রহিমা আফরোজ মুন্নীর নভেলা ‘ধুরন্ধর’

পর্ব-৩

প্রকাশিত : জুন ২৮, ২০২৬

৫.
শহরের নামকরা সরকারি হাসপাতাল যেখানে ৭টা বাজবার আগেই হলঘর ধোয়ামোছার কাজ শুরু হয়ে যায়, ওয়ার্ড বয় আর খালাদের ব্যস্ততার ধাক্কাধক্কি রোগীদের শরীরও ছাড় পায় না, সারা রাত নাইট ডিউটির নামে আড্ডাবাজি আর ফাঁকতালে ঘুমিয়ে কাটিয়ে ভোর হবার আগেই কাজের হুড়াহুড়ি লাগায় বের হবার জন্য, শিফট চেঞ্জের সময় বড়-ছোটো গোলোযোগ তাই সাধারণ ঘটনা।

দ্রুত হাতে নয়ছয় করে কাজ শেষ করবার এই সময়টাতে ডা. বিভাস নিজ দায়িত্বে হলঘর জুড়ে পায়চারি করে আর ভুলভ্রান্তি ধরায়, সিনিয়র অ্যানেসথেসিস্ট হিসেবে যথেষ্ট নামডাক বিভাসের। সময়জ্ঞান তার টনটনে, নাইট ডিউটির বেলায়ও সকাল হতেই তাড়া লাগায় না চলে যাবার, ওটিতে কোনো রোগী আছে কিনা চেক করে শিফটিংয়ের ডাক্তার আসলে, তবেই বের হয় সে।

আজকে সামান্য ব্যতিক্রম করে দিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ড. বোস বেলা ৮টা না বাজতেই তড়িঘড়ি ঢুকল বিভাসের রুমে। ভূমিকা না করেই বলে উঠল, ‘তুমি কি কোনো সিস্টারকেই ছাড় দেবে না বলে শপথ নিয়েছ বিভাস?’

হাসিমুখে বিশ্বজয়ের ভাব নিয়ে বিভাসের উত্তর, ‘তুমি কি আমাকে ঈর্ষা না করে ছাড়বে না বলে শপথ নিয়েছ বোস!’

দুজনেই সমস্বরে হাসল। ডা. বোস মাথা নেড়ে ঠাণ্ডা স্বরে বললো, ‘নাহ বিভাস, আই অ্যাম সিরিয়াস নাউ, এমন কাণ্ড করেছ যে, কোনোরকমে যদি সেটা জানাজানি হয় তো ইন্টার্নগুলো আমাদের কাঁচাই খেয়ে নিতে চাইবে। তাছাড়া নিধির কথাও ভাবো একবার।’

সায় দেবার ভঙ্গিতে বিভাস বলে, ‘নিধির কথা ভেবেই তো আমি বাসার বাইরে রিল্যাক্স করি।’

অবাক চোখ বোসের, ‘মানে?’

বিভাসের উত্তর,‘তুমি কিছু টের পাও না? নিধিকে খেয়াল করে দেখেছ এর মধ্যে?’

একগাল হাসল বোস, ‘খেয়াল করে দেখেছির মানে কি? তুমি যেন জানো না আই অ্যাম ফলিং ইন লাভ উইথ দ্যাট উইমেন, হরহামেশা আমি তার খেয়ালেই থাকি।’

কপট রাগের স্বর বিভাসের, ‘ইউ বাস্টার্ড!’।

আবার একদফা হাসি দুজনের। বোস সিরিয়াস স্বরে বলে, ‘আই হ্যাভ নেভার সীন সাচ এ্যা চার্মিং লেডি বিফোর, শুধু তোমার কথা ভেবেই…’

বোসের কথা কেড়ে নেয় বিভাস, ‘তোমাকে সে পাত্তাই দেবে না। শালীর অ্যাটিচুড দেখেছো? আমাকেই গনায় ধরে না।’

রাগে গলা চড়ে ওঠে বিভাসের। বোস হাসে, ‘কাম ডাউন ডক্টর, তোমাকে না বলেছি চুল গজাবার একটা ব্যবস্থা করো।’

টেবিলের ওপাশ থেকে ঘুষি মারার ভঙ্গি করলো বিভাস, ‘শাট আপ।’

মাথা নেড়ে জো হুকুমের ভঙ্গি করে বোস, ‘হোয়াট এভার, তোমাদের ব্যাপার, তবে এইবার তুমি ফাঁসবে যদি সিস্টারকে না সামলাতে পারো। আমি বলেকয়ে তাকে শান্ত করেছি কিছুক্ষণ সময় চেয়ে।’

বিভাস আকাশ থেকে পড়লো যেন, ‘কি হয়েছে? কাকে সামলাব?’

বোস মনে করার চেষ্টা করে, ‘ইয়ে, ওইযে নতুন সিস্টারটা, দেখতে সুন্দর, কাল তোমার সাথে নাইট ডিউটিতে ছিল, কী যেন নাম...’

বিভাস বলে, ‘রিফাত আরা বেগম? যা একটু সুন্দর সেই তো।’

বোস মাথা নাড়ে, ‘হু, সেইই।’

বিভাস বিরক্তিভরে হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলে, ‘কি হয়েছে ম্যাডামের? পাঠিয়ে দাও আমার রুমে, রাতে সামলাতে পারিনি তো এখন সামলে দেব।’

বোস সিরিয়াস হয়ে ওঠে, ‘ফাজলামি না ডক্টর। রিফাত আমাকে কল করে এনেছে ভোর সকালে।’

বিভাস বিরক্ত হয়, ‘ওহ দ্যাট বিচ!’

বোস তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ইয়েস ম্যান, অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ সিরিয়াস, ঠোঁটের চারপাশ এখনও ফোলা…’

কথা কেড়ে নিয়ে বিভাস বলে, ‘খুবই টেস্টি বলে চুমুটুমু জোরে হয়ে গেছিল বোধহয়, আর কাল অপারেশনের পর এগজস্ট লাগাতে ড্রিংক করেছিলাম সামান্য।’

বোস হতাশ চোখে উঠে দাঁড়িয়ে কেবিনের দরজা খুলে চারপাশ চেক করে এসে মৃদুস্বরে যোগ করে, ‘মেয়েটার জামাও ছেঁড়া ছিল। অ্যাপ্রোন সরিয়ে আমাকে দেখিয়েছে।’

বিভাস হাততালি দিয়ে বলে ওঠে, ‘ওহ ব্রাভো ম্যান, দেন ইউ অলসো টেস্টেড সামথিং, ডোন্ট ইউ।’

ড. বোস অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাকিয়ে বলে, ‘তুমি এখনও ড্রাঙ্ক, না হলে বুঝতে পরিস্থিতি কতটা জটিল।’

সিরিয়াস ভঙ্গিতে কাঁধ আর বুক টানটান করে বিভাস চেয়ার টেনে বোসের মুখোমুখি বসল, ‘বলো কি করতে হবে? মেয়েটার কাছে মাফ চাইতে হবে? যদিও আমি একটুও জোর করিনি, দুই পেগ মেরে সেইই টালমাটাল ছিল, চাইলে ওটির অ্যাসিস্টেন্টদের ডেকে জিজ্ঞেশ করো।’

শান্ত স্বরে বোস বলে উঠল, ‘আমি জানি।’

বিভাস অবাক, ‘মানে?’

বোস বলে ওঠে, ‘মেয়েটার গালে খামচির দাগ আর জামার যেখানটায় ছেঁড়া সেটা ওর নিজেরই করা, এমনটাই মনে হয়েছে আমার।’

বিস্ময়ের স্বর বিভাসের, ‘হলি কাউ, কী বলছ এসব? মেয়েটা ধান্দাবাজ আর উচ্চভিলাষী যে, স্পষ্ট করে না দেখালেও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম আমি। এখন তাকে নার্সদের বস বানিয়ে দাও আর ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু টাকা ধরিয়ে দাও, মামলা ডিসমিস।’

বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে জানতে চাইলো, ‘খানকিটা কোথায় এখন?’

বোস কিছুটা বিব্রত, বলল, ‘আমার রুমে। তুমি যাও, মিটমাট করে এসো। টাকা আমি সাথে নিয়েই এসেছি, অফিসের খরচে অ্যাডজাস্ট করে নেব।’

এক তাড়া নোট নিয়ে ড. বোসের চেম্বারে ঢুকল বিভাস। তাকে দেখে মেয়েটা ভয়ের স্বরে বলে উঠল, ‘ড. বোস স্যার কোথায়? তাকে ডাকুন।’

নোটের তোড়া টেবিলে রাখতে রাখতে বিভাস বলল, ‘সরি, ড্রাঙ্ক ছিলাম বলেই হয়তোবা সীমারেখার বোধ ছিল না। যাহোক, টাকাটা তোমার জন্য।’

ভয় কাটিয়ে রিফাত স্বাভাবিক চেহারায় টাকাটা হাতে নিয়ে বোসের টেবিল থেকে ফাইলপত্রের মাঝখান থেকে একটা খালি খাম বের করে টাকা ভরে অ্যাপ্রোনের পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আমার প্রমোশনটা আবার ভুলে যাবেন না যেন। ড. বোস আপনাকে খুব মানে।’

মনে মনে গালি দিল বিভাস, ‘বিচ।’ মেয়েটা হাতের নাগালে দাঁড়িয়ে, বিভাস তার ঠোঁটের পাশটায় হাত বুলাল জোরে, ব্যথার কোনো শব্দ বের হলো না রিফাতের মুখ থেকে, হাতে চ্যাটচেটে লাগায় নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকলো, মেকাপের হতে পারে, মুচকি হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল বিভাস।

রিফাত টিস্যু পেপার দিয়ে ডলে ডলে ঠোঁটের চারপাশ থেকে মেকাপের বাড়তি দাগ মুছে ফেলল। মনে মনে ভাবল, এইবার ড. বোসের কাছে যেতে হবে। সিনিয়র নার্সটার দেমাগ খুব, তাকে হটিয়ে সেই পদ এখন আমাকে দেবার দায়িত্ব দেবে বলে কথা দিয়েছে ড. বোস স্বয়ং। ভুলে যেতে দেয়া চলবে না। কয়টা টাকা ধরিয়ে এই ইস্যু যেন ধামাচাপা দিয়ে না ফেলে। চলবে