লি পো থেকে আট টুকরো কবিতা

অনুবাদ: রথো রাফি

প্রকাশিত : মে ২১, ২০১৮

চীনের সিচুয়ান প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী কবি লি পো (৭০১-৭৬২) পৃথিবীজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মদ, নারী ও প্রকৃতির ওপর রচিত তার রোমান্টিক কবিতাগুলি ত্যাং ডায়ন্যাস্টির সময়কার রচিত চীনা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এজরা পাউণ্ড তার অনেক কবিতা অনুবাদ করেন। জার্মান ভাষায়ও অনূদিত হয় তার কবিতা। লি পো চীনের ইতিহাস বিখ্যাত কাব্যকার। তার মৃত্যুর ঘটনা এক ট্রাজিক ব্যাপার। মৃত্যুর দিন তিনি অতিরিক্ত মদ্যপান করে রাতের বেলা নৌকায় ঘুরতে বের হন। এরপর কাব্যিক ভঙ্গিমায় ডুবে মারা যান। আসলে তিনি নৌকা থেকে লাফ দিয়েছিলেন নদীর পানিতে, চাঁদের রিফ্লেকশনকে জড়িয়ে ধরার জন্য। অতিরিক্ত মাতাল থাকায় সাঁতারের চেষ্টা না করে আস্তে আস্তে ডুবে মারা যান। তার আটটি কবিতা বাংলায় তরজমা করেছেন কবি রথো রাফি।

এক.
স্বপ্নে চুয়াং জো হয়ে গেল প্রজাপতি
আর প্রজাপতি জেগে হলো চুয়াং জো
কোনটা যে আসল—  প্রজাপতি না মানুষ?
অশেষ পরিবর্তনের শেষটা কে বলতে পারে?

দুই.
নীল জল... কী উজ্জ্ব্বল চাঁদ...
জোছনায় উড়ছে সাদা সারসগুলো।
শোনো, বালিকাদের পানিফল কুড়ানোর শব্দ পাচ্ছো?
এত রাতে গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছে তারা।

তিন.
কতদিন হলো পূবের পাহাড়ের দিকে হাঁটি না।
ভাবছি এরই মধ্যে কতবার যে ওখানে গোলাপ ফুটেছে...
বন্ধুদের মতো সাদা মেঘ জড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ফের।
অস্তগামী চাঁদের শোভা দেখার জন্য, এখন ওখানে কার ঘর?

চার.
উজ্জ্বল আয়নার সামনে এলে আমি ভাবি,
কখন এলো হেমন্তের এই ধূসরশুভ্র তুষার!
হায়, আমার দীঘল সাদা চুল,
এই পৃথিবীর যত্নআত্তিতে কত দীর্ঘ হয়ে গেল!

পাঁচ.
নির্বাসনে কেবল ঘুরে মরা, এলাম এবার এই দীঘল সৈকতে।
বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি আমি, দিগন্তের ওই পারে,
সেই চেঙ-এন শহরের দিকে।
‌`হলুদ সারস বাড়ি`তে কেউ একজন মিঠে সুরের বংশিতে‌
বাজিয়ে চলেছে সেই `বড়ই ফুল ঝরছে` গানটার সুর...
সাগর পারের এ শহরে এখন মে মাস চলছে।

ছয়.
লেন-লিংয়ের অপূর্ব মদ, সোনার মতোই তার রঙ আর স্বাদ।
ভরে তুলুন আমার পানপাত্র, আরক্তিম সোনা রঙে তা জ্বলমল করুক!
আমাকে যদি মাতাল করতে পারেন, হে আমার অতিথি সেবক, তাইতো অনেক;
অচিন দেশে থাকার দুঃখ আর থাকবে না আমার।

সাত.
মেঙ, তোমাকে পছন্দ করি, বন্ধু আমার
সুন্দরের প্রতি তোমার টান
এই আকাশের নিচে সবার কাছেই জানা
যখন লাল চিবুকের এক তরুণ ছিলে
তোমার ঘোড়ার গাড়ি আর টুপি ত্যাগ করেছিলে;
এখন তোমার মাথা সাদা কাশবন,
শুয়ে আছ পাইন ঝাড় আর মেঘের মাঝখানে।
চাঁদ দেখে মাতাল হয়ে পড়ো
প্রায়ই যেমন স্বচ্ছতোয়া মদে চুর হয়ে থাকো;
সম্রাটের হয়ে খাটার সম্মানের চেয়ে
ফুলের নিবিড় আনন্দই বেশি পছন্দ তোমার।
তোমার মহত্ত্ব পাহাড়ের মতোই উঁচু হচ্ছে কেবল
এত উঁচু যে, কেউ তা ছুঁতে পারে না;
তবে তারা হয়তো শ্বাসপ্রশ্বাসে তোমার আত্মায়
নিহিত ওই দুর্লভ সৌরভ টের পায়।

আট.
জীবনতো এক বিপুল স্বপ্ন। এত খাটাখাটনি কেন?
মদ আর ঝিমুনি এই করেই কাটিয়ে দিয়েছি দিন
আর শুয়ে ছিলাম সদর দরজার চৌকাঠে।
জেগেই বাগানের গাছগুলোর দিকে একবার চোখ রাখি
আর শুনতে পাই, একটা পাখি, ফুলের জলসায় গান গাইছে।
দয়া করে বলুনতো, এ কোন ঋতু হতে পারে?
আহ, এই গায়ক পাখিতো আমরঙা কাকাতুয়া,
বসন্তের এই মন্দমদির বাতাসে গেয়ে যাচ্ছে সে।
আমি শুধু ডুবে আছি সেই দুঃখবিষাদেই;
আবারও মদে টুইটুম্বুর হলো এই পানপাত্র আমার, আর কখন
উজ্জ্বল চাঁদ ওঠে—  সে আশায় গাইতে থাকি জোর গলায়।
ফুরিয়ে এলো গানল—
হৃদয়ে আমার কীসের ব্যাঘাত—  মনেও নেই আর।