শাহেদ কায়েস
শাহেদ কায়েসের কবিতাগুচ্ছ
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯
ভাষা দে, প্রভু
মদ্যপসারিণী যুবতীরা অরণ্য জোড়ায়
‘আয় বাবু, আয় বাবু...’ পাশেই মহুয়া
ছড়ানো-ছিটানো ছোলাসেদ্ধ, হাঁড়িয়ার
জালা... ভাত নেই, ঘর নেই, স্বপ্ন নেই
কোটি মানুষের মুখ আছে, ভাষা নেই;
এরা কথা শিখেছে পাহাড়, প্রকৃতি
নদী-ফুল-পাখি, বসন্তের মাদল, ঝর্নার
জল, প্রাচীন ছিলা ও ধনুকের সংলাপ
ঝর্নার পতন, দুংরি, টিলা, চষা মাঠ...
স্বপ্নভুক দিগন্ত, জঙ্গল, অন্ধকার থেকে।
কঠিন মাটির তলে ইউরেনিয়াম, তামা
অফুরন্ত অভ্র, সোনা, লোহাপাথর, মাটির
উপরে অভাব, ক্ষুধা, শালবন, সাঁওতাল
বীরহোড়, মুণ্ডা, হো... অ-মানুষের উপস্থিতি!
হাওয়ায় ফের চড়াই, শালিখ, বনহারা ঘুঘু
ঢেউ-পাহাড়, শাল-মহুয়া, সোনাঝুরি
অলচিকির জীবনভাঙা নীরব ডাহার-ডিহি
ঘাসে রচিত হারানো ভুবনের ইস্তেহার...
ঊনত্রিশটি অদৃশ্য প্রাণ ঘুরে বেড়াচ্ছে
অরণ্য-পাহাড়ে... সিংবোঙ্গা, ভাষা দে প্রভু
ভাষা দে... কাটলো ঘুমহীন সহস্র বছর
শেষে প্রশংসাপত্র পাঠাল জঙ্গল, সুবর্ণরেখা!
মার খেতে খেতে একদিন পেটে ঠেকলে
পিঠ, অনাহার-অর্ধাহারের চিহ্ন নিয়ে গর্জে—
উঠল জঙ্গল, রোগা-কালো মুষ্ঠিবদ্ধ হাতগুলো!
নিঃসঙ্গতা
রঙকরা বিশ্বাসগুলো হুড়মুড় করে
ঢুকে যায় জোনাকি-সঙ্গমে
জেগে জেগে অবশিষ্ট রাত—
কিছুই করার থাকে না যখন
নিঃসঙ্গতার জাল বুনতে-বুনতে
ঘুমিয়ে পড়ি মাঘের বৃষ্টিতে...
ঋতুপাখি শীর্ষে, তখন মাইনাস ছয়
তীব্র লতিয়ে উঠে ভালোবাসার ভয়!
কৃষক ও কবির সেমিনার
তখন তো কৃষক জীবন
ঘুম ভাঙে খুব ভোরে, আজানের আগে
হেঁটে যাই আলপথে নীরবে
সঙ্গী ঘাস, শিশির, পাখপাখালি...
কৃষকের কাছে বউ আর ভূমিই তো সব
তাকে চাষ করতে হয় পরম আদরে
কত তার খুনসুটি! কত ছলাকলা!
কতই না প্রস্তুতি বীজ ছিটানোর আগে!
সেদিন কৃষক ও কবির সেমিনারে
শহরের শব্দচাষিরা আসেন
কবিরা কৃষকদের শোনান কবিতা
কৃষকরা তাদের শোনান প্রেম
বউ-মাটি-আদরের শিল্পকলা!
পরিব্রাজক
যৌনতাই প্রাণ, প্রাণই ঈশ্বর, প্রাণের ঐশ্বর্য মৃত্যু
ছোট ছোট ক্যানভাস, দুটি ঠোঁটের তুলি-স্পর্শ
জেগে উঠছে শরীর, চতুর্দিকে পাতার দেয়াল
অস্থির সানাই বেজে উঠলে দূরের স্নিগ্ধ গ্রামে
বিষাদের রঙে চিত্র আঁকে রঙঅন্ধ এক শিল্পী।
তীব্র রাঙতায় মোড়া সুখ, মাইনাস স্মৃতিভস্মে
লতাগুল্ম পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় আলোর খেলা
উতরাই ইচ্ছে, ঝর্ণার সঙ্গীত, রঙ-বেরঙের নুড়ি
আশ্চর্য পথ! শুরুতে কিছুটা সরু, এরপর প্রশস্ত
সে এক মুহূর্ত, হারিয়ে যাওয়া রহস্যের রহস্য
একই শরীরে দ্বিতীয়, তৃতীয়, অজস্র জীবন!
এমন নিঃশব্দ যে স্পর্শটুকু পাখির পালক—
কামরাঙা নাভিতলে খেলা করে রঙিন মৎস্য...
সীমান্তের মেয়েটি শোন
ইন্দ্রাণী, তোমাকে
চারপাশে এত এত কাঁটাতার!
জানি কোনোদিনই হবে না বলা আর
সীমান্তের মেয়েটি শোন—
আমরা সূর্যোদয়ের ভাইবোন, সূর্যাস্তের বন্ধু!
সংযোগ
বৃক্ষ আজ ব্যক্তিগত
বৃক্ষ আজ সামাজিক
বিযুক্তির শূন্যতা—
বারবার সরিয়ে দেয় দূরে...
সরে যেতে যেতে অন্ধকারে
অহেতু খুঁজি বিযুক্তির সেতু
বৃক্ষ যদি পারে
মানুষ কেন পারে না!
তবে কী মানুষ—
যথেষ্ট সামাজিক নয়?
মানুষ যতটা ব্যক্তিগত
ততটাই সে আত্মকেন্দ্রিক!
সমুদ্রের স্বাদ
এই যে এখন—
আমার শরীরে
সমুদ্র ঢুকে গেল
অন্তহীন ঢেউ...
শরীরে শরীর...
জাহাজ দুলছে!
বোধি
প্রতিটি জীবন একেকটি বৃত্ত
কখনো পূর্ণ, কখনো আংশিক
উন্মত্ত উত্তাপ, তরঙ্গের পর তরঙ্গ
পরিধিজুড়ে এত এত সংশয়!
দুই.
দৃষ্টি কেবলই কেন্দ্রে
কেন্দ্রের দিকে যেতে যেতে
পিছুটানে পরিধির মায়া...
ছুটতে ছুটতে বুঝে যাই—
যন্ত্রণাবিহীন বোধি নাই।
ঘাস
ঘাস কি ঘাসকে চুমু খায়!
তবে যে সেদিন দেখলাম—
ঘাস ঘাসকে আলতো চুমু খাচ্ছে
ঘাসফড়িং তুমুল উস্কানি দিচ্ছে!
তখন আমি সবুজ ঘাস
দুলতে দুলতে দেখে ফেলি...
স্বপ্ন
ইচ্ছে করছে—
আকাশে সাইকেল চালাই
হেলান দিই মহাশূন্যে...
প্রতীক্ষার রঙে স্বপ্ন আঁকি—
মহাকালের ক্যানভাসে!
আষাঢ়ে-শরীর
পর্যটনে মাতে আষাঢ়ে-শরীর
শরীর যায় পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণে
জোয়ারের উজান স্রোতে
লাল-নীল-হলুদ মীনেরা...
পথের প্রবল ঘ্রাণে ব্যাকুলতা
পাহাড়-সমুদ্র-নদী–
বুনোঝোপ, অতল খাঁড়াই
পথ থেকে পথে হারাই
এই যে গতি, রতির প্রীতি—
শরীরে শরীর ঘসে আগুন জ্বালাই
পাখি
পাখিরা অহিংস, পাখির ধর্ম প্রেম
আহা, মানুষ কবে পাখির মতো হবে!























