সাঈফ ইবনে রফিক

সাঈফ ইবনে রফিক

সাঈফ ইবনে রফিকের বিশটি প্রতিবাদী কবিতা

প্রকাশিত : জুন ০৮, ২০২০

যে সমাজে আমরা বসবাস করছি, সে সমাজে আমরা বসবাস করতে চাই না। তবুও বাস করতে হয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থা কিম্বা রাষ্ট্রব্যবস্থা অথবা আন্তর্জাতিক রাজনীতি জটিল এক পরিক্রমায় ঘূর্ণায়মান। যেন সময়ের কৃষ্ণগহ্বর। ন্যায়নীতি ও সততার বোধকে গিলে খাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। কোণঠাসা হতে হতে সাধারণ মানুষের ভেতর বেড়ে উঠছে ক্ষোভ। কিন্তু তা প্রকাশের ভাষা তাদের জানা নেই। অথবা জানা থাকলেও তা প্রকাশ করছে না। আর কেউ যদি তা প্রকাশ করেও, তাহলে রাষ্ট্রদ্রোহী কিম্বা কাফির হিশেবে আখ্যায়িত করে তাকে হাপিশ করে দেয়া হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই চালচিত্র আমাদের সাম্প্রতিক কাব্যসাহিত্যে খুব একটা দেখা যায় না। বেশিরভাগ কবি মত্ত থাকেন কল্পনার ঘোড়দৌড়ে। আমি-তুমি-তুমি-আমি অথবা ফূলপাখিলতাপাতা—এইসব মনোলোভা চিত্রকল্প তাদের কবিতাকে পৌনঃপুনিক করে রেখেছে। কিন্তু সাইফ ইবনে রফিক সে পথে তার কবিতার ঘোড়াকে ছোটাননি। কালিক সময়কে ধারণ করে তিনি উপলব্ধি করেন নিষ্পেষণের মর্মযাতনা। জনসাধারণ এই মর্মযাতনায় ক্ষুব্ধ, কিন্তু তা প্রকাশের শৈল্পিক ভাষা তাদের জানা নেই। তারা কবি নয়। সকলেই কবি হতে পারেও না। কেউ কেউ কবি। সাইফ যেহেতু কবি, তাই জনসাধারণের প্রতিনিধি হিশেবে তিনি কবিতার ভেতর দিয়ে ব্যক্ত করেন যাপিত সময়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তার বোধের জগতে ধ্বনিত হয়ে ওঠে মানুষের শাশ্বত সেই আকাঙ্ক্ষা, শুভবোধ মুক্তি পাক। বিভিন্ন সময়ে লেখা সাঈফের প্রতিবাদী কিছু কবিতা নিয়ে ছাড়পত্রের এই আয়োজন। আবু তাহের সরফরাজ

কেয়ামত

হে আকাশ,
তোমাকে মাটিতে নামানোর যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র;
তাকে `কেয়ামত’ বলে।
হে মাটি,
তোমাকে আকাশে উড়ানোর যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র,
তাকে ‘কেয়ামত’ বলে।
হে মাটির আদম,
গন্ধম না খেলে তোমার স্থায়ী ঠিকানায়
আলাদাই থাকতো মাটি আর আকাশ
হয়তো বিগ ব্যাং, ব্ল্যাক হোলও থাকতো—
শুধু কেয়ামত হইতো না।
আদমের ডিএনএ থেকে গন্ধম উদ্ধার করুন
হে বিজ্ঞানীগণ,
ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রামের আওতায়
কেয়মতের টিকা ছড়িয়ে দিন মানবসভ্যতায়।
সম্ভবত, এটাই হবে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত।

রোধি

পাঁচ শতক।
করোনার চেয়েও ভয়াবহ এক মহামারি দেখা দিল চীনে।
এক দক্ষিণ ভারতীয় মহাপুরুষ গিয়ে দাঁড়ালেন আক্রান্ত জনপদে।
এক নন-চাইনিজের আশীর্বাদে রক্ষা পেল চাইনিজরা।
তাকে মাথায় তুলে নাচলো।
আজ চীনের যা ঐতিহ্য— শাওলিন টেম্পল! কুংফু!
আজ চীনের যা লোকবিশ্বাস— বুদ্ধিজম!

সবই মহান সাধক বোধিধর্মের অবদান।

স্বপ্ন

বিভাজিত মানুষ আলাদা
বৈজ্ঞানিক নামে চলে যাচ্ছে!
হোয়াইট সেপিয়েন্স আর ব্ল্যাক সেপিয়েন্স
নামকরণ করে নোবেল জিতেছেন
ট্রাম্পের পকেটজীবী এক বায়োলজিস্ট!
নাকবোচা চীনারা বেঁকে বসেছে—
জাপান কোরিয়া ভিয়েতনামকে সাথে নিয়ে
তারা বলছে, আমরা `হোমো মঙ্গোলয়েড`!
লাতিন আমেরিকা বলছে, আমরা `রেডিমিক্স!`
বিপাকে বাংলাদেশ। মওলানা ইব্রাহিম বলছেন—
`ইব্রাহিম (আ.) আমাদের জাতির পিতা`
আমরা `বনি ইব্রাহিম`। আজহারীরও সায় আছে এতে।
কিন্তু ইহুদিদের আপত্তির কারণে
`বিশ্ব বিজ্ঞান সভা` এ দাবি গ্রহণ করছে না।
এ নিয়ে ঢাকার রাজপথ গরম।

আমি বললাম, দক্ষিণ এশীয়রা `বস ইন্ডিকা`।
বস বস একটা ভাব থাকলো, ইন্ডিয়াও থাকলো!
আমাকে ভারতীয় দালাল ঘোষণা করা হয়েছে।
মাথার দাম ধরেছে আইএসের বাংলা শাখা।

হুড়মুড় করে ঘুমটা ভেঙে গেল!

টাকা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হলের এক বড়ভাই বলতেন,
যখন পকেটে টাকা থাকবে না
বড়লোক বন্ধুদের সাথে চলবা।
যখন পকেটে টাকা থাকবে
গরিব বন্ধুদের সাথে চলবা।

বিস্মিত হয়ে তাকে জিগাইছিলাম,
বন্ধুত্বে আবার বড়লোক-গরিব কি?
২৫ বছর পর বড়ভাইকে ফেসবুকে পাইলাম।
পকেটভর্তি টাকা কিন্তু নিঃসঙ্গ! বউটাও ভাগছে।

আমার কেসটা পুরাই উল্টা।
পকেটে টাকার টানাটানি অথচ বিভিন্ন নেটওয়ার্কে
২৫ হাজারের মতো বন্ধু বা বন্ধুবৎসল ছোটভাই-বড়ভাই!

ক্ষমতা

লাকা দেরিদা
নিৎসে চমস্কি
মিশেল ফুঁকোর ক্ষমতার
দর্শন ঘেঁটে; আলফ্রেদ টি মাহানের
সমুদ্র শাসন আর
গেইম থিওরি আওড়ানোর পর
যখন ভারপ্রাপ্ত মাতবর
গ্রাম্য মঞ্জুর পাল্লায় পড়বেন—
তখন বুঝবেন
ক্ষমতা কী জিনিস!
ক্ষণিকের জন্য মনিব বানালে
দাসের দম্ভ দেখা যায়—
বেহায়াপনা লুকিয়ে রাখার অক্ষমতাও!

প্রশ্ন

আমি কে?
এই প্রশ্নের উত্তর যিনি
বিস্তারিত জানেন;
তার কাছে দ্বিতীয় প্রশ্ন—
আপনি কে?
তৃতীয় প্রশ্নটা একটু জটিল।
আপনার আমার মাঝে
বেহেস্ত-দোজখ কেন?

সিনেমার প্লট

দুর্ধর্ষ একটা সিনেমার প্লট মাথায় ঘুরছে।
আরাকান ক্রাইসিসের পটভূমিতে।
রোহিঙ্গা নায়িকার সাথে এনজিওতে আন্ডারকাভারে থাকা এক বাংলাদেশি স্পাইয়ের প্রেম।
সেক্স, ভায়োলেন্স, রোমান্স, সাসপেন্সতো থাকছেই
সাথে ভূ-রাজনীতি, ইতিহাস আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন।
আরও থাকবে সবুজ পাহাড়ের প্রাণবন্ত লোকেশন; আদিবাসী গান। পলিটিকাল সিনারিও!
কিন্তু এটা বানানোর মতো ইন্টেলেকচুয়াল ও পলিটিকাল ম্যাচিউরিটি বাংলাদেশের নেই।

মুম্বাইয়ের ইন্টারেস্ট না থাকার কথা।
তামিলরা ক্রাইসিসটাই বুঝবে না।
হলিউডের স্বার্থে টান পড়বে।

তাইলে আর কী?
মুড়ি খাই। সাথে চা।

সামনে কঠিন জীবন

১৯৯৩ সালে এসএসসিতে ৮২৯ পাইছিলাম।
কামের কাম কিছু হয় নাই।
দিন আনি দিন খাইয়ের জায়গায়
মাস আনি মাস খাই।
উন্নতি বলতে এটুকুই।
এক মাস বেতন না পাইলে জীবনযাত্রায় টান পড়বে!

পড়ালেখা করে যে
গাড়িঘোড়া সে নাও চড়তে পারে!
আজও নিজে একটা গাড়ি কিনতে পারি নাই।
যারা খারাপ রেজাল্ট করছো হতাশ হইও না।
যারা ভালো রেজাল্ট করছো উল্লাস কইরো না।
সামনে কঠিন জীবন।

ধৈর্য একটি অতিকায় দৈত্যের নাম

ধৈর্য একটি অতিকায় দৈত্যের নাম।
যা তোমার সব না পারা যন্ত্রণা
গিলে খায়। পিপাসায় ডুবে যায়
আশাবাদী মরিচিকায়।

হেরে যাওয়া মৃতদের
আবারও রণক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে—
যে আফিম তাজা করে তোলে
জীবনসিন্ধুর এ পাড়েই,
তাকে তোমরা ভালোবেসে
ধৈর্য নামে ডাকো।

নিউজ

কে কাকে বিয়ে করলো
কে কাকে ছাড়লো
কে কাকে নিয়ে পালালো

এইসব মুখরোচক গল্পে আড্ডা জমতেই পারে।
অবদমনের সুড়সুড়িতে গসিপ-গুজব হতে পারে।
তাই বলে এগুলো মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার নিউজ হতে পারে কি?

মানসিক রোগ

পা নেই,
কাটা পড়েছে মেশিনে—
তবু চুলকাচ্ছে বুড়ো আঙুল!
কেরানিজীবন
মেরুদণ্ড নেই—
তবু ব্যাকপেইন!
মগজহীন দেহে কেন যে
মাথাব্যথা?

মানুষ নেই
ছড়িয়ে পড়ছে মানসিক রোগ।

নাগরিক

আহা লকডাউন!
একটা কাঠের ঘোড়া
লণ্ডভণ্ড করে দিল
ট্রয় নগরী।

আর
এখানে তো জ্যান্ত গাধারাই
নাগরিক!

লকডাউন

তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে নদী
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে বোধ
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে ঘাস
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে মায়া
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে পাহাড়
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে শান্তি
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে জঙ্গল
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে শ্রদ্ধা
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে কৃষিজমি
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে ভ্রাতৃত্ব
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে সূর্যাস্ত
তোমরা যখন লকডাউন করে ফেললে অধিকার

তখন কোয়ারেন্টাইনে গেছে পৃথিবী।
তোমরা মুক্ত বাতাস ফেলে সিলিন্ডারে খুঁজছো অক্সিজেন!

সবই আজ অর্থহীন

ন্যাটো অকার্যকর
জোট ভেঙে যাবে!
মহাকাশে কত শত স্যাটেলাইট
আনবিক চোখে দেখছে পৃথিবীকে—
সবই আজ অর্থহীন।
বোমারু বিমান
মিসাইল
সাঁজোয়া ট্যাংকের বাহাদুরি
সাবমেরিন
রণতরী থেকে সাই সাই করে
উড়ে যাওয়া ফাইটার প্লেনের চাইতে
এখন এক বোতল হেক্সিসল
অথবা প্লাস্টিক জারে ভরা
স্যানিটাইজার খুব দরকার।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যুহের বদলে
পিপিই ফেসশিল্ড!

এখন ডাক্তারকে সৈনিকের মর্যাদা দিচ্ছো!
বলছো, এও এক লড়াই। অথচ যখন
এই করোনা ছিল না, তখন
মানুষই ছিল ভাইরাস।
প্রতিটি মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও
মানুষের হাতে মানুষ হয়েছে খুন।
একদিনের জন্যও পৃথিবীকে
যুদ্ধমুক্ত রাখতে পারেনি
মানবসভ্যতা।

দখলসভ্যতা

গাছ থেকে সব ক্লোরোফিল
চুরি হয়ে যাচ্ছে। আকাশ থেকে
লুট হচ্ছে মেঘ। সাগরের
জল ছিনতাই হয়েছে আগেই।
এমন কি মরুভূমির মরিচিকা,
তাও বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে—
গ্রাম্য নদী দখলের অনেক অনেক আগে
অ্যান্টার্টিকা দখল করে আছে
ইউরোপ! চাঁদের জমিও ভাগাভাগি।
আমার আকাশ কিনতে হচ্ছে
রাশিয়ার কাছ থেকে।
অক্সিজেনের ওপর ট্যাক্স বসিয়েছে
বাতাস করপোরেশন!

তোমাকে দেখলাম এক ধাপ এগিয়ে—
সূর্য নিলামে তুলেছো
মোমবাতি কিনবে বলে!

সীমিত আকারে

সীমিত আকারে বাতাসে মিলবে অক্সিজেন
সীমিত আকারে খুলে দেয়া হবে আকাশ
সীমিত আকারে মহাপ্রাণে মিলবে তোমার জড়তা
সীমিত আকারে নদী হবে চাষ
সীমিত আকারে সুবাস ছড়াবে ফুল
সীমিত আকারে বশ্যতা মানবে পুরুষ
সীমিত আকারে সমুদ্রে গলে যাবে নুন
সীমিত আকারে কল্পনায় পুড়বে ফানুষ।

এরপরও
লকডাউন ভাঙলে তোমরা জ্যোৎস্না দেখতে বের হবে না।
লকডাউন ভাঙলে ওপরে তাকিয়ে কেউ বলবে না, আজ আকাশের মন খারাপ।
লকডাউন ভাঙলে বাড়ি ফেরার তাড়া থাকবে না উড়ন্ত গাঙচিলের।
লকডাউন ভাঙলে প্রজাপতির পাখায় যোগ হবে না বাড়তি রঙ।

এসো, সীমিত আকারে আজ খুলে দেই মন—
মানুষকে ভালোবেসে দেখো,
শুয়ো পোকা থকে সে কেমন
রঙিন প্রজাপতি হয়ে ওঠে।

মানবতা

সদরঘাটও তবু ফিটফাট ছিল!
কুলিরা যেমন
একদল সিন্ডিকেট।
মনোপলি ব্যবসায়ও ছিল
মানবতা। কিছুটা ছাড়ের অংক।
বরং কসাইরা প্রফেশনাল
মুচিরা লয়্যাল আর
মেথররা পাংচুয়াল।

এমন শহরে থেকো না
যেখানে হাসপাতাল নেই।

সৎ

আমি সুযোগের অভাবে সৎ
যখন সুযোগ ছিল,
সাহস ছিল না।

দুর্নীতির এই মহাপ্রলয়ে
সুযোগ-সাহস না থাকায়
আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।

সন্তানরা আমার সততার জন্য গর্ব করবে।

কেয়ার ইমো

আমাকে দেখে শিখুন।
নিজের ছাড়া কারো পোস্ট পড়ি না।
খুবই কম পোস্টে লাইক দেই।
অন্যান্য রিঅ্যাক্ট করি না।

আর তাই
১২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন
সিনিয়র ফেসবুকার,
অথচ এখনও
কেয়ার ইমো পাইলাম না।
কেয়ার ইমো পেতে বেশি বেশি রিঅ্যাক্ট করুন।

মূর্খ

স্ট্যাটাস দিলাম, `আমি মূর্খ`।
তিনিও পড়লেন, `আমি মূর্খ`।
ক্ষেপে গেলেন।
তিনি ভাবলেন তাকেই মূর্খ বলা হচ্ছে।
আবারও জোরে জোরে শব্দ করে
স্ট্যাটাসটা পড়লেন, `আমি মূর্খ`।
তাকে হেয় করা হচ্ছে।
নিশ্চিত হলেন।

আমাকে আনফ্রেন্ড করলেন।