করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী

আবু তাহের সরফরাজের গল্প ‘এই শহরে’

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৯, ২০২২

ডেস্কে বসে একমনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের ওপর একটা উপসম্পাদকীয় তৈরি করছিল নিয়াজ। লেখাটার জন্যে দুদিন বেশ খাটতে হয়েছে তাকে। সাভার ইপিজেড এলাকায় যেতে হয়েছিল। অমানবিক সব ব্যাপার। অনেক দিন ধরে বুকের ভেতর পুষে রাখা ঠাণ্ডা রক্ত হঠাৎ করেই ছলকে ওঠে শ্রমিকদের। গার্মেন্টস মালিকরা ষোলআনা লাভ বুঝে নিচ্ছে অথচ বুঝিয়ে দিচ্ছে না শ্রমিকদের পাওনা। শোষণের চিরাচরিত চিত্র। বেঁচে থাকার দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে এলে পুলিশের হাতেই মারা পড়ল বেশ কিছু গার্মেন্টসকর্মী। আহত হলো আরও কয়েকজন। এই এক খেইল আরম্ভ হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। বেশ কিছু দিন মালিকেরা কারখানা চালিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে হুটহাট বন্ধ করে দিচ্ছে কারখানা। সকাল বেলায় কাজের জন্য এসে শ্রমিকরা দেখে কারখানার গেটে তালা ঝুলছে। আর এইসব গার্মেন্টস মালিক হচ্ছে এক একটা সেয়ানা মাল। সরকারকে দেখাচ্ছে তার কারখানা লস খাতে চলে গেছে। সরকারি ঋণ থাকলে তা মেরে দেয়ার একটা কসরত থাকে তাদের এই চালাকিতে। অথচ দেখা যায় আরেক জায়গায় জমি কিনে দালান তুলে কারখানা চালু করে ফেলেছে। ওই এলাকার শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে চামে। কেন যেন সন্দেহ হয়, সরকারি কোনও হাত থাকতে পারে এইসব চক্রান্তে। বিচিত্র কিছু না। আমাদের দেশের মন্ত্রী সাহেবদের চরিত্র তো আমাদের জানা আছেই।

আশপাশের অনেক ডেস্কই খালি। দু’একজন মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছে এখনও। কেউ কেউ এরই ভেতর বেরিয়ে গেছে।
কী বস, এখনও শেষ হয় নাই?
নিয়াজের কাঁধে একটা হাত রেখে ক্রাইম রিপোর্টার অরুণ এসে দাঁড়াল। তাকে দেখে সামান্য হাসলো নিয়াজ। চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে দিল।
শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। বেরোচ্ছেন নাকি?
হ্যাঁ। একটু আজিজ মার্কেটের দিকে যাব। দুইটা বই কিনতে হবে।
আছেন গুরু জোশে।
অরুণ হাসলো। কথা বললো না।
রিপোর্টারদের সুবিধে কী জানেন, যখন ইচ্ছে বাইরে গিয়ে ডেটিং করে আসা যায়।
বাঁশ দিচ্ছেন?
ভালো একটা বাঁশের দাম কত জানা আছে তো? এই বাজারে কে কাকে ফাউ ফাউ বাঁশ দেই বলেন। ডেস্কের ওপর ঝুঁকে পড়ে নিয়াজ। হাসি হাসি মুখে বলে, যান, বই কিনুন। প্রেম করুন। আর কী!
নিয়াজের কাঁধে একটা চাপড় মেরে চলে যায় অরুণ।

আরও খানিক সময় লাগলো লেখাটা শেষ করতে। ততক্ষণে সেকশন খালি। কম্পিউটার বিভাগে যেতে যেতে নিয়াজ দেখলো মনিরা এখনও বসে আছে। ডেস্কে বসে কী একটা বই পড়ছে। প্রুফের জন্য লেখাটা ধরিয়ে দিয়ে ফিরে এলো। ব্যাগ তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। কার কাছ থেকে যেন শুনেছিল মনিরা আর ফিচার এডিটরের ব্যাপারটা। এখন বুঝলো মনিরা আসলে বই পড়ছে না, অপেক্ষা করছে। এডিটর বেরলে দুজনে মিলে ভালো কোনও রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসবে।

ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভেতরটা খঁচে গেল। জগৎ-সংসারের নিয়মই হচ্ছে সুন্দর সুন্দর মেয়েগুলো ফিচার এডিটর টাইপ হম্বিতম্বি মানুষদের কাছাকাছি থাকার জন্যে। একটু মনও খারাপ হলো তার। বিকেলের শেষ। রোদ তবু তেতে রয়েছে এখনও। জ্যাম পড়ে গেছে। লাইনের ল্যাজ দেখা যাচ্ছে না। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ এদিক ওদিক চেয়ে দেখলো নিয়াজ, খানিক উদাসীন চোখের চাউনি। সবগুলো মানুষের মুখ একই রকম দেখতে লাগে। ঘাড়ের ওপর কোনও রকমে যেন ঝুলে আছে মাথাটা। পষ্ট বিরক্তি চোখ মুখে। হাসি পেল নিয়াজের। বেঁচে আছে সবাই, থাকতে হচ্ছে। টায়ে টায়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। একটা সিগারেট জ্বেলে বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়ালো। জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। দৌড়ে গিয়ে একটা লোকাল বাসের হ্যাণ্ডেল ধরে ঝুলে পড়লো সে। খানিক কেরিকেচার করতে হলো ভেতরে সেঁধোতে। কোনও রকমে হাতল ধরে দাঁড়াতে পারলো। দু’একবার এদিক-ওদিক তাকালো সীট খালি হয় কিনা দেখার জন্যে। হলো না। ড্রাইভারের পাশে লেডিস সীটে একটা সীট অবশ্যি খালি আছে কিন্তু সেখানে বসা মানে আরেক হাঙ্গামা। কোনও মহিলা উঠলে ভদ্রতা দেখিয়েই উঠে যেতে হয়।

বাস থামে।
হুড়োহুড়ি লেগে যায়। নিয়াজের সামনে একটি মেয়ে। চারপাশের চাপের ভেতর নিয়াজ টের পায় একটি পা তার পায়ের নিচে আটকে গেছে। একটু টাল খেয়ে নেমে যায় মেয়েটি। নামে নিয়াজও। হাঁটতে থাকে। তার সামনেই মেয়েটি। পা টেনে টেনে হাঁটছে। পায়ের দিকে চাইতেই বোঝা যায় ব্যাপারটা। স্যাণ্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে গেছে তার। নামার সময় নিয়াজের পা-ই এই অপকর্মটি করেছে। মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়ায় সে।
সরি আপু। ভিড়ের মধ্যে আসলে... অসাবধানে...
তাকাল মেয়েটি। একটু হাসবার চেষ্টা করলো, না ঠিকাছে।
সামনেই মুচি পাওয়া যাবে। আপনার স্যাণ্ডেলটা...
না না, আমিই ঠিক করে নিতে পারবো।
এটা বাজে দেখায়, চলুন।
একটু এগোতেই পাওয়া গেল মুচি। ব্রীজের নিচে, ফুটপাতে।
আমরা কিন্তু চা খেতে পারি। পাশেই চায়ের একটা দোকান দেখতে পেয়ে বললো নিয়াজ।
একটু যেন হাসল মেয়েটি। বলল, হ্যাঁ, চলতে পারে।

চায়ের কথা বলে এই প্রথম সত্যিকার ভাবে মেয়েটির দিকে তাকালো নিয়াজ। আহামরি কোনও লাবণ্য নেই চেহারায়। তবে এক রকমের মায়া আছে। কী রকম যেন সবুজ সবুজ। একটু পোড় খাওয়া চোখের চাউনি। চোখের নিচে হালকা প্রলেপে কালি পড়েছে। ঢাকা শহরে খেটে খাওয়া মেয়েদের একজন নিশ্চয়ই। স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। জীবনে একটাই মানে নিয়ে বেঁচে আছে, যে কোনও উপায়েই হোক বেঁচে থাকতে হবে। মুহূর্তের পরিচয়ে এত কথা ভেবে নেয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু নিয়াজ ভাবলো। ভাবতে ভালো লাগলো।
চা এলো। একটা সিগারেট জ্বেলে চায়ে চুমুক দিল সে। জ্যাম লেগে গেছে আবার। দীর্ঘ ল্যাজ।