চিত্রকর্ম: কামরুল হাসান

চিত্রকর্ম: কামরুল হাসান

চাঁদ সোহাগীর ডায়েরী

পর্ব ২৯

শ্রেয়া চক্রবর্তী

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

আমার কাজেকম্মে সাহায্য করার জন্য যে মহিলাটি থাকে, বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামে তার বাড়ি। ভীষণ টক খেতে ভালোবাসে। এর আগে একজন ছিল, বয়স্ক। ঢোকার সময় বলেছিল, ‘কানে একটু কম শুনি।’ বাস্তবে যা দেখলাম, মুখটা ওর মুখের যথাসম্ভব কাছে তুলে অসম্ভব উচ্চস্বরে কথা বলাও বৃথা। কারণ, যেটুকু বোঝে শব্দের উচ্চগ্রামে নয়। মুখানিভয় দেখে। কিন্তু বেল বাজালেই কী করে ‘আসছি আসছি’ বলে ছুটে আসতো, কে জানে! হয়তো বেলটা একটু বেশি জোরেই বাজতো। যত বলতাম, ‘অত জোরে কল খুলে দুমদাম আওয়াজ করে বাসন মাজবেন না, আস্তে, মেয়ের ঘুম ভেঙে যায়’, সে তত সশব্দেই কাজকম্ম সারতো। আসলে যে পীড়া থেকে ভগবান যে মানুষকে অব্যাহতি দিয়েছেন, সে পীড়া অন্যের হলে কি বোঝা যায়? ভরদুপুরে ঘুমন্ত মেয়ের কানের কাছে ঝনঝন বাসনের আওয়াজ হলে যে কী হয়, তা বোঝার দরজায় তার ঈশ্বর তালা ঝুলিয়েছেন। কারণ তার তো আওয়াজের ব্যথা নেই। কিন্তু হলে কি হবে, যেই একদিন রেগে মেগে বললাম, ‘উফ আর ভালো লাগছে না’, ওমা, বুড়ি কি করে সে কথা শুনতে পেয়ে গেল, বলে কিনা, ‘আর ভালো লাগতে হবে না, এই সপ্তাহেই শেষ!’ কী জানি হয়তো মুখাভিনয় দেখেই।

আরো আছে। এক বিহারী মহিলা ছিল। মোটাসোটা চেহারা, হাতে কাঁচের চুড়ি, পায়ে মল। বয়সটা পঞ্চাশ হবেই, কিন্তু প্রথম দিনই বলে দিলো, ‘আমাকে নাম ধরে ডাকবেন, আমাদের অনেক ছোট বয়সে শাদি হয় কিনা। আমি কিন্তু আপনাকে বৌদি বলবো।’ তো তার বেয়াদপিতে জেরবার হওয়ার জোগাড়। সকালে বাজারের ব্যাগ ধরালেই বলে, ‘আমি মাছের ল্যাজা ছাড়া খাই না।’ সন্ধ্যা হলেই, ‘দিন পয়সা দিন। ফেয়ার অ্যান্ড লাবলি কিনবো।’ রাত হলেই, ‘হরলিক্স খাব।’ সে সব তো হলো। তারপর দেখি বাড়ির পুরুত ঠাকুর যে তার হাঁটুর বয়সী সেও তাকে নাম ধরে ডাকে। পুজো টুজো কোনো রকমে চুকিয়ে দুজনের কী আড্ডা চায়ের কাপ হাতে! কাণ্ড কারখানা দেখে আমি তাকে নাম ধরেই ডাকা শুরু করেছিলাম, যদিও আড়ালে তাকে ডাকা হতো, `মুটকি` বলে। বাড়ির ড্রাইভার একদিন সর্বসমক্ষে সে কথা বলে ফেলায় সে তার কী রাগ! এই মারে তো সেই মারে, শেষে কেঁদে ফেললো। যাই হোক, তার পাকা চুল কালো করার তেলটা শেষদিন অবধি আমিই কিনে দিয়েছিলাম। যেদিন বাড়ি যাবে দেখি চুপচাপ আমার শ্বশুরের ঘরে ঢুকলো। আমি বলি, ‘ব্যাপারখানা কি?’ ‘হেহে! কাকার সেন্টটা একটু মেখে নিলাম। কাউকে বলবেন না কিন্তু।’ বলে ছমছম আওয়াজ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। পরনে লাল টকটকে শাড়ি হলুদ ব্লাউজ।

কাকে যেন একদিন ফোনে সে কেঁদে কেঁদে বলছিল, ‘তুমি আমাকে এত কষ্ট দিয়েছো, তবু আমি তোমাকে এত ভালোবাসি!’ শুনে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে গেছিলাম। সব মেয়েরাই জীবনে একজন না একজনকে এভাবেই ভালোবাসে। কিছু অনুভব শাশ্বত। তার কোনো দেশকাল সামাজিক গণ্ডি হয় না।

আরো এক ছিল ঘর পোছার মা-মেয়ে। নেহাত ঘর তো নয়, সে মানে রীতিমতো যজ্ঞ সারার মতো বাড়ি। সে মা মেয়ে অসুরের মতো শক্তিতে কাজ করতো। তাদের আবার ঘেন্নাপিত্তি কিছু নেই। নালায় ড্রেনে স্বতঃসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাত ঢুকিয়ে মরা টিকটিকি আরশোলা সব বের করে আনতো। বিরাট বড় হু হু করা ছাদ ঝপাং ঝপাং ঝেটিয়ে সাফ করতো। মেয়েটার বরের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিলো। বললাম, ‘মেয়েটাকে পড়া।’ স্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিলাম। বইখাতা সব দেয়া হলো। কিন্তু হলে হবে কি। সাত বছরের মেয়েও দেখি মায়ের সাথে ঘর ঝাড়ু দেয়। মায়ের সচেতনতা না থাকলে মেয়ের আর কি ভবিষ্যৎ! ভবিষ্যৎ তো একটাই, ‘বিয়ে দিয়ে দেব’। বিয়ে করে জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়া মায়েরাও কি করে মেয়ের জীবনের এমন গণ্ডি টেনে দেয় পরম নিশ্চিন্তে, ভগবানই জানে! তারপর ওর শরীর খারাপ হলো। ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করলাম। ওষুধ কিনে দিলাম। বলে কিনা, ‘ধুর বৌদি, জোর করে ওষুধ খাওয়ায়’ বলেই একদিন হাওয়া। কাঠির মতো রোগা হয়ে যাওয়া সেই মেয়ে শুনেছিলাম হাসপাতাল থেকেও পালিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো মরেই যাবে। কিন্তু ফিরে এলো দ্বিগুণ চেহারা নিয়ে, তাও নাকি ঝারফুকের কামাল। কেউ কিছু বললে গায়ে মাখতো না। কিন্তু আমি বকলেই কেঁদে দিতো, সেই মেয়ে যে জানতো ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধলে পয়সা নিতে নেই।

তো হ্যাঁ, এবার আসি শুরুর কথায়। শ্যামলির গায়ের রঙ ঘোর কালো। `আচ্চি` `যাচ্চি` করে সারাক্ষণ ঝড়ের বেগে কি যে বলে তা বুঝতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তার ওপর তার আবার ভূতের ভয়। সেদিন বলছিলো, ‘রাত্তিরবেলা গাইয়ের চাঁদরটা ধইরে কে যেন টাইনলো। সারা রাত গুম হয় লাই।’ এত বড় বেয়াড়া অভিযোগ। একখানা নাইটল্যাম্পের ব্যবস্থাও করে দিলাম।

আজ বিকেলে তাকে ত্রিশ টাকা দিয়ে বললাম, ‘ফ্রিজের ওপর রাখো। ধোপা এলে দিয়ে দেবে।’ সেও ত্রিশ টাকা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে ফ্রিজের দিকে চলে গেল। ধোপা যখন এসেছে গিয়ে দেখি, ফ্রিজের ওপর কোনো টাকা নেই। যথারীতি, ‘শ্যামলি টাকা কোথায় রাখলে?‘ ‘কেন ফিরিজে লাই?’ এই বলে সে যত্রতত্র খোঁজা শুরু করলো। কোথাও খুঁজে না পেয়ে সারা বাড়ি ঝাড়ু দিয়ে ফেললো কিন্তু টাকা কোথাও পাওয়া গেল না। শ্যামলির মুখ গম্ভীর। আমি তখন ভাবছিলাম, সত্যিই ভূত আছে কিনা। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো শ্যামলির কথা, ‘কেন ফিরিজে লাই?’ এ কথার মানে উদ্ধার করার জন্য যেই ফ্রিজের দরজা খুলেছি অমনি দেখি ঠাণ্ডা জলের বোতলের পাশে ত্রিশটা টাকা কেমন বাচ্চার মতো ঘুমোচ্ছে, শরীর তাদের কনকন করছে! শ্যামলিকে ডেকে দেখাতেই সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বললো, ‘আপনিই তো বললেন ফিরিজের অপরটায় রাখতে। তাই ভাবলাম...’

আমি মনে মনে শ্যামলিকে পেন্নাম ঠুকে ঘরে চলে এলাম।

লেখক: কবি

ধারাবাহিক