করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৭০৩১৭০ ৫৯১২৯৯ ৯৯৮৭
বিশ্বব্যাপী ১৩৭৩৪০৪২২ ১১০৫৩৮৩৬৩ ২৯৬১৪২৩

বাঙালি রেনেসাঁর অগ্রদূত এম. আকবর আলী

প্রাচ্য তাহের

প্রকাশিত : নভেম্বর ২২, ২০২০

বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার যে বেহাল দশা আজকের সময়ে বিরাজ করছে, তা দেখে যদি মনে করা হয় বাঙালির ইতিহাসে বিনোদন সাহিত্য পাঠ ও চর্চা ছাড়া জ্ঞানচর্চার কোনো নজির নেই, তবে তা অবিবেচকের ভাবনাই হবে। সত্যি যে, এদেশে এখন আর কোনো বিজ্ঞান মেধাবী লেখক নেই। দু’চারজন যারা আছে তারা মূলত কপি পেস্টার। বিভিন্ন জায়গা থেকে টুকরো টাকরা তথ্য নিয়ে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে প্রকাশককে ধরিয়ে দেন। আজকের অন্তর্জাল বিশ্বে হেন কোনো কিছু নাই যা অন্তর্জালে নাই। ফলে কপি পেস্ট আজকাল ছেলের হাতের মোয়া। পড়াশোনা কিম্বা গবেষণা করে এখন আর কোনো বিজ্ঞানচর্চা এ দেশে হয় না।

তবে একসময় ছিল, এদেশে সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানের খুটিনাটি নানা বিষয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বেশ ক’জন মেধাবী মানুষ কলম ধরেছিলেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারা যা লিখতেন তা বেশ খেটেখুটেই লিখতেন। ইতিহাসের এমন কৃতী সন্তানদের মধ্যে এম. আকবর আলী প্রথম সারির। শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, ইতিহাসানুরাগী, ঐতিহ্য সন্ধানী প্রভৃতি অভিধায় তাকে ভূষিত করা চলে। ১৯১১ সালের ১ মার্চ, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে তার জন্ম। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। পরে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন।

১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করার পর সরকারের আয়কর বিভাগে নিরীক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। খুলনা ও চট্টগ্রাম অফিসে কয়েক বছর কর্মরত থেকে কলকাতায় বদলি হয়ে আসেন। এ সময় থেকেই কলকাতায় শুরু হয় মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা। ফলে ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। ১৯৫৪ সালে তিনি করাচিতে যুগ্ম আয়কর কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি ও পরে উপ-সচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন।

বাংলাভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান-সভ্যতার প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাথে আধুনিকতার যোগসূত্র স্থাপনকারী প্রথম ও প্রধানতম ব্যক্তিত্ব হলেন মালিক আকবর আলী। সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আরবরা। বিজ্ঞান, সাহিত্য, কলা, স্থাপত্য, গণিত, মহাকাশবিদ্যাসহ জ্ঞানের সকল শাখায় ছিল তাদের অবাধ বিচরণ। আরবরাই জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতার জনকের মর্যাদায় অভিসিক্ত। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক মানবেন্দ্র নাথ রায় লিখেছেন, ‘মুসলমানদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেই ইউরোপ আধুনিক বিশ্বের অধিনায়ক হয়ে রইল। এমনকি আজও তার শ্রেষ্ঠ মনীষীরা অতীত ঋণের বোঝা স্বীকার করতে সঙ্কুচিত হন না। দুর্ভাগ্য আমাদের, উত্তারিধকারসূত্রে প্রাপ্ত ইসলামের সংস্কৃতি সম্পদ থেকে ভারতবর্ষ তেমন উপকৃত হতে পারেনি, কেননা অনুরূপ সম্মানের অধিকারী হবার যোগ্যতা তার ছিল না। এখনও এই বিলম্বিত রেনেসাঁর সৃষ্টি বেদনায় মানবেতিহাসের এই অবিস্মরণীয় অধ্যায় থেকে প্রেরণা সংগ্রহ করে হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে ভারতবাসীরা প্রভূত লাভবান হতে পারে। মানব সংস্কৃতিতে ইসলামের দান সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ আর উক্ত দানের ঐতিহাসিক মূল্যের যথার্থ অনুধাবন তাদের উদ্ধত আত্মপ্রসাদের প্রাসাদ থেকে বাইরে টেনে নিয়ে এসে হিন্দুদের চকিত বিস্ময়ে অভিভূত করে দেবে আর আমাদের এ যুগের মুসলমানদের সঙ্কীর্ণতা মুক্ত করে তারা যে ধর্মে বিশ্বাসী, তার মর্মবাণীর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি পরিচয় করিয়ে দেবে’। (মানবেন্দ্র নাথ রায়, ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান, পৃষ্ঠা ৮৮)।

মানবজাতির কল্যাণ সাধনে মুসলিম আলেমদের প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না। বর্তমানের পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র নির্মাণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। পরস্পরকে ধ্বংস করা, অন্যদেশকে পশ্চাতে বা বিপদে রাখতেই তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক অভাব পূরণে তাদের কর্মকৌশল নেই বললেই চলে। প্রতীচ্যের ধনিক শ্রেণির রাষ্ট্রগুলো এশিয়া আফ্রিকায় লুণ্ঠন প্রবৃত্তি চালানোকেই গণতন্ত্র বলে মনে করে। ইসরাইল ইন্ডিয়া জোটও ওই একই পথের অভিযাত্রী। কিন্তু আরব বিজ্ঞানীরা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে মানুষ ও জাতিরাষ্ট্রের কল্যাণীয় কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা, রুমী, জামী, শেখ সাদী, খৈয়াম, ইবনে নাফিস, আবদুল মজিদ, ইবনে ফিরনাহ, ইবনে খালদুনসহ অসংখ্য মনীষীদের কৃতিরাজী আজও সূর্যের মতো দেদীপ্যমান। মালিক আকবর আলী সেইসব মনি মুক্তোর সন্ধান করে খুঁজে খুঁজে জাতির সামনে পেশ করেন।

এম আকবর আলীর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা হলো ১২ খণ্ডের ‘বিজ্ঞানে মুসলমানের দান’। প্রায় সাত হাজার পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে তিন খণ্ড গণিতশাস্ত্র, দুই খণ্ড রসায়নশাস্ত্র, চার খণ্ড চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং তিন খণ্ড ভূগোল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ জাতির, বইটি এখন আর পাওয়া যায় না। তার সর্বপ্রথম বই চাঁদ মামার দেশ প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞানে কুরআন (তিন খণ্ডে), এসপেক্ট অফ সাইন্স ইন রিলিজিয়ানস, এ কমপারেটিভ স্টাডি (তিন খণ্ডে), জাবির ইবনে হাইয়ান, আলবেরুনী, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়াম, ইস্তাম্বুলের পথে পথে, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান ইত্যাদি। দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর সহযোগিতায় তার রচিত উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হলো, সাইন্টিফিক ইনডিকেশন ইন দি কুরআন এবং মুসলিম কন্ট্রিবিউশন টু সাইন্স। এছাড়া তিনি প্রবাসী, মোহাম্মদী, সওগাত এবং আজাদ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন।

ইবনে হাওকালের ভূগোল মালিক আকবর আলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকর্ম। ‘ইবন হাওকালের ভুগোল’ চতুর্থ থেকে দশম শতাব্দীর সেরা ভূগোলবিদ ইবন হাওকালের লেখা একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। তার রচিত কিতাবুল মাসালিক ওয়ালা মামালিক গ্রন্থটি মুসলিম জগতের সর্বপ্রথম ভূগোল গ্রন্থ যা ইংরেজিতে তরযমা হয়ে পাশ্চাত্য দেশেও প্রকাশিত হয়েছিল। ইবনে হাওকালের ভূগোল বইটি বাংলায় তরযমা হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সনের জানুয়ারি মাসে। বইটির প্রকাশনা সংস্থা নওরোজ সাহিত্য সম্ভার। ইবন হাওকালের পুরো নাম আবুল কাসেম মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হাওকাল আননাসিবি আলবাগদাদি। তিনি উত্তর মেসোপটেমিয়া অন্তর্গত নাসিবিন শহরে জন্মগ্রহন করেন। জন্ম তারিখ সঠিকভাবে জানা যায়নি। তিনি খুব সম্ভবত তার প্রথম জীবন জন্মভুমিতেই অতিবাহিত করেন। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সময়ে তিনি একদম অভাবের মধ্যেই ছিলেন যদিও তিনি আগে বেশ ভালো অবস্থায় ছিলেন পরিবারের সহিত। এরপর বাগদাদ থেকে তার কার্যকলাপ পরিচালিত হয়।

এখান থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়। তিনি প্রায় ত্রিশ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। তবে তার দেশ থেকে দেশে ঘুরাঘুরির আসল উদ্দেশ্য কি ধর্ম প্রচার নাকি ব্যবসা সেই ব্যাপার এ তেমন কিছু বোঝা যায় না। তবে তিনি ধর্ম প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন তা বোঝা যায়। ইসলামের ভূগোল চর্চা শুরু হলে ভূগোলবিদরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়েন। একদল সমগ্র পৃথিবীর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা পরিবেশন করতে থাকেন এবং এদের তথ্য নিরপেক্ষ তথ্য। আরেক দল যারা ছিলেন তারা কেবল মুসলিম জগত নিয়েই আলোচনা করেছেন। ইবনে হাওকাল দ্বিতীয় গোষ্ঠীর। তাই তার বইতে তৎকালীন মুসলিম জগত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তাই মুসলিম সম্রাজ্য ও এর ভৌগোলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

এম, আকবর আলী ২০০১ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৯১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। সাতবাড়িয়া বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ তার কৃতিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ জাতির জন্য দুর্ভাগ্য যে, এম. আকবর আলীর মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তার রচনাবলি। ‘ইবনে হাউকালের ভূগোল’ বইটি ছাড়া তার রচিত আর কোনো বই এখন আর পাওয়া যায় না। বলা চলে, হিরের খনির মতোই দুর্লভ তার বইগুলো। অন্তর্জালে অবশ্যি দু’একটা বই পিডিএফ আকারে পাওয়া যায়, তবে তার অবস্থাও জরাজীর্ণ। ‘বিজ্ঞানে মুসলমানের দান’ প্রথম খণ্ডের পিডিএফ আপলোডকারী সাইট বাংলাইন্টারনেট.কম টিম জানাচ্ছে, ‘বইটি প্রাপ্তির সময় এটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ছেঁড়া অবস্থায় ছিল। বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো অনেক পুরাতন হওয়ায় লালবর্ণ ও ভঙ্গুর হয়ে গেছে। অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে স্ক্যান করতে হয়েছে। ফলে আউটপুট আশানুরূপ হয়নি। কিছু কিছু স্থানে লেখা বাদ গেছে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত এই দুর্লভ বইটির অন্যান্য খণ্ডগুলি পাওয়া যায়নি। সে সম্ভাবনাও খুবই কম।’