শাহীদ লোটাসের কবিতা

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৫, ২০১৯

বাড়ি ফেরা

যেখানে মরণ নেশায় মৃত্যু খেলা করে রজনীর মতো
সেখানে প্রশান্তি আমার মণনজাত
পৃথিবীর সমান বেদনার পথে
আমি তাকিয়ে আছি মৃত্যুর নগরীতে!
যারা ছিল আপন, বন্ধু, স্বজন, হারিয়েছে বহুদিন হলো
সেখানে রোগ অবসান সেজেছে রূপবান
সেজেছে তারকাময়ী,
এই নক্ষত্রশোভিতা মিলিয়ে আছে ওই শবার নগরে!
ওইখানে শান্তি নক্ষত্রদান অথবা যন্ত্রণার পাড়,
ওইখানে সুদীর্ঘ যৌবন জেগে আছে সমুদ্রবহ্নি যৌবন নিয়ে
ওইখানে মিলনস্থল তোমার, আমার, প্রিয়তমার,
ওইখানে বহু অচেনা মুখ সমুদ্রে বিন্দুপাত।
ওইখানে অফুরন্ত সমুদ্র বুক, অবরোধ কারাগার,
ওইখান তোমাদের পদতলে ভারি হয় শত সহস্র বছর,
শত সহস্র কাল।

আমি জেগে আছি তোমরা তা জানো না!
গৃহলক্ষ্মী মায়াবী করুণ বনে মধ্যবিত্ত পাওয়াগুলো
বাঁশবনে ডোম করে রাখে ফাল্গুন ও চৈত্রমাসে।
আর আমার ইচ্ছেগুলো লোকান্তরিত প্রেমে
হাওয়ার শূন্যতায় ছুঁয়ে যায় তার শুষ্ক মরুবুক,
এ অন্য লোক!
এ মহা জীবনে সমস্ত জীবন এসেছে একাকার হয়ে
অকিঞ্চিৎকর মূল্য অথবা কঠোর পরিশ্রম করা অনশ্বর,
অতি জাগতিক মুদ্রার আড়ালে যে ক্ষুধা আন্ধার করে রাখে
আরম্ভ আকাশে সেই ঈশ্বর।

আজ,
ঊর্ধ্ব স্থিত এক শান্তি এক বেদ-মন্ত্রদ্রষ্টা এক ঋষি
এখানে কিউ একাকিনী নয়,
একঘরে জীবনকাল জাগানিয়া
তবুও তোমাদের অন্তরে থাকে আমাদেরই ভয়!
একগুঁয়ে একপার্শ্ব হে বন্ধু, এ তোমারো বাড়ি
এসে দেখো সবুজ ঘাসের আড়ালে আমরা জেগে আছি।
অন্যকালে আমিও সহজে ভীত ছিলাম তোমাদের মতো
সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর রক্তিম আলোকছটায়
যাকে তুমি সমাধিক্ষেত্র বলো, বলো সাদা কাপড়
ফাঁপা শূন্যতায় শোকোচ্ছ্বাস অদৃশ্য কলেবর।
শয্যা গত শরীরী বিহীন আত্মা নিয়ে রাতবিরেতে
এখানেই সন্তুষ্টির জলোচ্ছ্বাস এখানে আগ্নেয়গিরি তীব্র বেদনা,
মৃত মারেফাত এখানেই শত কোটি মাজার।
মুন্সী ভয়ঙ্কর ভয়ংকর বলে যার বেদনায় ভয় ছড়ায় বেলা অবেলায়
সময় বিছানার চাদরে পাপ মোচনার্থে নেয় জরিমানা।
তোমরা যাকে নিষ্প্রাণ বলো, সে আসলে কি নিষ্কাম? নিঃশেষ নয়!
ধ্যান বেঁচে থাকার যৌবন নিয়ে চির যৌবনেই সে বেঁচে রয়
এই মানুষ সেই মানুষ তোমার অদেখায় তোমাদেরই হয়।

তোমারো আজ বাড়ি ফেরার সময় হলো
সে করুণ অশ্রু ভেজা বিদায়ের দ্বারে,
হে স্বজন, হে বন্ধু, তোমার অভ্যর্থনায় আমিও জেগে আছি
বেদনার ক্লান্ত মরুমায়া এই একাকী অন্ধকারে।

ওখানে অনেক সুন্দর

শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণ বিহিত সারারাত ধরে
সাদা সিধা কান্নাগুলো সমাধিমগ্নে কেটেছে বহুবার,
কেটেছে ঢেউ-খেলানো বন্ধনমুক্ত রুপালি আকাশে
ফন্দি-ফিকিরে যে অশ্রু আসে, আসে করুণ পদতলে
আসে ঈশ্বরের ভাবে।
বিশ্বাস করো, গৃহকর্মে সুনিপুণা এই আমি সন্ধ্যাবেলায় জ্বলিত দীপ
শক্তি, শ্বাসের আয়ত্তে ঘুমের সামর্থে
আলো আকাশের যৌবন কাল,
তোমাদেরেই চোখের ইশারায়
শয্যাশায়ী হওয়া আর রাত্রি থাকতেই ত্রাসে
চিরদিন জেগে ছিলাম,
ছিলাম যামিনী দিবায় মৃত্তিকা হয়ে,
মূর্ছিতের মতো নীরব নিঝুম মুক্তর নাড়ি ছেঁড়া ধনে,
মৃতকল্প যাকে নিয়ে করনি কোন দিন
আত্মজ আকাংখায় সুখের পায়রায়।
ভয়ভাঙা বেদনায় সাগরতীরে বিছানা চাদরে
আর পূর্ণভাবে সমাহিত হওয়ার স্থানে
নিদ্রায় মগ্ন থেকে আড়াল করে ত্রিসন্ধ্যায় বহু বেদনায়
তুমি আজ!
বিশ্বাস করো এখানে অনেক সুন্দর!
মনোরম আকাশ নেই তবোও জেগে থাকে আকাশের বুকে
মনোজ্ঞ আকাশ, রমণীয় মহা-প্রেম তৃষ্ণা জাগানিয়া
জেগে আছে মনোমুগ্ধকর শত প্রিয়তমা, সবুজ সাদা সাত রঙ
চিত্তহারিণী নির্ণয়ে আনে প্রাণ, জন্মজন্মান্তর চিতা বেদনায়
এ জন্মের মতো মায়াবী রূপে হে বন্ধু, চির বিদায়।
সুন্দরের পথে কালক্ষেপ নিঃসঙ্গ উল্লাসে
এখানে এক মুষ্টি অন্ধকারে নির্মলসলিলা,
এখানে এক পত্নী বৈচিত্র্যহীন শত বৈচিত্র্য দীর্ঘকাল স্থায়ী,
এখানে অতি রূপ নিয়ে সরাব নহর, সুস্বাদু পাখির কাবাবে
গান করে স্বর্ণের পাতা বৃক্ষ ডাল।
আমি ঘোরায় আরোহী হয়ে ভাবি তোমাদের জীবন জন্মান্তর,
গায়ত্রী উঠানে, যেখানে আজ কিছুই নেই, শূন্যের ঘরসংসারসর্বস্বা,
অতিজীবিত তোমাদের হাহাকার আর এখানে অনেক সুন্দর।

মহা লগ্ন

গন্তব্যস্থানে পৌঁছেছি!
তোমার তীক্ষ্ণ চক্ষু অথবা পঞ্চেন্দ্রিয় দেখে না কিছুই
আমার এই উত্তীর্ণ হওয়া অথবা পুরাতন জীবন নতুন করে পাওয়া।
পৃথিবীর যত প্রেম যত ব্যথা আছে আজ
যত স্বপ্ন যত না পাওয়ার কোলাহল
সবে যেন মিথ্যে মরীচিকা আর মর্ত্যলোক,
তুমি তো দেখ না কিছু।
এ কি উপগ্রহ? অন্ধকার বিবেকের মতো রুপালি ছায়া?
মাটির কদমে সাজানো দেয়াল?
শ্রুতির আড়ালে সত্য কলরব?
খানিকক্ষণ আমার চোখ স্থির হয়ে আছে!
তুমি আলতো করে চেপে দিলে পৃথিবীর সম্পাতি সন্ধ্যায়
আমার গন্তব্য মরু বহুদূর!
নির্জনতার মতো নীরস!
নিঃসঙ্গতায় স্থির হয় অনন্ত যতকাল!
পাষাণে পাষাণে ঘুটঘুটে পথ আমার!
তুমি তাকিয়ে আছ আমি সাদা পোশাকে রয়ে গেছি যেই আমিতে?
কাটখোট্টা পালকী সে শুষ্ক ও নীরস
শতেক শতেক লোকের সমাগমে
আজ যদিও অশ্রু প্লাবন, তবোও এইতো আমার
আমার গন্তব্যে পৌঁছানোর মহা লগ্ন।

আলোর আবির্ভাব

পর্দার আড়ালে অবতরণ যার
সে এক স্ফূরিত নির্ণয়,
ঘুর্ণিত এক ধাঁধার সমাপ্তি
আর অন্ধকারময় আমার ঘরের প্রদীপ।
সাংঘাতিক বেদনা নিয়ে এসেছে কাছে,
আমার পরিচিত শরীরের ভেতর মগজে মননে
সর্বত্রই সে ধীরে ধীরে এসে যাচ্ছে
আমার জীবনকে পূর্ণতা দিতে,
আমি তা বলতে পারছি না তোমাদের।
তোমরা দেখছ আমার নিথর দেহ
চলে যাচ্ছে অন্ধকারে ভূগর্ভে,
অথচ এ আলোর আবির্ভাব।