চার ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় ৪ খণ্ডের বাংলাদেশ
রেজাউল করিমপ্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬
একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না। কখনো শুধু তার শিশুদের আলাদা আলাদা সত্য শেখালেই যথেষ্ট। বাংলাদেশে আমরা ঠিক সেই কাজটিই করছি। একই পতাকার নিচে জন্ম নেওয়া শিশুদের আমরা ৪টি আলাদা ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছি। একটি ঘরে বাংলা মাধ্যম, একটি ঘরে ইংরেজি মাধ্যম, একটি ঘরে মাদ্রাসা, আরেকটি ঘরে ক্যাডেট কলেজ। তারপর বারো বছর ধরে তাদের আলাদা ভাষা, আলাদা শ্রেষ্ঠত্ববোধ, আলাদা ভয় এবং আলাদা বাংলাদেশ শেখাচ্ছি।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের একই রাষ্ট্রে ছেড়ে দিয়ে অবাক হয়ে প্রশ্ন করছি, তারা পরস্পরকে বিশ্বাস করে না কেন! বাংলা মাধ্যম তৈরি করছে পরীক্ষিত অথচ পরাজিত মানুষ। বাংলা মাধ্যমের শিশুকে বলা হয়, মন দিয়ে পড়লে মানুষ হবে। কিন্তু বিদ্যালয়ে গিয়ে সে শিক্ষক পায় না, বিজ্ঞানাগার পায় না, কার্যকর ইংরেজি শেখে না, প্রশ্ন করার স্বাধীনতাও পায় না। সে শেখে মুখস্থ করতে। সে শেখে পরীক্ষকের প্রত্যাশিত উত্তর লিখতে। সে শেখে সত্য নয়, নম্বরই জ্ঞানের প্রমাণ।
বারো বছর পর হাতে একটি সনদ ধরিয়ে তাকে এমন চাকরির বাজারে পাঠানো হয়, যেখানে তার ভাষা, পোশাক, উচ্চারণ ও আত্মবিশ্বাস দেখে যোগ্যতা মাপা হয়। রাষ্ট্র প্রথমে তাকে দুর্বল শিক্ষা দেয়। তারপর সেই দুর্বলতার জন্য তাকেই অপমান করে। এটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পিছিয়ে রাখার ব্যবস্থা। ইংরেজি মাধ্যম তৈরি করছে দেশের ভেতরে সুবিধাপ্রাপ্ত বিদেশি। ইংরেজি মাধ্যমের শিশুকে বৈশ্বিক পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করা হয়।
সে ভালো ইংরেজি বলে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপনা করে এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চেনে। কিন্তু তার একটি অংশ নিজের মাতৃভাষায় গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখে না। সে শেক্সপিয়র চেনে, কিন্তু লালনকে নয়; ইউরোপের ইতিহাস জানে, কিন্তু নিজের গ্রামের ইতিহাস জানে না; বৈশ্বিক নাগরিক হওয়ার প্রশিক্ষণ পায়, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই বিচ্ছিন্নতাকেই আমরা সাফল্য বলে উদ্যাপন করি।
বাংলা না জানাকে আধুনিকতা, বিদেশি উচ্চারণকে মেধা এবং সাধারণ মানুষের জীবন থেকে দূরে থাকাকে আভিজাত্য মনে করি। এই শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান তৈরি করছে না। তৈরি করছে সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিভাগ। এখানে ইংরেজি একটি ভাষা নয়, ক্ষমতার পাসপোর্ট। আর বাংলা যেন গরিবের পরিচয়পত্র। মাদ্রাসা তৈরি করছে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক নৈতিক রাষ্ট্র। মাদ্রাসা বহু দরিদ্র শিশুকে আশ্রয়, খাবার ও শিক্ষা দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন দরিদ্র শিশুর আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার দায়িত্ব নেয় না, তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সেই শূন্যতা পূরণ করে।
পরে সেই শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের সঙ্গে না মিললে রাষ্ট্রই আবার বিস্মিত হয়। সমস্যা ধর্মশিক্ষা নয়। সমস্যা হলো, কোনো শিশুকে যদি পৃথিবীর সব জ্ঞান একটি মাত্র বিশ্বাসের জানালা দিয়ে দেখতে শেখানো হয়, তাহলে সে ভিন্নতাকে সত্যের আরেকটি সম্ভাবনা হিসেবে নয়, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। তখন গান হয়ে যায় পাপের প্রশ্ন। নারীর স্বাধীনতা হয়ে যায় নৈতিক আতঙ্ক। ভিন্নমত হয়ে যায় ধর্মদ্রোহিতা। সংস্কৃতি হয়ে যায় শুদ্ধতা পরীক্ষার বিষয়।
অন্যদিকে তথাকথিত আধুনিক সমাজ মাদ্রাসাশিক্ষিত সবাইকে অজ্ঞ, উগ্র বা পশ্চাৎপদ বলে অপমান করে। ফলে দুই পক্ষই পরস্পরের মানুষটিকে দেখে না, শুধু পরিচয়ের পোশাকটি দেখে। এই অবজ্ঞার বাজার থেকেই ধর্মীয় উগ্রতা রাজনৈতিক পুঁজি সংগ্রহ করে। ক্যাডেট কলেজ তৈরি করছে শাসিতদের ভিড়ে শাসকের মানসিকতা। ক্যাডেট কলেজে নির্বাচিত কিছু শিশুকে রাষ্ট্র উন্নত আবাসন, শৃঙ্খলা, খেলাধুলা, নেতৃত্ব, ইংরেজি ও আত্মবিশ্বাস শেখায়। অন্যদিকে সাধারণ বিদ্যালয়ের শিশু একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কিংবা ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের জন্য অপেক্ষা করে।
একই রাষ্ট্র একদল শিশুকে শেখায় কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠকে শেখায় কীভাবে নির্দেশ মানতে হয়। শৃঙ্খলা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্নহীন শৃঙ্খলা মানুষ তৈরি করে না, অনুগত কাঠামো তৈরি করে। নেতৃত্বের সঙ্গে সহমর্মিতা না থাকলে আত্মবিশ্বাস সহজেই শ্রেষ্ঠত্ববোধে পরিণত হয়। তখন পদমর্যাদা যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, আদেশ যুক্তির জায়গা দখল করে এবং সাধারণ মানুষকে নাগরিক নয়, পরিচালনার বিষয় মনে হয়।
আসলে আমরা ৪ ধরনের শিক্ষার্থী নয়, ৪ ধরনের অহংকার তৈরি করছি। বাংলা মাধ্যমের একাংশের অহংকার— আমরাই আসল দেশকে চিনি। ইংরেজি মাধ্যমের একাংশের অহংকার— আমরাই আধুনিক ও যোগ্য। মাদ্রাসার একাংশের অহংকার—আমরাই নৈতিক ও সঠিক। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের একাংশের অহংকার—আমরাই নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জন্মেছি। এই ৪ অহংকার যখন রাজনীতি, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখোমুখি হয়, তখন আলোচনা হয় না। শুরু হয় পরিচয়ের যুদ্ধ।
কেউ কাউকে বোঝাতে চায় না। সবাই অন্যকে পরাজিত করতে চায়। কারণ শিক্ষা তাদের সত্য অনুসন্ধান করতে শেখায়নি। নিজের শেখানো সত্যকে রক্ষা করতে শিখিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ তারই আয়না। আজ বাংলাদেশের তরুণেরা রাষ্ট্র, ধর্ম, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, নারী, মতপ্রকাশ এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে যেভাবে পরস্পরকে শত্রু বানাচ্ছে, তা আকস্মিক নয়। এটি বহু বছরের বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ফসল। কেউ ১৯৭১-কে নিজের রাজনৈতিক সম্পত্তি বানিয়েছে। কেউ ১৯৭১-কে একটি দলের সম্পত্তি বলে ইতিহাস থেকেই সরিয়ে দিতে চায়।
আবার কেউ ২০২৪-কে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় নয়, আগের সব ইতিহাস ধ্বংস করার হাতুড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে। একটি পরিণত জাতি নতুন ইতিহাসকে পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। একটি অপরিণত জাতি প্রতিটি নতুন ঘটনার পর পুরোনো ইতিহাসের কবর খোঁড়ে। আমাদের পাঠ্যবই ইতিহাস শেখায় না, ক্ষমতার স্মৃতি শেখায়। সরকার বদলালে অধ্যায় বদলায়, নায়ক বদলায়, অপরাধী বদলায়। শিশু বুঝে যায়, সত্য স্থায়ী নয়; যার হাতে ক্ষমতা, সত্য তার। এর চেয়ে ভয়ংকর শিক্ষা আর কী হতে পারে?
এই বিভাজন কোনো দুর্ঘটনা নয়। ধনী ব্যক্তি চায় তার সন্তানের শিক্ষা আলাদা থাকুক, কারণ আলাদা শিক্ষা তার শ্রেণিগত সুবিধা রক্ষা করে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ চায় তার শিক্ষাজগৎ আলাদা থাকুক, কারণ বিচ্ছিন্নতা তার অনুসারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান চায় বিশেষ বিদ্যালয় অক্ষত থাকুক, কারণ সেখান থেকে ক্ষমতার পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনরুৎপাদিত হয়। রাজনীতিবিদ চায় ইতিহাস বিভক্ত থাকুক, কারণ বিভক্ত স্মৃতি থেকে অনুগত ভোটার তৈরি করা সহজ। তাই শিক্ষার ঐক্য নিয়ে সবাই বক্তৃতা দেয়, কিন্তু কেউ নিজের সুবিধার দেয়াল ভাঙতে চায় না।
সব শিশুকে একই রকম বানাতে হবে না। কিন্তু অন্তত একটি অভিন্ন নাগরিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একই মানের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, যুক্তিবিদ্যা, সংবিধান, নাগরিক অধিকার এবং দলিলভিত্তিক বাংলাদেশের ইতিহাস শিখতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা থাকবে, কিন্তু ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা থাকবে না। ইংরেজি থাকবে, কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি লজ্জা থাকবে না। শৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন করার অপরাধ থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধ থাকবে, কিন্তু দলীয় মালিকানা থাকবে না। ২০২৪ থাকবে, কিন্তু ১৯৭১ মুছে দিয়ে নয়।
বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীদের একই মাঠে খেলতে, একই সামাজিক প্রকল্পে কাজ করতে, একই বিজ্ঞানমেলায় অংশ নিতে এবং একই ইতিহাসের স্থানগুলো দেখতে হবে। কারণ মানুষকে দূর থেকে সহনশীলতা শেখানো যায় না। মানুষকে মানুষের কাছে আনতে হয়। বাংলাদেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, সনদ বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ কি বেড়েছে? যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, সেটি প্রশিক্ষণ। যে শিক্ষা অন্যকে ঘৃণা করতে শেখায়, সেটি মতাদর্শ।
যে শিক্ষা শ্রেণিগত দেয়াল রক্ষা করে, সেটি ব্যবসা। আর যে শিক্ষা নাগরিককে নাগরিক থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সেটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রেরই ষড়যন্ত্র। আমরা শিশুদের হাতে বই দিচ্ছি, কিন্তু তাদের মাঝখানে দেয়াল তুলছি। একদিন হয়তো তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত হবে। কিন্তু একই দেশের মানুষ হয়ে পাশাপাশি বসার মতো একটি সাধারণ ভাষা আর তাদের থাকবে না। সেদিন বাংলাদেশের মানচিত্র থাকবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানও থাকবে। শুধু জাতি নামের দার্শনিক বন্ধনটি আর থাকবে না।
























