লিখছিলেন, পরিচিত এক ছেলেকে দিয়ে কম্পিউটারে টাইপ করাচ্ছিলেন (তাঁর হাতের লেখা সবাই পড়তে পারতো না, এমন কি কখনো কখনো নিজেও)। পুরনো কিছু লেখা ঠিক করছিলেন। বইয়ের নাম তখনই তিনি ঠিক করেছিলেন `কি করি কোথায় যাই`। এই নামে একটি কবিতাও লিখেছেন।

 

তাঁর বাসায় আমরা যখন লেখার ট্রাংকটা খুলি, এই পাণ্ডুলিপিটা পাই। নিঁখুত, সাজানো। এমন কি মৃত্যুর এক মাস আগে যে কবিতাটা আমাদের পড়ে শুনিয়েছিলেন, সেটি সহ। --কাজল শাহনেওয়াজ

 

 

 

‘কি করি কোথায় যাই’ থেকে ১০টি নির্বাচিত কবিতা

 

 

 

ও সোনার ডানার চিল

 

 

 

ও সোনার ডানার চিল, অকালের কবিতার

 

ছায়াপথ ভুলে এই ভূত জ্যোৎস্নারাতে গা এলিয়ে

 

দেহের পাড়া বেড়াতে এলে নাকি দৈনন্দিন ভ্রান্তিতে,

 

তবে বসো না একটু, পিঁড়ি পেতেছে ঘরণী।

 

 

 

বিদ্যুত পেঁচিয়ে মরা চাঁদ দুহাতে

 

বজ্রভেজা নিয়তির কথা বলি দুজন

 

দুই বিপরীত নদীকূল কুলুকুলু,

 

দোঁহাকার দেহে লিখে যাই দুর্গন্ধ ফুলের বর্ণ

 

 

 

হিজিবিজি হিজিবিজি হিজিবিজি হিজিবিজি।

 

 

 

সারারাত খিস্তি করি প্রকৃত ঘৃণায়

 

নোংরা ফুলে নোংরা জল দি

 

চলো আমরা পাতালে ধাবমান হই আলোর গতিতে,

 

বর্জ্য থেকে পুণঃ নোংরা অভ্যুদয়।

 

 

 

দেহের দিকে পা চলে অবিরাম

 

মরা ডোবা নিকটে এলে জীবন উঠে আসে,

 

জীবনের সাধ হলে বিছানায় লাশ হয়ে যাও।

 

বালুতে লুকাও প্রেম, নদী খুঁড়ে নীলিমা নীলিমা খুঁড়ে।

 

 

 

এখানের ভূতে পাওয়া ঐ লোকগুলো

 

নাকে মুখে জোরে জোরে ধোঁয়া টানে দেদার আরামে

 

ভূত তাড়ানিয়া ব্যর্থ দুরাশায় দুরাশায়,

 

অব্যর্থ ব্যর্থক্রিয়ায় প্রতিরাত ব্যর্থতম, শুভতম।

 

 

 

উঁচুতে সুদূর

 

 

 

পাপিনী পাখীটা

 

শুধু মেঘ খায়, বৃষ্টি খায়, আকাশ খায়।

 

 

বদ-হাওয়া এলেই পাপিনী পাখীটা

 

চেঁচায় খুশীতে ডগমগ -

 

ও শুধু চায় ঘটা, মেঘ, বৃষ্টি

 

নইলে মৃতু্য-ক্ষুধা ওটার শেষ হবে না।

 

 

 জংলী পাখীটার পিঠে উঠে, উড়ে উড়ে

 

আমি মেঘ, বৃষ্টি, আকাশ, কবিতা খাই।

 

উঁচুতে সুদূরে।

 

 

 

কুপি জ্বালিয়ে রাখো

 

 

 

পাথর না কি চাকুতে কাটব

 

মেঘ না কি আঙ্গুলে ভাঙব

 

স্রোত নাকি থেমে যাবে

 

নদী নাকি বালু হবে

 

তুমি নাকি চলে যাবে কাল

 

প্রেম নাকি ঘাস হয়

 

নেশা নাকি প্রিয়তমা ধস আনে মাধুরীর এক টানে

 

জীবন নাকি রগড় হবে

 

কবিতা নাকি কবরে যাবে

 

দু`পা এগুলে হাজার দিন পা পা

 

কবিদের নাকি ফাঁসি হয় বৃক্ষে

 

শব্দ খোঁজে গর্ত খোঁজে

 

একা একা বিড় বিড় সারাদিন সারারাত

 

প্রাণের কুপি জ্বালিয়ে আনন্দম।

 

 

 

পাথর

 

 

 

এক যে ছিল পাথর

 

অধর ছিল অধরা তার

 

হারানো পথে পথিক কেউ ফেরেনি আজো।

 

আনকা মুখ কেউ দেখেনি

 

দৈত্য দানো দিত পাহারা,

 

শব্দ প্রিয়া হিংস্র ঠোঁটে

 

পোড়াপাতার পংক্তিগুলো হারিয়ে গেল ধুলোতে।

 

মৃতু্য হল মৃতু্য।

 

কেউ নেই রে, কেউ থাকে না।

 

চামড়া ধসে, মাংস ধরে,বাকি থাকে কি

 

বিকট হাড়, হাড়ের হাসি।

 

পাথর ভেঙে হঠাৎ এলো কবিতা

 

হৃদয় খুঁড়ে স্বপ্ন আনি কবিতা আনি।

 

 

 

কবি ছিল সে

 

 

 

এক যে ছিল শুকনো নদী

 

যতই খোঁড়ো হারিয়ে যায়

 

এক যে ছিল মেঘের ঘটা

 

ডেকে ডেকেই চুপসে গেল।

 

এক যে ছিল দেশের রাজা

 

রাণী ছিল না প্রজা ছিল না।

 

মুকুট ছিল মাথা ছিল না।

 

আহার ছিল ক্ষুধা ছিল না।

 

কাব্য নাকি লিখেই যেত

 

রাত্রি জেগে, রোগটা তার

 

ওষুধ খেলে বাড়তো দ্রুত -

 

মদ খেয়ে সে মরেই গেল

 

কবর দিতে কেউ ছিল না

 

কবি ছিল সে কবি ছিল সে

 

নিয়তি তাই শোধ ওঠালো।

 

 

 

ধাক্কা দে

 

 

মনও নেই দেহ ও নেই

 

ভাগ্যলেখা কিচ্ছু নেই

 

গুহায় দেখে ল্যাংটা নারী

 

স্রোতে কাটি ও মেঘ থামাই

 

কে আর দেবে রাত্রে টোকা

 

দরজা ভাঙা জানালা ভাঙা

 

উপরে উঠি সিঁড়িই ভাঙা

 

বনবাদাড় উচ্ছন্ন

 

পিছু নেব যে হরিণ কৈ

 

আকাশ ভাঙা পাতাল ভাঙা

 

হারিয়ে যাব বস্তি ভাঙা

 

ওরে উপেন হার্ড ড্রাগ নে

 

লুচ্চামিতে মস্ত জিরো

 

হা-রে-রে-রে-ভাগ্য রে-রে

 

বউ মরেছে নেশাখোরের

 

বেঁচে থাকা যে রদ্দি হবে

 

জানতাম কি হিজড়া আমি

 

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেল

 

গল্প বলা ফুরিয়ে গেল

 

ভেবেছিলাম বিপ্লবী সে

 

বদলে দেবে সমাজটাকে

 

খাদ্য নিয়ে রগড় এত

 

মনুষ্য ছা, কুকুর যত

 

যুদ্ধ করে নোংরা নিয়ে

 

ধাক্কা দে রে হৃদয় খুঁড়ে

 

কাব্য খেতে খাদ্য হতে।

 

পরনে তার ঢাকার শাড়ি

 

 কাঠ কাটিনি জ্বালাই চিতা

 

মাটি কাটিনি কবর দিবো।

 

 

রোজই মরি, রোজই বাঁচি

 

আমাকে কি সে ভালবাসলো।

 

  স্বপ্ন খাই পদ্মপাতা 

 

 

ভাল্লাগে না কিচ্ছু খেতে।

 

 

ঘুমিয়ে মেয়ে শব্দ প্রেমে

 

পরনে তার ঢাকার শাড়ি।

 

 

 

কুসুম ফোটে আকাশ জোড়া

 

কবিরা ছোটে পরাগ লোভে।

 

 

 

মরিতে সাধ হল বড্ডো

 

অমর হতে কবিতা বাঁধি।

 

 

 

চাঁদের ভিতরে চাঁদ

 

 

 

গলি তস্য গলি পেরিয়ে

 

পাৎলা মলমূত্র পেরিয়ে

 

মুক্তবাজার শহর যেতে হয়

 

 

 

ওই হোথায়, আমাদের আস্তানায়

 

পাঁজরের পাথরে পাথরে ঠুকে

 

বাঁশবনের মাথায় জ্যোৎস্নার কুপি, ওঠে সারারাত।

 

 

 

রাত নামে পাটে

 

মদ খেয়ে নে।

 

 

 

পেলি এক মরা দেহ -

 

তা, মন্দ কি গুবরে কপাল সিংহের ছা।

 

 

 

তো, হিম্মৎআলা -

 

আজ একটা মহৎ কবিতা লেখা হবে,

 

মুড়ির ঠোঙার জন্য।

 

 

 

রঙিন রঙিন ঠোঙা ভাসে

 

দূরে মেঘে মেঘে।

 

 

 

প্রার্থনা করো মাটির জন্য।

 

প্রার্থনা করো দেহের জন্য।

 

প্রার্থনা করো মৃত্যুর জন্য।

 

প্রার্থনা করে নিঃসঙ্গতার জন্য।

 

 

 

 

 

আলেক সাঁই

 

 

 

মনের মানুষ নেই মনে

 

রাত্রিদিন দৈত্য দানো থাকে ঐখানে

 

 

 

নষ্টা পাখি উড়ে যায়, বৃষ্টিভরা মেঘ পিপাসায়

 

খাঁচা ভেঙে ফুড়ুত আসে ফুড়ুত যায়।

 

 

 

পাশের বাসার পড়শিনী ঘোমটা খোলে না

 

গরবিনী অপরূপা রূপের দেমাগে পা রাখে না

 

 

 

পাগলা ব্যাটা নেশা করে আর সদা কাটে উবদো নদী

 

লগি ঠেলে মরো তুমি কাদা পাঁকে উজানে ভাটিতে।

 

 

 

আত্মা মুক্ত জন্মে জন্মে - সর্বহারা কি আর হারাবে

 

ক্রীতদাস নেই আর, কেনাবেচা চলে তবু আজো।

 

 

 

সত্যের জয় মিথ্যার নাশ শোনা কথা কবেকার

 

পাপ পূণ্য নেই কিছু, ওঠে নামে পণ্য পাপ-পূণ্য।

 

 

 

নৃত্য করো মুক্তির আনন্দে রাজা

 

নৃত্য করো সত্যের আনন্দে রাজা

 

 

 

জটা থেকে নেমে এল পতিতের নদী খরস্রোত

 

কুপজলে আর কেহ কোনদিন পতিত হবে না।

 

 

 

জয় রাজা ফকিরের, লোককবি মানবতার অপমানিতের।

 

কবি, চরণের ধুলা দাও পচা দেহে, দাও নবজন্ম।

 

 

 

জয় রাজা লালনের জয় গুরু জয় গুরু

 

জয় গুরু, আলেক সাঁই।

 

 

 

আজ সবাই গেছে

 

 

 

জ্যোৎস্না খুঁড়ে খুঁড়ে কারা যাওগো বনবাদাড়ে

 

শর সয্যায় কে আছে গো শুয়ে একা একা

 

ঘুম থেকে উঠে, উটের ঘাড় দেখা

 

কতদিন ভুলে গিয়েছো জানালার নীলে

 

লোহার পাতাবাহারে

 

 

 

ডাণ্ডাবেড়ি পায়ে আর কতদূর হেঁটে যাবে

 

বরফের মরা নদী পেরিয়ে পেরিয়ে

 

একলক্ষ ছিয়াশি হাজার বছর আর কত দূর, কতদিন।

 

হাজার বছরের মরা তেপান্তর পেরিয়ে পেরিয়ে কতদূর যাবে আর তুমি।

 

 

 

শুকতারারাতে হে পথিক পথ হারিয়েছো কবে থেকে, মনে পড়ে?

 

ঐ কুৎসিত ভীষণা সুন্দরী কাপালিক কন্যার লোভে

 

মহাজিভে কাহার সুগন্ধী পেলে তুমি বলো

 

জেহভার বানানো ইডেনে, আকাশভরা রাতে মহাবিশ্বের ছন্দের কেন্দ্রে

 

বিন্দুর বিন্দুতে অগ্নির অগ্নিতে

 

অকারণ দাবদাহে

 

জ্বলে গেল গ্রামের পর গ্রাম

 

নক্ষত্রের পর নক্ষত্র

 

বিশ্বের পর বিশ্ব

 

 

 

হায়, কারা যেন কবরে সিঁদ দিলো

 

চিতায় কাঠ দিলো

 

কবরে কবর দিলো

 

চিতার কাঠে পাঁজর দিলো

 

কবরে বেনারসীর কাফন দিলো

 

তুমি কতদিন শুধু মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে

 

আর কতদিন তুমি চণ্ডাল হয়ে চিতা বানাবে জ্যোৎস্না রাতে

 

 

 

কবর খুঁড়তে আর চিতা জ্বালাতে আজ সবাই গেছে জ্যোৎস্নারাতে

 

 

 

অমাবস্যায় হারিয়ে যেতে

 

সবাই গেছে সবাই গেছে সবাই গেছে

 

আমি শুধু ঘরে আছি বুকের ভিতর এক হাজার কবর বানিয়ে

 

 

 

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে কবর দিতে

 

জ্যোৎস্নারাতেজ্যোৎস্নারাতেজ্যোৎস্নারাতে।

 

 

 

প্রেমের দশদশার তত্ত্বপত্র

 

 

এসোনা আমার ঘরে, বুড়ো শালিক আমি একলা থাকি।

 

তুমি তো তুমিই,

 

চক্রবৃদ্ধি্ঋণ, জীবন জুড়ে শুধুই বাড়ে দিন দিন।

 

যদি এসেই যাও হঠাৎ

 

হাতে রেখো রাঙা চুনি, নাকে সবুজ পান্না।

 

রাধাভাব হবে তবে।

 

 

 

সমাজ সংসার মিছে করে দিয়ে সব যদি এলেই

 

মেরে ফেলবে পাথর মেরে মেরে তোমাকে। ফেলে দেবে লাশকাটা ঘরে।

 

শুয়ে শুয়ে যদি,

 

অর্বাচীন নৈতিকতা, মহাবোধে তড়িৎচুম্বক টানে যদি

 

তুমি শোক ও সুখের কাঠগড়ায় পা রাখো মনে মনে না মানা মনের ভুলে

 

কোন এক মেঘদৈত্যের নিশীথিনী রাতে, আসিও

 

এসে দেখে যাও সটান দরজা

 

খোলাই আছে, শুধুই

 

আমি নেই - আমি নেই

 

ছিলাম না কোনদিনও

 

ছিলাম না, ছিলাম না।

 

 

 

বিশ্বধাক্কাই কি দিলো রংচটা মনের স্যাঁৎসেতে দেয়ালে

 

তারাভরা কল্পনার ঘোমটার লুটপাট

 

প্রেমের দশম দশা।

 

 

 

সব অতিবাস্তব কল্পনা

 

সব অতি মিথ্যে কল্পনা

 

অতিকল্পনার মদির মায়া স্বপ্ন ভ্রম।

 

 

 

সত্যি সত্যি সত্য আছে,

 

সত্যি সত্যি সত্য নাই।

 

 

 

আমরা উল্টো চুম্বকবিদ্যুৎ বর্গীক্ষেত্র -

 

নিকটে গেলেই হাতকড়া।

 

 

 

কখখনো এসোনা বুড়োর ঘরে

 

ঘর-বদল নিয়তি আমাদের

 

নিয়তির ভিতর নিয়তি।