করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ২০০৮৫০০ ১৯৫০৩৮৭ ২৯৩১২
বিশ্বব্যাপী ৫৯৪৯৫০৪৫০ ৫৬৮০২৬৫৯৬ ৬৪৫৩৯৮২

বিবি সাজেদার স্মৃতিগদ্য ‘হাজার বছরের গল্প’

প্রকাশিত : জুলাই ২৪, ২০২২

আমার মামাবাড়ি ছিল খুব বড়োলোক। দুই মামাকে দেখতাম সুদর্শন এবং বয়সে তরুণ। খালামনি একটা ছিল মহামূর্খ ও হিসেসি। আমার মা শিক্ষিত ও বোকা। রাজ্যের কাজের পাহাড় তার ঘাড়ে। দিনে তিনবেলা বড় বড় ডেকচিতে ভাত সালুন রাঁধতেন আর কামলাদের সারি করে বসিয়ে খাওয়াতেন। কাজের বেটি ছিল জরিনা। জরিনার ঠমক ভারি। কুচি দিয়ে শাড়ি পরতো। মায়ের আর নানির মুখে মুখে তর্ক করতো। জরিনা পান খেত খুব। লিপস্টিকও মাখতো।

বাড়িতে শিশু ছিলাম আমি, আমার ভাই আর দুজন মামাতো ভাইবোন। আমাদের জন্য কোনো আলাদা রান্না হতো না। আমরা সবার জন্য রান্না করা টকটকে ঝাল দেয়া তরকারি দিয়ে ভাত খেতাম আর ঝালের জন্য কান্নাকাটি করতাম। বাড়িতে মৌসুমি ফল থাকতো প্রচুর। আমরা আম জাম কাঁঠাল কলা খেতাম। পুকুরপাড়ে বসে থাকতাম জাম বা আমগাছের নিচে। বাতাস এলেই আম জাম পড়তো টুপটুপ করে। খালাম্মার মেয়েরা বড় তখন। তাদের রেখে খালাম্মা মাসের পর মাস বাপের বাড়ি থাকতেন।

আমাদের শরীরে কোনো দিন গোসলের সাবান পড়তো না। খালাম্মা ধুন্দলের সোবা দিয়ে ৫৭০ সাবান ডলে আমাদের গোসল করাতেন। বড় মামার বৌ নামকরা সুন্দরী। যেমন মোটা তেমন ফর্সা। সাত চড়ে রা করে না এমন মহিলা। বাড়ির মধ্যে তিনিই আমাদের তুমি তুমি করে বলতেন। মায়ের চাচাতো ভাইয়ের এক বৌ ছিল। ভীষণ সুন্দর আর ছিমছিমে চেহারা। কণ্ঠ ভয়ংকর কর্কশ। নাম তার লিলি। তার কণ্ঠবাণে জর্জরিত হয় নাই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। লিলি মামির যখন বিয়ে হয় তখন তিনি নাকি ক্লাস নাইনে পড়েন। এইটে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাইছিলেন। তার নাকি স্বপ্ন ছিল অনেক দূর পর্যন্ত পড়ালেখা করবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে নাইনে পড়তেই লিলিকে তার আব্বা বিয়ে দেন মূর্খ ও সম্পদশালী আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের সাথে। শোনা যায়, বাসর রাতে লিলি মামি ধুমধাম কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়েছিলেন আমার ওই মূর্খ মামাকে। পরে আমার মায়ের চাচি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। সেই মামি বাপের বাড়ি গেলে আর আসতেন না বহুদিন।

জরিনা গিয়ে রাত কাটাতো মামার ঘরে। ঠমকওয়ালি জরিনার কদর সারা গ্রামজুড়ে। আমার মামাদের বছরবান্ধা কামলা, বড় মামা আর চাচাতো মামার মধ্যে প্রচণ্ড রেষারেষি ছিল জরিনাকে নিয়ে। একদিন রাতে শুনি প্রচণ্ড গন্ডগোল। গোয়ালঘরে। সেখানে বেঁধে রাখা হয়েছে জরিনা ও বাড়ির কামলাকে। কামলার নাকমুখ ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। শুনলাম, জরিনা আর কামলাকে একসাথে পাওয়া গেছে কামলার বিছানায়। এখন বিয়ে হবে ওদের। জীবনেও এরকম বিয়ে দেখি নাই। যেখানে বিয়ের আগে বর-কনেকে বেঁধে রাখা হয়।

লিলি মামি তার বরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। সুযোগ পেলেই হাতের কাছে হাঁড়ি পাতিল ঝাঁটা যা পেতেন তাই দিয়ে পেটাতেন। মামির সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসেন এক সুদর্শন তরুণ। আসার সময় কমলা নিয়ে আসেন। আমাকে মাসমি গোপনে সেই কমলা খেতে দেন। সেই তরুণের পরিচয়, তিনি নাকি মামির ভাই। তিনি চাকরি করেন সেনাবাহিনীতে। মাঝে মাঝে মামি আমাকে তার বাপের বাড়ি পাঠান। বাপের বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। দুটো চকের মাঝামাঝি হেঁটে আমি পৌঁছাই মামির বাপের বাড়ি। মামির বাপের বাড়ির কেউ আমাকে খাতির করেন না, ঘরে ডেকে বসানও না। আমি মামির বাপের বাড়ির পাশ কাটিয়ে আরেক বাড়িতে যাই। সেখানে পাই আজহার মামাকে। আমি হাফপ্যান্টের পকেট থেকে চিঠি বের করি। মামা আমাকে চকোলেট দেন। মিমি চকোলেট। টাকা দেন। কচকচে দশ টাকা আর বিশ টাকার নোট। লিলি মামির জন্য পাঁচশো টাকার নোট আর চিঠি লিখে দেন ফটাফট। এই কাজ আমি অনেকবার করেছি।

আমার এক চক পার হবার পর মামার লেখা সেই চিঠি পড়ে দেখতে ইচ্ছে করে। চিঠি খুলি এক বুড় বটগাছের নিচে।
প্রিয়তমা,
...কথ্য ও অকথ্য ভাষা। সেইসাথে মনের আবেগ নিয়ে লেখা চিঠি। পড়তে পড়তে আমার কান গরম হয়ে যায়। আমি চিঠি ভাঁজ করে হাফপ্যান্টে গুঁজে রাখি।

এর বছর পাঁচেক পরে যখন আমি সেভেনে পড়ি, মামাবাড়ি গিয়ে শুনি লিলি মামি আর ফিরে আসেননি। আজহারের হাত ধরে কোথায় চলে গেছেন!

বহুবছর পর লিলি মামিকে পেয়েছিলাম বসুন্ধরা মার্কেটে। ফুটফুটে দুটি শিশু। সাথে আজহার মামাও আছেন। মনে করি, মামা আরো সুন্দর হয়েছেন দেখতে। লিলি মামি দু’গাল ঢেকেছেন মেকআপে। দারুণ লাগছিল তাদের দেখতে।

ওদিকে আমার নিজের মামা সারারাত বাড়ি ফিরতেন না। মামি ছিলেন চুপচাপ। মাঝে মাঝে কাঁদতেন খুব। আমার মামাতো ভাইটা একদিন কথায় কথায় বললো, আব্বা কোথায় যায়, সে জানে।

প্রস্তাব হলো, সে রাতে মামা কোথায় যায় আমিও সেটা দেখতে যাব। মামার বাড়ি পেরিয়ে পিছনের পাড়া। আমি আর আমার মামাতো ভাই আঁধারে সন্তর্পণে পথ চলি। সেই পাড়া পিছনে ফেলে আরো এক পাড়া। তার শেষপ্রান্তে খলিলের বাড়ি। আমি আর মামাতো ভাই খলিলের বাড়ির ছনের বেড়া ফাঁক করে চোখ রাখি। ঘরে কুপি জ্বলছে। খলিলের বৌয়ের বিছানায় শুয়ে আছে বড়মামা। আমরা আরো ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে ছিলাম বেড়ার ফাঁক দিয়ে।

শেষমেষ শেয়ালের তাড়া খেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে অন্ধকারে আছাড় খেতে খেতে বাড়িতে আসি। আমি হারিয়ে ফেলি মামার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। এখন আমার মামাতো ভাইটা বিদেশ থাকে। প্রচুর টাকা ইনকাম করে সিঁড়ি ঝাড়ু দিয়ে, মরা কুত্তা ফেলে। কিন্তু এক পয়সাও মামাকে দেয় না। মামি এখন মামাকে দিয়ে হাত পা টেপায়। কথা না শুনতে চাইলে সময়ে সময়ে ঝাড়ুপেটাও করে।