করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৬৬৯০৭ ১৫৩০০৮৩ ২৭৮০১
বিশ্বব্যাপী ২৪২৯৬৮৫৭৬ ২২০২১৪৯১৯ ৪৯৪০৭৪২
বিবি সাজেদা

বিবি সাজেদা

বিবি সাজেদার গদ্য ‘পড়ার জগৎ’

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৫, ২০২১

আমার অক্ষর চেনার হাতেখড়ি কত বছর বয়সে, তা বলতে পারি না। তবে আমার কোনো শিক্ষক ছিলেন না। বাবার কিনে আনা আদর্শলিপির রঙিন ছবিগুলো দেখতাম। দেখতে দেখতে এবং একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে অক্ষর ও বানান শেখা শেষে আমি বড়বোনের সাথে প্রাইমারি স্কুলে যাই। তখন আমাকে ম্যাডাম ক্লাস টু থেকে নিয়ে ক্লাস ওয়ানে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

খুব অপমান বোধ করি আমি। আর যাইনি সেই স্কুলে। পরে আমার চাচির সাথে একটা কিন্ডাগার্টেনে যেতাম। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই ওখানে। অনেক সুন্দর সুন্দর নতুন বই কিনে দেয় আমার মা। সেখানে ছিল একটা গল্পের বইও। একদিনেই পড়ে শেষ করি। ক্লাস টু’তে ওঠার সাথে সাথে শুরু হয় অত্যাচার। ইংরেজি প্যারাগ্রাফ দ্য কাউ, দ্য ম্যাংগো, মাই প্যারেন্টস মুখস্ত না পারলে বেতের বাড়ি।

কিন্তু আমার ভাল্লাগে বাংলা। আমার মামাতো বোন তখন ডিগ্রি কোর্সে পড়তো। তার বাংলা বই আমি চুরি করে আনি। এখনো মনে আছে, ক্ষেন্তি ও প্রাগৈতিহাসিক গল্পের কথা। যা ডিগ্রির পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফুপু আম্মার পুরনো বইয়ের সন্ধান পাই একদিন পুরনো এক ট্রাঙ্কে। তাতে নাইন-টেনের বাংলা উপন্যাস ‘জোহরা’। আরো পুরনো বই পেয়েছিলাম সেখানে।



আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও
রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসূলপুরে যাও।
                             -জসীমউদ্দীন

ফুল ফুল তুল তুল গা ভেজা শিশিরে
বুলবুল মশগুল কার গান গাহিরে।
                       -আহসান হাবীব

এসব পড়ে এত মজা পাইছি যে, আমার জীবনে একমাত্র নেশা হয়ে দাঁড়ালো, বই পড়া। কিন্তু এত বই পাব কোথায়? ফুপু আম্মার চাকরির গাইড একটা ছিল, সেটা পড়ে পড়ে আমিই ছিড়ে ফেললাম। ফুপুআম্মা পড়ার সময় পায় না। ফুপুআম্মার শ্বশুরবাড়িতে একদিন পেলাম রত্নভাণ্ডার। জীবনের প্রথম পড়া উপন্যাস ‘রূপনগর’। ক্লাস টু’তে থাকতেই। মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত বিখ্যাত গল্প, বিজ্ঞানের নিবন্ধ, ছোটদের বই এসব। সেখানে আরো একটি উপন্যাস ছিল, তুমি সুখে থেকো।

ওটা বাসায় নিয়ে আসলাম। পড়ার সময় দেখলো আমার চাচিআম্মা। মাকে বলে দিলে মা আমাকে ঝাটাপেটা করলো। তারপর থেকে আর বই আনতাম না। ফুপুর বাড়ি গিয়ে সারাদিন বই পড়ে সন্ধ্যায় বাড়ি আসতাম। ফুপু তখন বিএসসির স্টুডেন্ট। নাকমুখ গুঁজে দিনভর ইংরেজি পড়ে। আমি কি পড়ি না-পড়ি দেখার সময় নেই। আমি একদিন চুরি করলাম ফুপুর একটা ইংরেজি বই। পড়তে সুবিধা করতে পারলাম না সেটা। ফেরত দিয়ে আসলাম। ওদিকে ফুপু বইটা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।

থ্রিতে উঠলে তখন ব্র্যাকের পোলাপানের নতুন রঙিন বই সব ধার করে আনতাম। প্রাইমারির চে ব্রাকের বই উন্নত বেশি। পাঠ্যসূচি অতুলনীয়। থ্রিতে থাকতেই মামাতো ভাইয়ের বিছানার নিচে আবিস্কার করলাম চটিবই, হ্যানিম্যান। পড়ে ভাবলাম, এসব কী সত্যি নাকি!

বইটা চুরি করে বান্ধবীদের সাথে আবারও পড়লাম। বান্ধবীরা বললো, এসব সত্যি। শুনে আমি তব্দা খেয়ে গেলাম। তখন থেকেই আমার দেখার বিষয় শুধু বই-ই না, কে কার সাথে কী করে না-করে, রাজ্যের খবর আমার নখদর্পনে। ছোট ছিলাম বলে ব্যাপক সুবিধা। সব বাড়ি অবাধে যাতায়াত করতে পারি।

কার চিঠি কার কাছে পৌঁছাতে হবে, শুধু আমারে বললেই হয়। হাফপ্যান্টের ভিতরে চিঠি নিয়ে আমি ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতাম। ঘুষ হিসেবে বই পড়তে দিতে হতো। শরৎ, রবীন্দ্র, বঙ্কিম, বনফুল আরো কত কী যে পড়লাম ক্লাস থ্রি আর ফোরে, বলে শেষ করা যাবে না।

প্রেমের বোধোদয় এভাবেই ‘দেবদাস’ পড়ে। তখন আমি বুঝি। তাই আমাকে শুধু বই পড়তে দিলেই হবে না। বই বাড়ি আনতে দিতে হবে। এই শর্তে চিঠি চালাচালি শুরু করলাম। প্রেমিক-প্রেমিকাগুলোও মহাচালাক। তারা আমাকে পত্রিকার সাময়িকী বিচ্ছু ধরিয়ে দিয়ে কাজ সারতো। আমি আবার চালাকি করে তাদের ভূগোল, ইতিহাস, ইংরেজি বইয়ের গাইড বাসায় আনা শুরু করলাম।

মা খুব ব্যস্ত থাকেন। কী পড়ি না-পড়ি, তার দেখার সময় নেই। শুধু চাচিআম্মার থেকে বইগুলো লুকিয়ে রাখি। ব্র্যাকের পাঠাগার ছিল একটা পাশের গ্রামে। সপ্তায় দুই টাকা জমা দিয়ে বই আনতে হতো। আমি চুরি করে আণ্ডা, সুপারি এসব বেচে দুই টাকা জোগাড় করতাম। ওখানে পরিচয় হয় কাজী নজরুলের মৃত্যুক্ষুধাউপন্যাসের সাথে। জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, হুমায়ূন আহমেদের সাথে।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা আছে। তাই স্কুলের পর সন্ধ্যা পর্যন্ত কোচিংয়ের জন্য থাকতে হয়। আমি কোচিং না করে পাঠাগারে চলে যাই। সন্ধ্যায় বাড়িতে আসি। আমার মনে আছে, জাফর ইকবালের একটা বই পড়েছিলাম বৃত্তি পরীক্ষার আগের রাতে ‘বাচ্চা ভয়ংকর, কাচ্চা ভয়ংক ‘। সিক্স-সেভেন-এইট তিন বছর হাইস্কুলের তালাবদ্ধ লাইব্রেরির প্রায় বই-ই আমি শেষ করেছিলাম।

নাইন টেন খুব অশান্তিতে কেটেছে। তেমন একটা পড়তে পারিনি। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই ঢাকায়। নামি কলেজ। সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। ক্লাস অফ থাকলে বা টিফিন পিরিয়ডে আমি থাকি লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরিয়ান আমাকে ধমকাধমকি করেও বের করতে পারে না। এখানে পড়লাম প্যারীচাঁদ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রোকেয়া, তসলিমা, হুমায়ূন আজাদ। এন্থনি মাসকারেনহাসের সেই বিখ্যাত বই, জাহানারা ইমাম ও সেলিনা হোসেন।

দর্শনের হাতেখড়িও এই লাইব্রেরিতে। পাশ্চাত্য দর্শন, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি নামে বাহারি সব বই। রুশো, লাস্কি, সাত্রে, সক্রেটিস, এরিস্টটল এদের চিনলাম। এরপর চিনলাম তলস্তয় ,গোর্কি, ভলতেয়ার। কলেজজীবন শেষে পড়লাম ফ্যাসাদে। তখনও পিডিএফের যুগ শুরু হয়নি। বই কিনতে শুরু করলাম নীলক্ষেত গিয়ে। তসলিমার লজ্জা কিনে আনলাম। সারা হোস্টেল আমাকে গালাগালিতে ব্যস্ত। আমি খারাপ মেয়ে তাই তসলিমা পড়ি।

এরপর সব হাতখরচা চলে যেত হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা, আহমদ ছফা, ড্যান ব্রাউন, এমিল জোলা, ভিক্টর হুগো, দস্তয়ভস্কি এদের পেছনে। বইগুলো খুব যত্ন করতাম। সারা হোস্টেলে কেউ বই পড়তো বলে মনে হয় না। দুই চারজন মেয়ের হাতে কোনো বই দেখলে আমি হাজির। শেষে আর কোনো বই ধার পাওয়া গেল না। সব আমি পড়ে ফেলেছি।

তারপর আসলো পিডিএফ। মোবাইল মেমোরির অর্ধেকের বেশি থাকে পিডিএফ। শুরু হলো উচ্চস্তরের পড়াশুনা। জীবনে যত বিচিত্র লেখকের বই পড়েছি হলপ করে বলতে পারি, তার নামও শুনেননি আপনারা। আমি মানিক সমগ্র পড়লাম, অদ্বৈত মল্লবর্মন, আরজ আলী, কাফকা, গ্যাটে, শংকর, যাযাবর। সমগ্র ডাউনলোড করতাম শুধু। এপার ওপার দুই বাংলা।

ইংরেজি,ফরাসি, রাশিয়ান সাহিত্য সব। এমনকি আলিফ লায়লা বা হাজার রজনীর গল্প, রামায়ন, মহাভারতও। এসব পড়ার পর জাগ্রত হলো দর্শনবোধ। তৈরি হলো নিজস্ব চিন্তার জগৎ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চ ভাবনা। দেশীয় বিশ্লেষকদের বাতিল করা শুরু করলাম পাশ্চাত্য বিশ্লেষকদের দিয়ে। কম্যুনিজম নিয়ে দিলাম ম্যারাথন দৌড়। বাতিল করলাম কম্যুনিজমকে। ধর্মশাস্ত্রের বিশ্লেষণ পড়ে পড়ে মনে হলো, খালি কলসি বাজে বেশি। বাদ।

ফেমিনিজম নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুলকালাম। চললো পড়াশুনা। ওলস্টেনক্রাফট পড়লাম। হুমায়ুন আজাদ আরো ভাল করে, তসলিমাও রিভিশন করলাম। বাতিল করলাম নারীবাদ। বুঝলাম, ইস্ট-ওয়েস্ট-নর্থ-সাউথ সব জায়গায় ঘাপলা আছে। রাষ্ট্র ও মতাদর্শের পেছনে পড়লাম। গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, কল্যাণরাষ্ট্র সবার মাথা চিবিয়ে খেয়ে দেখি, ভেতরে একই গুড়। মোড়কটা শুধু আলাদা।

এরপর গেলাম আলথুস ও গ্রামসিতে। চমৎকার চিন্তা। বুঝলাম, দেশীয় বুদ্ধিজীবীরা টোকাই। এদের দিয়ে বিশ্লেষণ সম্ভব পশ্চিমা তরিকায়। যা আমাদের জন্য উপযোগী নয়। মাঝে মাঝে গান শুনতাম। রাজনীতির আলোচনা করতাম। ভাবের আদান-প্রদানের সাথী এক ভিন্নভাষী। সে শুনায় গুলজার, সাদাত হোসেন মান্টো, কুররাতুল আইন হায়দার, মহসীন নাকভী, জগদস্বাপ্রসাদ আরো আরো উর্দু,ফারসি ও হিন্দি সাহিত্য।

আমি বুঁদ হয়ে রই। কিছু অনুবাদ সংগ্রহ করি। পড়ে বুঝতে পারি, বাংলা সাহিত্য যত না সমৃদ্ধ তারচে অনেক বেশি সমৃদ্ধ উর্দু সাহিত্য। কিন্তু খুশবন্ত সিং পড়ার পর আর উর্দু পড়া হয়নি। সাজেশন দেবার মতো তখন আর কেউ ছিল না। যে ছিল সে আর নেই। এখন পরিকল্পনা একটা লাইব্রেরির।

জগতের সেরা দার্শনিক ও সাহিত্যিকরা থাকবেন সেখানে। পাঁচ হাজার বইয়ের এক হাজার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর। এক হাজার দর্শন শাস্ত্রের। পাঁচশো বিজ্ঞান, পাঁচশো ইতিহাস। পাঁচশো অর্থনীতি ও রাজনীতি। আরগুলো কী হবে, ভাবা হয়নি। আমার সাহিত্য পছন্দ রুশ, ফরাসি ও উর্দু। তারা থাকবে পাঁচশো। দর্শনকে ভাগ করবো কাল হিসেবে। আদিকাল, মধ্যকাল ও আধুনিক কাল। সব মহাদেশীয় দর্শনের তিনটি কাল। তারপর আবার আমাদের নিজস্ব ভারতীয় দার্শনিকরা থাকবেন একটু বেশিই।

চার্বাক, মনু, চাণক্য, বরাহ মিহিরসহ আরো অনেককে খুঁজে ফিরবো। হারিয়ে যাব ইন্দুস ভ্যালির গভীরতায়।