পপিয়া জেরীনের গপ্পো সপ্পো

পর্ব ৯

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৯, ২০১৯

মোকামতলায় আমার দাদাবাড়িতে একটা বিয়া হইতেছিল, আমার যতদূর মনে পড়ে। শ্যাওলা ধরা একটা কুয়ারে ঘিইরা একদল মহিলা গীত গাইতেছে, নতুন বউ-জামাই দুইজনই কুয়ায় ঝুইকা আছে। গীতের বেশিরভাগ শব্দই অস্পষ্ট, একটা লাইন বারবার ঘুরে আসতেছে, পান দিয়া গুয়া দিয়া লো...

আমার খুবই হাসি পাইতেছিল, এই গুয়া জিনিসটা আসলে কী হইতে পারে সেইটা অনুমান করতে করতে। সবাই উলু দেওয়া শুরু করলো, আশ্চর্য! এইটা হিন্দু বিয়া না, অথচ সবার সিঁথিতে সিন্দুর অল্প কইরা। আমি কুয়ার পানিতে তাকায়ে আছি, পানি থিক্ থিক্ করতেছে। ছাই দিয়া বাসন মাজার পর ঘাটলার পানি যেমন ছাইরঙা হয়, ঠিক তেমন সুরমারঙ্গা কুয়ার পানি। তবু পানিতে স্পষ্ট দেখলাম, নতুন বউ-জামাই নিজেদের মুখ জোড়-পান দিয়া ঢাকছে। আম্মু আমারে টাইট করে জড়ায়ে রাখছে, যাতে কুয়ায় না পড়ি। আমি আম্মুর তখনকার চেহারা মনে করার চেষ্টা করি, মনে পড়ে না। নতুন জামাই-বউয়ের চেহারাও মনে নাই।

সন্ধ্যার আগ দিয়া এই শুভদৃষ্টি হইতেছিল। এই হইহল্লার মধ্যে কে জানি চিৎকার দিলো, বরখা কই! বরখা কই! কয়েকজন ডাকতেছে, বরখা... বরখা! বরখা কোথাও নাই। একটা কানা বুড়ি (সম্ভবত বরখার দাদি ছিল সে) বলতেছিল, গোরস্থানের দিকে দেখ, বরকির খুডাটা জঙ্গলে জড়ায়া যায়। ব্যা ব্যা শুইনা কইছিলাম ঐডারে ছুটায়া আনতে।

সেই রাত্রে বিয়াবাড়ির আনন্দ পণ্ড হইছিল। বরখারে আর বাঁচানো যায় নাই। অনেক রাত্রে আম্মু আব্বুরে ধইরা বলতেছিল, কোনো কবরে একটা ফাটল আছে, সেইটার ভিতরে বরখা পইড়া কাৎরাইতে ছিল। ওরে তুইলা আনার পর দেখা গেল, সারা শরীর সাদা। রক্ত পড়তে পড়তে সাদা হয়ে গেছে ও। সবাই নাকি বলতেছিল, পিশাচ রক্ত চুইষা নিছে। আম্মা বারবার বলতেছিল, পিশাচ রক্ত চুষলে ওই জায়গা দিয়া রক্ত পড়বে কেন?

আমি ঘুমের মধ্যেই এই কথাগুলি শুনতে পাইতেছিলাম। বরখার জন্য খুব খারাপ লাগতেছিলো আমার। ইশারা আর গোঁ গোঁ করতো, কথা বলতে পারতো না মেয়েটা। কানেও কম শুনতো। আমার এখনও মনে আছে, একটা ছাগলের বাচ্চা কোলে নিয়া সারা উঠান ঘুরতো মেয়েটা, বয়স তেরো-চোদ্দ। সেই বিয়াটার দিন সে কালোর মধ্যে ছোট ছোট সাদা ফুলের একটা কামিজ পরা ছিল।

একটু বড় হওয়ার পর আম্মুরে আমি প্রায়ই প্রশ্ন করতাম, আম্মু, বরখায় কোন জায়গা দিয়ে রক্ত বের হইছে? আম্মু নিশ্বাস ফেইলা অন্য কোনো কথা বলতে চাইতো, বেশি জ্বালাইলে বলতো, কে তোমারে এইসব বলছে? কই থিকা এই গল্প শুনছো তুমি?

একদিন আম্মু খুবই বিরক্ত হইলো, বললো এই অত্যাচার আর সহ্য হয় না। ওকে, শোনো তাইলে, মুতু কর যে দিক দিয়া, সেই দিক দিয়া। এইবার শান্তি হইছে? কিন্তু এখন তুমি আমারে বলো, এই গল্প তোমারে কে শোনাইছে? তোমার আব্বু?

আমি বললাম, না! আমি তো দাদাবাড়ির সেই বিয়াতে ছিলাম, তুমিও ছিলা। একটা কুয়ার সামনে মুখের উপর দুইটা পান একটু কোনা করে ধরে রাখছে নতুন বউ আর জামাই। মহিলারা গীত করতেছে। কুয়ার পানিতে ওরা ঝুইকা আছে। শুভদৃষ্টির পর ওই পান আর সুপারি কুয়ার পানিতে ফেলা হইলো। তখন সবাই বলতেছিল, বরখা কই, বরখারে পায় না।

আম্মা আমারে থামায়ে বললো, এইসব কী বলস তুই? এইসব ঘটনা কে বলছে তোরে! তোর বাপেও তো তখন ঐখানে ছিল না। আর সবচাইতে বড় কথা, তুইও ত ছিলি না তখন! আমিই তাইলে বলছি মনেহয় এইসব, না?

আম্মুরে কোনোভাবেই বুঝাইতে পারি নাই (এখনো পারি না) যে, এই গল্প আমার কারো কাছে শোনা না। আমি তারে বললাম, তুমি বরখারে অনেক আদর করতা, সে ছাগল নিয়া তোমার পিছে পিছে ঘুরতো। তোমার গলায় আর কানে একটা গোলাপ গোলাপ রূপার সেট ছিল, তুমি ওরে সেইটা ওই বিয়ার দিন পরায়ে দিছিলা। মনে আছে? ও তোমার চুলে বিলি দিয়া দিতো, কথা বলতে পারতো না এইজন্য উকুন পাওয়ার পর মুরগীর মত খুট খুট শব্দ কইরা তোমার হাতের তালুতে উকুন ছাড়তো। মনে নাই?

আম্মা এইসব শুইনা চিৎকার দিয়া আমারে জড়ায়ে ধরলো। বাবারে! আর কইস না। এগুলা তুই কোনোদিনও দেখস নাই। বাবারে, তুই তখন হসই নাই। তুই তখন আমার পেটে, বাবা!

আম্মুর এই কথায় আমি যারপরনাই বিরক্ত হইছি। মাঝে মইধ্যে বরখার কথা খুব মনে পড়ে আমার, আজকে যেমন মনে পড়তেছে। বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার শেষমাথায় চলে গেছিলাম। বৃষ্টির তোড়ে একটা কবর দেখলাম ফাইটা গেছে, মনে হইলো উঁকি দিলেই বরখারে দেখতে পাবো।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী

ধারাবাহিক