জাহিদ সোহাগের গল্প ‘ঘড়ি’

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬

মাদ্রাসার ঘড়িটা কখনো পাঁচ মিনিট পিছিয়ে থাকে, কখনো এগিয়ে। রায়হান প্রথম দিনেই ব্যাপারটা দেখে, চুপে চুপে নিজের ঘড়ির সঙ্গে মেলায়। বাড়ির ঘড়ি হলে সব পার্টস খুলে তছনছ করত। তারপর ঠিকই ঠিক করে ফেলত।

মুহতামিম রায়হানকে ঘড়ি দেখতে দেখেছেন। কখন সত্যিটা বলবেন, তা ভাবছিলেন। আসর শেষে সবাই মাদ্রাসার আশপাশে ঘুরতে গেলে রায়হানকে থাকতে বলেন।

ওর মুখ ঘামতে শুরু করল।
‘সময় আগে-পিছে হওয়া আল্লার হুকুম। আল্লার হুকুম ছাড়া কিছু হইতে পারে?’
রায়হান না-সূচক মাথা নাড়ায়।
‘তাইলে ঘড়ি দেখোনের কাম নাই, আর নিজেরটাও জমা দেও।’

রায়হান নিজের হাত থেকে ঘড়ি খুলে মুহতামিমের হাতে জমা দেয়। ঘড়িটা হাতে থাকলে রায়হান মনে করে, মামা ওর সাথে আছে। মামা সৌদি যাওয়ার সময় ঘড়িটা ওকে পরিয়ে দেয়।

রায়হানকে অন্যমনস্ক দেখে মুহতামিম ধমক দেয়, ‘যাও কাজে যাও।’
রায়হান মাদ্রাসার বাইরে গেল না, কেউ কেউ ওকে উঁকি দিয়ে দেখল।

ভর্তি হওয়ার দিন বাবা ওকে নতুন টুপি কিনে দিয়েছিল। সাদা। টুপির ভেতর মায়ের হাতে সেলাই করা একটা ছোট নীল সুতো ছিল। মা বলেছিল, ‘হারাই গেলে চিনতে পারবি।’
ও দেয়ালে হেলান দিয়ে নীল সুতাটা নখ দিয়ে খুটছিল।

অটোরিকশায় বাবার সঙ্গে আসতে আসতে রায়হান বলেছিল, ‘আব্বা, হাফেজ হইতে পারলে কয়জনে ভেস্তে নিতে পারমু?’
‘সবাইরে পারবি।’
‘কোনো লিমিট নাই?’
‘জানি না বাপ্। কোরানের ক্ষমতার আবার লিমিট আছে নি?’

রায়হান ২ সপ্তাহ পর আধঘণ্টার জন্য ছুটি পেত। অটোরিকশা নিলে বাড়ি যেতে যেতে সময় ফুরিয়ে যায়। প্রথম দিন মা গরুর দুধ দুইয়ে সেমাই রান্না করছিল, আর রায়হান বোনের সঙ্গে ঘড়ির গল্প করছিল। সেমাই খেয়ে মাদ্রাসায় যেতে যেতে ঘণ্টা পেরিয়ে যায়।

মুহতামিম তাকে ফিরতে দেখে ফেটে পড়ে, ‘পায় কী শিকল বাইন্ধা দিতে হইব? দিমানে খাড়াও।’ তারপর চারপাশে পড়তে থাকা ছাত্রদের মাঝখানে তাকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে।

মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে অনুমান করে, সময় বেড়ে গেল, না কমে গেল। পড়ার মাঝখানে সবাই খাবার খেতে যায়। রাতের খাওয়া শেষ করে আবার পড়তে বসে। রায়হান কান ধরে দাঁড়িয়েই থাকে।

দুই.
মুহতামিম তাবলিগে ফিলিপিন যান, মাদ্রাসার দায়িত্ব নেন ক্বারি রফিকুল সাহেব। ক্বারী সাহেব রায়হানের হাতে একটি চকোলেট দিয়ে বললেন, ‘তুমি আজকা আমাগো বাথরুম ব্যবহার করবা। এইডা পরিষ্কার আছে।’ সে মাথা নাড়াল।

রায়হান বারোটার দিকে জামাকাপড় নিয়ে হুজুরদের রুমে ঢোকে। ক্বারি রফিকুল ও জাবের হাফেজ বিছানায় বসে গল্প করছিল। সে সালাম দিলো। দুজনই মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো।

বাথরুমের দরজায় ধাক্কার শব্দ পেল রায়হান। কী করবে বুঝতে পারল না। হাফেজ সাহেব বলল, ‘রায়হান, দরজা খোলো, আমার মেসওয়াকটা নেব।’

রায়হান দরজা খুললে হাফেজ সাহেব বলেন, ‘কী তুমি ফরজ তরক কইরা গোসল করো?’ রায়হান হাঁটুর নিচ বরাবর গামছা দেখল, তারপরও টানলো।

‘শোনো ফরজ তরক করলে জ্বিনে বা শয়তানে ধরে। তখন অনেক অসুবিধা হয়।’ হাফেজ সাহেব ক্বারি সাহেবকে ডাকেন জ্বিনে ধরছে কি না, দেখানোর জন্য।

ক্বারি সাহেব একটানে রায়হানের গামছা খুখে ফেলে।

তিন.
মাইকে জোহরের আজান হতে থাকে। রায়হান নিঃশব্দে গলা মেলাতে থাকে। হাইয়া আলাল ফালা পড়তে গিয়ে তার গলা ধরে আসে। পেছনে ভীষণ ব্যথা, নড়াচড়া করতে পারছে না। লুঙ্গিতে দেখেছে রক্তের ছোট এক ফোঁটা। শরীরে জ্বরের ঘোর আসে।

তাকে বিমর্ষ দেখে সাব্বির হাফেজ বলে, ‘রায়হান নামাজ কাযা কইরো না। জলদি যাও।’ রায়হান দুই হাতে ভর দিয়ে উঠতে চেষ্টা করে।

হাফেজ কামরুজ্জামান হাসতে হাসতে বলে, ‘কী জ্বিনে ধরছে?’ রায়হান ভাবলেশহীন তাকায়। ‘আসো ঝাইরা দেই, জ্বিন পালাইব।’

হাফেজ কামরুজ্জামান তার শরীরে হাত বুলিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়, ‘দেখবা দুই-একদিনের মইধ্যে জ্বিন চইলা যাইব।’ তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার মায় তোমার মতো সোন্দর?’ উত্তরের আশা না করে হাফেজ কামরুজ্জামান ফ্লোরে ভেজা পায়ের ছাপ ফেলে মসজিদে যায়।

আজ রায়হানের বাড়ি যাওয়ার দিন। দেরি হওয়ার ভয়ে তার মা আগেই সেমাই রান্না করে রেখেছে কিনা, ভাবতে ভাবতে সে ঘ্রাণ পায়। রায়হান বাড়ি যেতে পারে না, তার বেদম জ্বর আসে।

রাতে সে ঘুমায় নাকি জ্ঞান হারায়, বুঝতে পারে না। শুধু মনে আছে হাফেজ কামরুজ্জামান তাকে ন্যাংটো করতে করতে বলছে, ‘তোমারে জ্বিনে ধরছে। জ্বিন ছাড়াইতে হইব। আমার সাথে সাথে পড়, কুল্ ঊহিয়া ইলাইয়্যা আন্নাহুস্ তামা‘আ নাফারুম্ মিনাল্ জিন্নি ফাক্ব-লূ য় ইন্না-সামি’না- কুর আ-নান্ আজ্বাবাঁ-।’

ক্বারি ও হাফেজরা একে একে রায়হানের জ্বিন তাড়ায়। রায়হান অনুভূতিহীন ঘুমের দেশে পড়ে থাকে।

চার.
রায়হান বাড়ি না যাওয়ায় তার বাবা একদিন আসে। হাফেজ সাহেব বলে, ‘রায়হানের ওপর জ্বিনের উৎপাত বেড়ে গেছে।’
রায়হানের বাবা ভয় পেয়ে বলে, ‘কী? জ্বিন?’
হাফেজ সাহেব বলে, ‘এখনই জ্বিনে ধরার সময়। আলহামদুলিললাহ বলেন। আপনার ছেলের হাফেজ হওয়ার নিয়ত আল্লাপাক কবুল করেছেন।’

রায়হান বাবার সামনে ভাবলেশহীন বসে থাকে। বাবা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার দেয়, খেতে বলে। রায়হান পড়ে খাবে বলে ঠেলে দেয়। বাবা তাকে ছুঁয়ে দেখে গায়ে জ্বর। হাফেজ সাহেব বলে, ‘জ্বিনে ধরলে গায়ে জ্বর আসে। আপনারা চিন্তা করবেন না।’

হুজুররা খাবার পরীক্ষা করে সেমাইয়ের বাটিটা আলাদা করে রাখে। ‘ভাইজান, এইটা নিয়া যান, এইটা জ্বিনের খাবার।’

পাঁচ.
ফজরের আজান হলে সবাই উঠে বিছানাপত্র গুটিয়ে রাখে। রায়হান ভাবলেশহীন ভাবে, আজানটা কোন জায়গা থেকে আসে? মসজিদ থেকে? নাকি মাইকের ভেতর থেকে? নাকি ঘড়ির ভেতর থেকে? মুহূর্তেই সে দেখে, মসজিদে একামাত দিচ্ছে ক্কারি সাহেব। সে-ও দৌড়ে নামাজে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে কী নামাজ পড়ছে!

প্রায়ই রাতে, দুপুরে, গোসলের আগে তাকে ডেকে নেয় সিনিয়র ছাত্ররা, হাফেজ-মাওলানারা। কেউ বাথরুমে, কেউ অন্য ঘরে। সবার একটাই কথা, ‘কাউরে কইস না। কইলে জ্বিন জীবনেও তোরে ছাড়ব না।’

হাফেজ সাহেব নিজের বুকে রায়হানের হাতে নিয়ে বলে, ‘এইখানে পবিত্র কোরান। আল্লাপাকের কালাম। কথা দে, জ্বিন ছাড়ানোর কথা কাউরে কবি না। কোরান ছুঁইয়া ক।’
রায়হান সবার কথাতেই মাথা নাড়ে।

ছয়.
মাদ্রাসায় কীভাবে যেন খবরটা ছড়িয়েছে। একরাম বলে, ‘রায়হান মিছা কতা কয়। ওর কতা কে হুনে।’ ক্বারি রফিকুল সাহেব বেত নিয়ে তেড়ে এসে সবাইকে আচ্ছামতো পেটায়, ‘একদম চুপ। কোরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে, আল্লাপাকের বিরুদ্ধে কোনো কথা কবি না।’

রায়হান একদিন ফজরের ওয়াক্তে মাদ্রাসা থেকে পালায়। এর আগে পালাতে গিয়ে বেদম মার খেয়েছিল। বাড়িতে গেলে বাবা কান মুচড়ে থাপ্পর দিতে দিতে রিকশায় তুলে বলে, ‘কয়দিন পর হাফেজ হবি, আর এহনই শয়তানের পাল্লায় পড়ছস?’

রিকশা মাদ্রাসার দিকে যেতে থাকে। রায়হান রিকশাওয়ালাকে নিজের কথা বলে, তার মায়ের কাছে বলতে বলে। রিকশাওয়ালা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘কোরানের বিরুদ্ধে যাইও না। আল্লায় গজব দিব।’

মাদ্রাসায় গিয়ে রায়হান দেখতে পায় মুহতামিম দাঁড়িয়ে আছে বেত নিয়ে। ক্বারি ও হাফেজ সাহেব ঘাড় ধরে রায়হানকে আছড়ে ফেলে মুহতামিমের সামনে। মুহতামিমের বেত চলতে থাকে মেশিনের মতো।

সাত.
সকালে রায়হান ভ্যানে শুয়ে শুয়ে বাড়ি যায়। মাদ্রাসার হুজুররা আগে পিছে অটোরিকশায় ওর ঘুম পাহারা দেয়। ওর বাবা আগেই বিছানা পেতে রেখেছে, ও গেলেই বাঁশের চাঁই ও কলাপাতা দিয়ে ঘুম ঢেকে দেবে। ওর মা গরুর দুধ দুইয়ে সেমাই রান্না করেছে হুজুরদের জন্য।

পুলিশ আসে। মুহতামিম বলে, ‘কোরানে মুর্দাকে কোথাও নেওয়ার কোনো বিধান নাই। যত তাড়াতাড়ি কবর হবে, তত আযাব কম হবে।’

পুলিশ আমতা আমতা করে কিছু বলতে গেলে, মুহতামিম তাকে থামিয়ে বলে, ‘সবই আল্লার ইচ্ছা। আল্লার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাইয়েন না।’

আট.
কয়েক দিন রায়হানের বাবা থানায় যায়। সারা দিন বসে থাকে। মাঝে মাঝে দেওয়াল ঘড়ির সঙ্গে ফোনের সময় মেলায়।
পুলিশ বলে, ‘মামলা করবেন কার বিরুদ্ধে?’
রায়হানের বাবা বলে, ‘জ্বিনের বিরুদ্ধে।’
পুলিশ বলে, ‘জ্বিনের বিরুদ্ধে আমরা মামলা নিই না।’

রায়হানের বাবা ভেবে পায় না, জ্বিনকে কীভাবে শাস্তি দেবে। আরেকটা ছেলে হলে আগামীকালই তাকে হেফজখানায় পাঠাত। হাফেজ বানিয়ে জ্বিনকে শাস্তি দিতে পারত।

ভেবে ভেবে বাড়ি ফিরে দেখে, কুলসুমা উঠানে খেলছে। তাকে কোলে নিয়ে বলে, ‘মা, তুমি হাফেজ হইবা?’
কুলসুমা বলে, ‘হাফেজ কী, আব্বা?’
রায়হানের বাবা বলে, ‘এই দুনিয়ার লড়াই হইল জ্বিন আর হাফেজের লগে। তুমি হাফেজ হইয়া জ্বিনগো মারবা।’

কুলসুমা বাবার কোল থেকে নেমে আবার খেলায় মন দেয়।