রিফাত চৌধুরীর একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : আগস্ট ২২, ২০১৮
প্রকৃতি
নীল আকাশের গায়ে হলুদ মেঘ ভেসে বেড়ায়,
জলা ঘাসে জমিন ভরে আছে
ফাঁকে ফাঁকে নীল জলের রেখা
দূরে প্রান্তরেখা,
জলের উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যায় বক।
লম্বা লম্বা গাছের আড়ালে হলুদ আকাশ,
নিচে জমে থাকা জলে গাছের আর আকাশের ছায়া পড়েছে,
জলের মাঝামাঝি জায়গায় লালরঙের দু`টি ফুল ফুটে আছে।
নীল জলের ওপর মাথা উঁচু করা ছোট পাহাড়।
পাহাড়ের মধ্যেই ঘন জঙ্গল।
একটি নারী একেবারে একা জঙ্গলের মধ্যে হাঁটছে।
একটা মাতৃকামী স্বাবলম্বী গরু গাছের তলায় শুয়ে আছে।
নদীর পাড়ে গাছের তলায় ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছে কয়েকজন
মেয়েমানুষ,
পাশে অলস ভঙ্গিমায় বসে আছে দুটো ছাগল,
দূরে হালকা নীল জলে ভেসে যায় নৌকা।
নদী ক্ষীণ শরীর নিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে।
চারিদিকে বালিয়াড়ি।
মহিলারা কলসী কাঁখে করে দূর দূরান্ত থেকে জল নিয়ে বাড়ি যায়।
বস
ভিতরে যা থাকার কথা ছিলো কিন্তু নেই।
কিংবা দুটি শাদা ফলের মতো দুটি চোখ আছে
কিন্তু ভিতরে মণি নেই।
ভিতরে যা থাকার কথা ছিলো কিন্তু নেই।
মণি নেই, চোখ যেনো পাথরের মতো কঠিন।
আশা
রংচটা ধূলোমাখা তোবড়ানো পুরোনো
পরপর দাঁড় করানো কয়েকটি রিকশা
এক নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
একটা রিকশার পিছনে বেগম খালেদা জিয়ার মুখ আঁকা।
স্প্রিং বের-হওয়া ফাটা চামড়ার সিটে
অলসভাবে বসে আছে রিকশাচালক।
রিকশার চাকা দুটো টাল খাওয়ানো।
গ্রুপ ছবি
সাত আটটা কাক দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের ছবি তোলা হচ্ছে।
কাকেরা সবাই কালো পোশাক পরে আছে।
প্রিজমের লেন্সের ভিতর
ছেলেটা হাঁটছে
কলোনিবাড়ি পেরিয়ে মাঠের ধারে ধারে
পিচ ঢালা রাস্তায়
কোমল কিশোর মুখখানা
ছেলেটা হাঁটছে
তার দামাল চলার বেগে
বিস্তৃত আকাশ সীমানায়
বাতাস ছিঁড়ে ফেলা গানে
ভাসমান ছায়া ফেলে
রাস্তার পাশে জমা স্তব্ধ জলে।
সৌন্দর্যকে সামনে রেখে
সৌন্দর্যকে পিছনে রেখে
সৌন্দর্যকে চারদিক দিয়ে ঘিরে
ছেলেটা হাঁটছে আর দেখছে
তার প্রিজমের লেন্সের ভিতর
গোলাপী রঙের গোলাপ
হলুদ মুক্তার সৌরভ
সংগীতের শরীরের ত্বক।
ইস্পাতহৃদয়া
টিয়া পাখির মতো লাল ঠোঁট
টিয়া পাখির মতো বাঁকানো নাক
সদ্যভাঙা নারকেলের মতো ছলছলে চোখ
উল্লসিত বস্তিবালিকার মতো হাসি
হাতে পরেছে ইস্পাতনির্মিত দস্তানা
তরমুজের মতো কাটা নিজের লাল ক্ষতে ওষুধ ঢালছে
মুভি ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছে `কাট`
কী সুন্দর শারীরিক সুশ্রীতা
মরিচার মতো রঙের শিশু জন্ম দেবে এই ইস্পাতহৃদয়া
তরমুজ
একটি মেয়ে একটা তরমুজ কাটছে।
তার হাতে ছুরি।
তরমুজ দু`টুকরো করে ছুরির ঠান্ডা ইস্পাতের ফলা চলে গেছে ।
পাকা তরমুজের লাল বুক চিরে
তরমুজের ঘোর সবুজ রঙ্গের উপর দিয়ে তরমুজের রস গড়িয়ে পড়ছে।
কাটা তরমুজ থেকে টপটপ করে রস গড়িয়ে পড়ছে।
তরমুজের রস থেকে একটু বেশী লাল, যেন রক্ত।
দাঁত
দাঁতের পোকা মারার আশ্চর্য ওষুধ মুক্তাহাসি দাঁতের মাজন।
এই মাজন দাঁতে লাগালেই সব পোকা মরে যাবে।
দাঁতটা চকচক করবে এনামেলের মতো।
রূপার মতো, তামার মতো, টিনের মতো, দস্তার মতো, পারদের মতো।
যদি বিশ্বাস না হয় তো নিজের হাতেই পরীক্ষা করে দেখে যান--
করপোরেশনের আলোর সুইচ বক্স ঘেঁষে বসে
মাইক লাগিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে একটা লোক।
হিংস্র জন্তুর ঝকঝকে, মুক্তাহাসির মুক্তা উজ্জ্বল দাঁত।
গর্ভযন্ত্রণা এবং সৃজনসুখ
একজন ব্যক্তি বাড়িতে এখন একা একা দিন কাটাচ্ছেন।
তাঁর স্ত্রী এখন নাকি সন্তানসম্ভবা।
তাঁকে আলাদা রাখা হয়েছে।
একজন ব্যক্তি কোনো হাসপাতালের প্রসূতি-ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে
আছেন।
বন্ধ ঘরের ওপাশে তাঁর স্ত্রী।
তিনি করিডোরে একা দাঁড়িয়ে
পাখির ডাক এবং পাতার হিল্লোলের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন।
মাথা এবং গর্ত
তিনটা আঙুল পড়ে আছে।
খুলিটা মাটির হাঁড়ির মতো আলাদা ভেঙে পড়ে আছে।
একটি গর্তের মধ্যে একটি মাথা
মনে হয় যেনো রাস্তা ভেদ করে
মাথাটা ঐভাবে ওখানে পড়ে আছে।
অ্যাকোয়ারিয়াম
আমার বাড়ির আউট-হাউসে একটা দারুণ অ্যাকোয়ারিয়াম আছে।
নির্জন দুপুরে বা বিষন্ন বিকেলে অনেক সময় খুব মন খারাপ লাগে।
তখন ওখানে গিয়ে বসি।
সন্ধ্যেবেলা আলো নিভিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামের সবুজ আলোটি
জ্বেলে বসে থাকি আমি।
বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে আপন মনে খেলে বেড়াচ্ছে নানা
রঙের মাছগুলি।
ঘোর সবুজ জলের নিচে লাল রঙের মাছেরা ঘুরে বেড়ায়
অ্যাকোয়ারিয়ামের এক কোণায় ওটা কি ঘড়ি?
সময় কি বয়ে যায় গভীর জলের তলায়?
ঘোর সবুজ জলের মধ্যে শাদা অথবা বর্ণহীন মাছেরা জল ছিঁড়ে
সাঁতার কাটে,
পাশে বয়ে যায় খানকয় নৌকো।
মরা খোলার সাধুরা
একটা তাঁবুর কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে।
পিছনে গাছের পাতার ফাঁকে দু-একটা ফুল ফুটে আছে।
তাঁবুর ভিতরে ধুনি জ্বালিয়ে তিনজন সাধু নিজেদের মধ্যে
আলোচনা করছে।
কুহেলি মায়া মেশানো গভীর গাছগাছালির স্পন্দনে মরাখোলার
সাধুরা ফিসফিস করছে।
ধ্যানমগ্ন গম্ভীর পরিবেশ।
চাপ চাপ কুয়াশার মতো পরিবেশ তাঁবুর চারপাশে
শেখ মুজিবের ছবির নিচে দাঁড়িয়ে লেখা কবিতা
দেয়ালে একটি ছবি।
প্রবীণ পুরুষ।
চোখ খোলা, ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল।
সেই মৃত পুরুষের ছবির তলায় জড় হয়েছেন জীবিত বংশধরগণ।
এঁদের প্রত্যেকের চোখ বন্ধ।
নতুন ঠিকানা
টুকরা টুকরা পাখি।
সরু সরু ডালপালা নিয়ে
গাছের আনাগোনা পাখির উপরে উপরে।
একটা জবা ফুলের গাছে পাতাসমেত একজোড়া জবাফুল,
পিছনে একটা টিয়া পাখি উঁকি মারছে।
দরজার ওপার থেকে খাঁচার মধ্যে নীল, হলুদ, সবু্জ,
ছোট ছোট পাখিরা বন্দী হয়ে আছে।
উপরে নতুন পাতার ভিড়।
নিচে একটা খাঁচায় অনেক পাখির ভিড়।
একটি মানুষ ওভারব্রীজের মতো
একটি মানুষ দাঁড়িয়ে একা
ওভারব্রীজের ওপর,
তাকিয়ে আছে বাড়ির দিকে।
একটি মানুষ একাই ওভারব্রীজের ওপর,
দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির দিকে চেয়ে।
একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ওভারব্রীজের ওপর
একাই বাড়ির দিকে চেয়ে
এক্কেবারে একা।
শাড়ির দোকানে তিনজন মহিলা
কলাপাতা সবুজ শাড়ি পরা তিনজন মহিলা।
তিন মহিলাকে শাড়ির দোকানের ভিতরে
শাড়ি নিয়ে পরীক্ষা আর দরদাম করতে দেখা যায়।
যেন চাঁদের আলো দিয়ে তৈরি কাপড়।
এমন পাতলা যেন আশ্বিনের হাওয়া দিয়ে তৈরি আঁচল।
এমন নরম।
পাট করা শাড়ি প্রায় সবখানি খুলে দু-পাশে দুজন মহিলা বসে
দেখছে।
বাঁপাশের জন প্রান্ত ঘেঁষে। ডানপাশের জন একটু সরে।
রয়েছে আরেকজন মাঝখানে, কিন্তু পেছনে।
বারান্দায়
চিন্তামগ্ন এক বালিকা দাঁড়িয়ে রয়েছে,
হাত দুটো তার এক সঙ্গে ধরা রয়েছে,
সে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের কলোনিবাড়ির বারান্দায়
বাড়ির সামনের গাছগুলো আবেগভরে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
পুকুর
একটি পুকুর। একটা ডাব গাছ। সূর্য গাছটার মাথায় এসে পড়েছে।
তার রশ্মিগুলো সদ্য-ছাঁচে-ঢালা ইস্পাতের ছুঁচের মতো সোজা হয়ে
সামনের পুকুরটাতে এসে ধাক্কা খেয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুকুরটাকে সূর্যের মুখোমুখি রাখা একটি বিরাট আয়না বলে
মনে হয় আমার।
আমি সেই আয়নাসদৃশ জলের ওপর দৃষ্টি নিবন্ধ করে দাঁড়িয়ে দেখি,
পুকুর পাড়ে কাটা ডাব হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক।
মুন্ডুহীন। (মস্তিষ্কহীণ?)
তার মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওপরে ডাব গাছে ঝুলে থাকে।
মেয়েমানুষ
সবুজ শাড়ি পরিহিতা মহিলা তারে আরেকটি
সবুজ শাড়ি মেলে দিচ্ছে।
রাজা
রাজাকে কখনো আমি পুতুল ভাবি,
আবার ভিখারি বালককে কখনো রাজা ভাবি।
অর্ধ্বেক নারী অর্ধ্বেক পারফিউম
কান দুলিয়ে দুলিয়ে হীরে দেখাও,
মাছ খেতে খেতে মানতাশা দেখাও,
খোঁপা থেকে পায়েল পর্যন্ত দেখাও।
দেখাও অর্ধ্বেক নারী অর্ধ্বেক পারফিউম।
দেখাও আলস্যের চাক-ভাঙা ওম,
দেখাও অন্ধকারে জ্বলে ওঠা মোম।
কবিতায় রঙের ব্যবহার
ব্রাইট তুমি উজ্জ্বল,
ব্রাইট তুমি বুদ্ধিমান।
ব্রাইট তুমি ব্রিলিয়্যান্ট,
ব্রাইট তুমি ভাস্বর,
ব্রাইট তুমি প্রতিভাবান।
কোকো তুমি পানীয় বিশেষ
কোকোনাট তুমি নারকেল
ব্রাইট তুমি ব্রিলিয়্যান্ট।
স্কার্লেট তুমি রক্তোজ্বল।
ওরিয়েন্ট তুমি উজ্জ্বল, স্বচ্ছ।
পিঙ্ক তুমি গোলাপী।
স্কার্লেট তুমি রক্তোজ্জ্বল।
লুসি তুমি উজ্জ্বল,
লুসি তুমি বিশদ,
লুসি তুমি পরিচ্ছন্ন,
লুসি তুমি স্বচ্ছ,
লুসি তুমি নির্মল।
ভার্বোজ তুমি পল্লবিত,
ভার্বোজ তুমি শ্যামল,
ভার্বোজ তুমি তাজা,
ভার্বোজ তুমি তরুণ,
ভার্বোজ তুমি সজীব।
পিঙ্ক তুমি গোলাপী রঙ
চরমোৎকর্ষ।
পিঙ্ক গোলাপী হয়েছে শেষরাত ও লজ্জায়।
মেঘের প্রতিভা
ছেঁড়া জামা পরা এক কিশোর,
ছেঁড়া জামা তার প্রতিভা
আলো-ছায়াঘেরা আকাশের নিচে
বোরখা পরা প্রার্থনারত মহিলা,
বোরখা তার প্রতিভা
আয়না হাতে একটা বেশ্যা
আয়না তার প্রতিভা।
`মেঘের প্রতিভা` (১৯৯০) থেকে পুনর্মুদ্রিত























