করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪০৪৭৬০ ৩২১২৮১ ৫৮৮৬
বিশ্বব্যাপী ৪৫৯২১৬৯৮ ৩৩২৫২২১৮ ১১৯৩৯০৯

ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা বিমুখ মুসলমান এবং বাংলা ভাগ

শেষ পর্ব

রাহমান চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৩, ২০২০

মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্য সম্পর্কে ‘আল এছলাম’ পত্রিকায় জনৈক ইদ্রিছ লেখেন যে, ‘শ্রেণীকক্ষে যা পাঠদান করা হয় তার অধিকাংশই রামায়ণ মহাভারতের আজগুবী গল্পের ছায়াবলম্বনে রচিত এবং কতোকটা বঙ্কিম প্রভৃতি মুসলিম-বিদ্বেষী সহিত্যরথীগণের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত। তিনি আরো উল্লেখ করেন, হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকগণ কথায় কথায় মুসলিম ছাত্রদের ‘ম্লেচ্ছ’, ‘যবন’, ‘নেড়েমাথা’  প্রভৃতি অশালীন ভাষায় সম্বোধন করে থাকেন যা খুবই অপমানজনক।’ মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানরা কিন্তু প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ করতেন প্রচলিত বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও কলিকাতা বিশ্বদ্যিালয়ের অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে। তাঁরা হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব ও অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সমসাময়িক ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকগুলি হিন্দুদের লিখিত বলে তার সবকিছুই হিন্দু ভাবাপন্ন। বর্তমান বাঙলা সাহিত্য পাঠে মুসলমান ছাত্ররা স্বধর্ম বিষয়ে কিছু জ্ঞানতো লাভ করতেই পারে না, অধিকিন্তু মুসলমানদের অযথা নিন্দাবাদ দেখে তারা মর্মাহত হয়।
 
বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য আবুল হাশিম মুসলমানদের সম্পর্কে শিক্ষিত হিন্দুর মনোভাব বোঝাতে যে উদাহরণ দিয়েছিলেন তা খুবই গুরুত্ব বহন করে। তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজকাহিনী’ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেন যা বিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। রাজকাহিনীর উদ্ধৃতিটি হলো, ‘সেই অবসরে সুলতানের যত আমীর ওমরা লুঙ্গি ছেড়ে, দাড়ি ফেলে বিবি আর মুরগির খাঁচা নিয়ে রাতারাতি শহর ছেড়ে আজমিরের দিকে চম্পট দিল। সকালে পৃথ্বিরাজ টোডা দখল করে নিলেন।’ বীরের মতো পৃথ্বিরাজের দখল ও মুসলিমদের ভীতুর মতো পলায়ন সহজ প্রকাশভঙ্গির লেখাটি হিন্দু শিশুর কাছে মজার মনে হতে পারে কিন্তু মুসলমান শিশু এতে মজা না পেয়ে সঙ্গত কারণেই বিষণ্ণ বোধ করবে। মুসলিম শিশু-ছাত্রদের কাছে ব্যাপারটি লজ্জারও ছিল। সাম্প্রদায়িক মনোভাবের এরকম বহু উদাহরণ ছিল তখনকার পাঠ্যক্রমে। বাংলা তেরশো সাত সালে ‘নূর আল ইমান’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘সেই সকল পাঠশালায় যে সকল পুস্তক পড়ানো হয়, তাতে হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনী রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরু-পাণ্ডবের লীলা পড়তে হয়। সেই সাথে হিন্দুদের রীতিনীতি, আচার ব্যবহার মুখস্থ করতে হয়। সেটুকুতেও নিস্তার নেই। কোমলমতি পাঠ্যপুস্তকে মুসলমানের নিন্দা, ইসলামী আচার, ব্যবহারের কুৎসা এবং মুসলিমদেরকে ম্লেচ্ছ, যবন ইত্যাদি সম্বোধনে ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়ে থাকে।’ সে পত্রিকায় আরো লেখা হয়, ‘মুসলিমদের মধ্যে বাঙালী গ্রন্থকর্তা খুব বেশি নেই। যে দু-চারজন আছেন তাদের লিখিত গ্রন্থগুলি হিন্দু নির্বাচকদের বিচারে পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় স্থান পায় না।

বিভিন্ন পত্রিকায় মুসলমানরা এসব নিয়ে অভিযোগ তুললেন এবং লেখালেখি করলেন। উনিশশো তেত্রিশ সালে আকরম খাঁ তাঁর রচিত এক প্রবন্ধে পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ইতিহাসকে বিকৃত করার ব্যাপারে সমালোচনা করেন এবং পাঠ্যপুস্তক থেকে তা বাদ দিতে বলেন। বর্ণহিন্দুরা এসব ব্যাপারে গা করেননি। বিদ্যালয়ের পাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থ সম্পর্কে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন যে, পাঠ্য ইতিহাসে হিন্দু রাজাদের সম্বন্ধে অগৌরবজনক কথা প্রায় ঢেকে ফেলা হয়, আর মুসলমানদের বেলা ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রকাশ করা হয়। মুসলমানদের গুণের কথা বড় একটা উল্লেখিত হয় না। ফল দাঁড়ায় এই, ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ করার পর ছাত্রেরা বুঝে নেয়, মুসলমান নিতান্ত অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী থেকে তাদের লোপ হওয়াই মঙ্গল।’ সিরাজী নামে আর এক ব্যক্তি বাংলা তেরশো তেইশ সালে আল-এসলাম পত্রিকায় ‘ইতিহাস চর্চার আবশ্যকতা’ নামক প্রবন্ধে লেখেন, ‘আমাদের সন্তানেরা প্রায়শই মুসলমান বিদ্বেষী বিজাতীয় লেখকদের রচিত ইতিহাস মুসলমানদ্বেষী শিক্ষকদের নিকট পাঠ করে থাকে। এই সমস্ত ইতিহাসের যে কোনো একটি সামান্য পাঠ করলেই দেখা যাবে যে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে মুসলিম আমলদারীর অংশ হতে গৌরবের কথাগুলি একেবারে চেঁচেমুছে ধুয়ে ফেলা হয়েছে। ফলতঃ বিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাস পাঠে মুসলমানের হিতের পরিবর্তে নিদারুণ বিপরীত ফল হচ্ছে।’

মুসলমান, সম্প্রদায়ের অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি ছিল। মুসলমানদের এসব অভিযোগে বা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায় যথেষ্ট সহানুভূতিশীল মনোভাবের পরিচয় দিতে পারেননি। মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুধর্মের বিবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মুসলিম পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষালাভের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইতেন না। বড়জোর তাঁরা মাদ্রাসায় পাঠাবার কথা ভাবতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বা সমাজের বর্ণহিন্দুরা এ ধরনের গ্রন্থ রচনাকে সাম্প্রদায়িক মনে করতেন না। বরং বহু সময় এসবের পক্ষ নিয়েই কথা বলতেন। যেমন ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘মনে রাখতে হবে বাংলা ভাষা অন্য অনেক ভাষার মতো সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন। অতএব স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষা এই জননী ভাষার দ্বারা প্রভুত পরিমাণে প্রভাবিত। শুধু শব্দে নয়, সাধারণ চরিত্র ও ভঙ্গিতে। আমাদের মুসলমান বন্ধুরা যারা প্রধানত হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্মান্তরিত তাঁদের এতে ক্ষুব্ধ হওয়ার বা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এটা মনে করার কারণ নেই।’ মুসলমানদের ক্ষুব্ধ হতে না বলেই তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করলেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ হবার কারণগুলি বা সমস্যার সমাধানের কথা ভাবলেন না। মন্ত্রীত্ব পেয়ে ফজলুল হক সে কারণেই মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনে উদ্যোগী হয়ে ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তা না করা গেলে পাঠ্যপুস্তকের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

পরমেশ আচার্য লিখছেন, ‘সন্দেহ নেই যে, উনিশ শতকের পুরোধারাই মূলত বাংলা বাংলা গদ্য সাহিত্য ও বাংলার আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার বিষয় ও বাংলা সাহিত্যে হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর অনুপ্রবেশ করেছিল।’ প্রাথমিক পাঠ্য বইয়ে হিন্দু সংস্কৃতির প্রাধান্য বাঙালী মুসলমান ভদ্রসমাজ মেনে নিতে পারেনি। উনিশ শতকের শেষ দিকে দু-চারজন মুসলমান যে-কয়েকটি প্রাথমিক শিক্ষার বই লিখেছিলেন সেগুলি খুব একটা নজর কাড়তে পারেনি। শিক্ষায় হিন্দু আধিপত্য ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব বাঙালী মুসলমান ভদ্রলোকদের মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য আজিজুল হকের লিখিত বিবৃতি থেকে। হিন্দুদের দ্বারা লিখিত সে-সব বই পাঠ করতে গিয়ে মুসলিম ছাত্রের কী সমস্যা হয় সেগুলিকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি বলেন, বহু বইয়ের বাংলা কঠিন সংস্কৃত শব্দে ঠাসা। বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে মুসলিম ছাত্ররা দেব, দেবী, অবতার, নমস্কার, পূজা, জন্ম, পুনর্জন্ম সম্পর্কে অবহিত হয়। হিন্দুদের বেদবেদান্ত সম্পর্কেও অনেক কথা লেখা থাকে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সে কিছুই জানার অবকাশ পায় না। ইতিহাসে পাঠে সে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, শাসননীতি, শিক্ষা ও সভ্যতার অনেক তথ্য জানতে পারে। কিন্তু যেই মধ্যযুগের ইতিহাস আসে তখন খালি যুদ্ধ, হত্যা, ধ্বংস, জয়, পরাজয় ষড়যন্ত্রের বিবরণ পড়ে। তিনি এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বলেন, বিদ্যালয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বা পাঠ্যক্রম এমন হবে যেখানে হিন্দু-মুসলমান এবং অন্য সম্প্রদায়ের একটি মিলনক্ষেত্র হবে। সেখানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা বিশেষ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকবে না। কিন্তু তা ঘটলো না। শিক্ষাবিদ পরমেশ আচার্য তাই লিখেছেন, ‘দুঃখের হলেও এ কথা সত্যি তৎকালীন হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ রাজনৈতিক মতনির্বিশেষে মুসলমানের শিক্ষাচিন্তা বা ক্ষোভের প্রতি যথোচিত মনোভাব দেখাতে পারেননি।’

মীর মশাররফ হোসেন  উনিশশো তিন সালে যে বইটি শিশুশিক্ষার জন্য লেখেন  তার নাম ছিলো ‘মুসলমানের বাঙ্গলা শিক্ষা প্রথম ভাগ’। বইটির আরম্ভ হয়েছে, ‘আল্লা এক। আল্লা সকলের বড়। আল্লার কোনো দোষ নাই। কোনো বদনাম নাই’। বইটির অন্যত্র আছে, ‘তুমি মুসলমান? টুপি নাই কেন?’ বইটিতে গুরু শিষ্যর সংলাপ রয়েছে এইরকম, ‘গুরু। বেহেস্ত কি? শিষ্য। বেহেস্ত অতি সুশ্রী আরামের বাসস্থান।’ খুব পরিষ্কারভাবে বইটি বালকদের ভাষা শিক্ষা বা লেখাপড়া শিক্ষা দেয়ার চেয়ে ধর্মীয় উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। খুব নগ্নভাবে মুসলমানদের মুসলমানিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মদনমোহন তর্কারঙ্কারের শিশুশিক্ষা, বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় খুবই মান সম্পন্ন এবং জনপ্রিয়র গ্রন্থ ছিল। মশাররফ হোসেনের গ্রন্থে তেমন কোন মান রক্ষিত হয়নি। হিন্দুরা তাঁদের বর্ণশিক্ষা গ্রন্থে শব্দ বাক্য যতিচিহ্ন ইত্যাদি শিখাবার জন্য যে-সব কথা লিখেছেন সন্দেহ নেই তার মধ্যে হিন্দুদের আচার আচরণ প্রষ্ফুটিত হয়েছে। হিন্দু পরিবারের মধ্যে বড় হবার জন্য তেমনটি ঘটেছে। বেদ বেদান্তের বহু কথা এসেছে, পৌরাণিক গল্প এসেছে। মশাররফ হোসেনের গ্রন্থটি একেবারে উগ্রভাবে মুসলিম বিষয়গুলিকে তার গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। মনে হয়েছে তিনি যেন বর্ণশিক্ষার গ্রন্থ না লিখে সরাসরি ধর্মগ্রন্থ লিখেছেন শিশুদের খাঁটি মুসলমান বানাবার জন্য। হিন্দুদের রচিত গ্রন্থ মুসলমানদের জন্য কীধরণের সমস্যা সৃষ্টি করেছিল সেটাকে মূল্যায়ন না করে, মশাররফ হোসেন ভুল পথে হেঁটেছিলেন। হিন্দুরা বর্ণশিক্ষা রচনার ক্ষেত্রে মুসলমানদের সংস্কৃতিকে একেবারেই গ্রন্থে স্থান দিতে পারেননি। কিন্তু মশাররফ হোসেন যে বই লিখেছেন, সেটা সমস্যার সমাধান নয় বরং মুসলমান ছেলেকে কট্টর মোল্লা বানাবার উদাহরণ। অথচ পাঠশালা শিক্ষায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নিম্নবর্গের পড়াশুনার সুযোগ ছিল সুসম্পর্ক বজায় রেখে। সেখানকার পাঠ্যপুস্তকে এইধরনের সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রশ্নগুলো স্থানই পায়নি।

বিবেকানন্দ শিক্ষাবিদ ছিলেন না, শিক্ষা আন্দোলনের সৃষ্টি করেননি, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেননি। কিন্তু শিক্ষা বলতে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন গণশিক্ষাকে। তিনি বলেছেন, দেশ বলতে বোঝায় সাধারণ মানুষ। খেটে খাওয়া সেইসব মানুষের শিক্ষার জন্য তিনি এক অভিনব কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খেটে খাওয়া মানুষদেরকে শিক্ষা দিতে হবে এবং এঁরা শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে না; শিক্ষাকে এদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দরিদ্র বালকগণ যদি শিক্ষার লাভের জন্য না আসে শিক্ষাকে তাদের দ্বারে যেতে হবে। জীবনযুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত থেকে তাদের জ্ঞান লাভের সুযোগ হয়নি। এতকাল তারা যন্ত্রের মতো কাজ করেছে এবং চতুর শিক্ষিত সম্প্রদায় তাদের শ্রমের সারাংশ অধিকার করেছে। সেইসব বঞ্চিতদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেবার কথা বলেন বিবেকানন্দ। তিনি বলেন, একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ছেলের জন্য যদি একজন শিক্ষক যথেষ্ট গণ্য হয়; তাহলে পিছিয়ে পড়া সাধারণ ছেলেমেয়েদের প্রত্যেকের জন্য চারজন শিক্ষক থাকা দরকার। ব্রাহ্মণ যদি বুদ্ধিমান হয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকে তাহলে সে অপরের সাহায্য ব্যতিরেকেই শিক্ষালাভ করবে। যারা বুদ্ধিমান হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, শিক্ষকগণ তাদের জন্যই নিয়োজিত হোক। তিনি উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘সুযোগ দাও, শিক্ষা দাও, সকলেই মহৎ হতে পারে; সকলেই সাধু হতে পারে; কোনো কিছুই তথাকথিত উচ্চবর্ণের একচেটিয়া অধিকার নহে।’ বিবেকানন্দের বক্তব্য থেকে স্পষ্টই তৎকালীন সমাজের চেহারাটা ধরা পড়ে; শিক্ষাকে যে উচ্চবর্ণের লোকরা একচেটিয়া করে রেখেছে তা তিনি জোরালোভাবেই বুঝিয়ে দেন।

বিবেকানন্দ যদিও সবার জন্য শিক্ষার কথা বলেছেন, অথচ সেখানে সাধারণ মুসলমানদের বা মুসলমান কৃষকদের ব্যাপারটা নেই। কারণ তিনি যে শিক্ষার কথা বলেছেন, তা ছিল আধ্যাত্মবাদী। মুসলমানরা কেন হিন্দুদের আধ্যাত্মবাদী শিক্ষা গ্রহণ করতে যাবে সে ব্যাপারটা তাদের বিবেচনায় স্থান পায়নি। হিন্দু-জাগরণের প্রবক্তা বিবেকানন্দের কাছে মুসলমানদের চেয়ে সাধারণ হিন্দুরাই অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ ও বিবেকানন্দ এই তিন বাঙালীর শিক্ষাদর্শেই আধ্যাত্মিকতা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার ‘বেদ’ অনুসারী হয়ে বর্ণপ্রথার পক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইংরেজ প্রবর্তিত ‘করণিক’ তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবাদে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণ্য আদর্শে একটি ব্রহ্ম বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সে বিদ্যালয়ে তিনি ভারতের প্রাচীন শিক্ষাধারার নিয়ম অনুসারে বর্ণপ্রথা চালু করেন। শান্তিনিকেতনের সেই বিদ্যালয়ে বর্ণশ্রম প্রথা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হতো, এমনকি ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈশ্য ছাত্রদের পোষাকের রঙ পর্যন্ত আলাদা আলাদা রাখা হয়েছিল। ব্রাহ্মণ ছাত্ররা খাওয়ার সময় পৃথক সারিতে বসতো ছোঁয়াছুয়ি বাঁচিয়ে। ব্রাহ্মণ ছাত্ররা কায়স্থ শিক্ষকের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে না, রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের বিধানকেও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন।

মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে উনিশশো দুই সালে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘যা হিন্দু সমাজ বিরোধী তাকে এ বিদ্যালয়ে স্থান দেওয়া চলবে না। সংহিতায় যে রূপ উপদেশ আছে ছাত্ররা তদানুসারে ব্রাহ্মণ অধ্যাপকদের পা স্পর্শ পূর্বক প্রণাম ও অন্যান্য অধ্যাপকদের নমস্কার করবে। স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের এই বিদ্যালয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানের স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে অবশ্য এ ধরনের সংস্কার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর এই পশ্চাদমুখিনতা শুধরে নিয়েছিলেন। ব্রহ্ম বিদ্যালয়টিই পরে বিশ্বভারতী বিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তরিত হয়। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথের মতো বৃহৎ মাপের মানুষ যদি পাশ্চাত্য শিক্ষার বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে নিজধর্মের কুসংস্কারের কাছে আশ্রয় নিতে পারেন; তাহলে বর্ণহিন্দুরা যখন হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য নিয়ে শিক্ষায় বাড়াবাড়ি শুরু করলেন, তখন মুসলমানরা যদি নিজধর্মের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে দূরদেশীয় প্রথা ও আচার আচরণ রপ্ত করার চেষ্টা করেন সেটাকে কোন্ চোখে বিচার করা হবে? ভুল করবার অধিকার কি রবীন্দ্রনাথ একাই পাবেন? পশ্চাদপদ মুসলমানদের থাকবে না?

মুসলমানরা কিছু কিছু ব্যাপারে খুব গোড়া ও কট্টর ছিলেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইংরেজ সরকার তাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাঠশালার মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা হিসেবে চালু করার ব্যাপারে যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারলো না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মহরথীরাও ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাতে পারলেন না। ধর্মীয় শিক্ষার উপর জোর দেওয়ায় বাঙালী  মুসলমানের শিক্ষা বিস্তারের পথে তা এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক যাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করতেন, যখন তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যকে চাপিয়ে দিতে চাইলেন; স্বভাবতই সাধারণ মুসলমানরা তখন নিজ ধর্মের ঐতিহ্যকেও রক্ষা করতে চাইবেন। মুসলমানদের একাংশ কেন প্রাথমিক বিদ্যালয় বাদ দিয়ে রক্ষণশীলদের মতো মাদ্রাসা আর মক্তবের শিক্ষা নিয়ে পড়ে থাকতে চেয়েছেন তাঁর ব্যাখ্যা এখানেই পাওয়া যাবে। প্রায় সমস্ত শিক্ষিত হিন্দুরা যখন ইংরেজদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আর মুসলিমদের নিন্দা করে চলেছে, সেই হিন্দুদের মুসলমানরা কীভাবে আপন করে নেবে? মুসলমানরাও তখন হিন্দুদের মতো নিজ-ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাইলেন। শিক্ষিত হিন্দুদের নানা কুসংস্কারাচ্ছন্ন কর্মকাণ্ডই ‘বাঙালী মুসলমানদের’ বাঙালী থেকে মুসলমান বানিয়ে ছেড়েছিল।

যাঁরা সনাতন হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন তাঁরাও পাশ্চাত্যের শিক্ষার প্রতি গুণমুগ্ধ ছিলেন। আবার যাঁরা মনে করতেন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ছাড়া ভারতীয়রা সুসভ্য জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না, তাঁরাও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগুলিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মুসলমানদের চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির সেখানে কোনো স্থান ছিল না। বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে তাঁরা সম্পূর্ণ ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। বাংলার এইসব বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছিলেন, ‘পশ্চিম তাঁদের বিভ্রান্ত করেছিল এবং প্রাচ্য তাঁদের সামনে ছলনাময় মরীচিকার সৃষ্টি করেছিল।’ ইংরেজরা তখন প্রচার করতে শুরু করেছিলেন যে, বাংলাদেশে তাঁরা মধ্যযুগীয় মুসলমানের অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে একটি জ্ঞানদীপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলার বুদ্ধিজীবীরা বহুকাল ইংরেজ শাসকদের এই একই বক্তব্য ধার করে প্রচার করে গেছেন। তাঁরা বলতে চেয়েছেন, মুসলমানদের শাসন ছিল বাংলার জন্য অন্ধকার যুগ, ইংরেজ শাসকরা সমাজের সে অন্ধকার দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শিক্ষিত বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা বাংলার ‘নবজাগরণ’-এর মতাদর্শগত ভিত্তি কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ বা সর্বসাধারণের ছিল না।

বাংলার তথাকথিত নবজাগরণ বাংলার কোন্ কোন্ শ্রেণীর মানুষকে লাভবান বা আলোকিত করেছিল সে সম্পর্কে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘ইংরেজ শাসনের ফলে কৃষকেরা দুর্ভিক্ষ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল। কারিগর সম্প্রদায় প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। ঐতিহ্যগত পুরাতন সমাজের সামন্ত-শ্রেণীর পরিবর্তে নয়া ভূস্বামীশ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া পুরানো সমাজের কাঠামো ও ভিত্তি ভেঙে পড়ার পর নতুন নতুন শ্রেণী ও গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছিল। এঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন ব্রিটিশ বাণিজ্যের সহায়ক দালাল, আবার কেউ ছিলেন ইংরেজী শিক্ষিত সরকারী কর্মচারী ও পেশাজীবী মানুষ। এইসব শ্রেণীর অনুপ্রেরণার উৎস ছিল ইংরেজ প্রতিষ্ঠানগুলি।’ তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন, ইংরেজ শাসনের জ্ঞানদীপ্তি কেবলমাত্র বাঙালী হিন্দুদের উপরই প্রতিফলিত হয়েছিল। আপামর হিন্দু জনসাধারণের উপর এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েনি এবং হিন্দু নেতারা এদের ব্যাপারে প্রায় কোনো চিন্তাই করেননি। বাংলার নবজাগরণে যাঁরা শামিল হয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে গ্রামের ও শহরের হাজার হাজার দরিদ্র মেহনতি মানুষের কোনো সংশ্রব ছিল না। দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে কখনো তাঁদের মাথাব্যথা ছিল না।

শিক্ষা বিষয়ক গবেষক পরমেশ আচার্য লিখেছেন, ‘শিক্ষার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে অসঙ্গত মনে হলেও বিশ শতকের অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাদী সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রসার বিশেষভাবে লক্ষণীয়।’ তিনি দেখিয়েছেন যে, শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতির যে সম্পর্ক তাই সাম্প্রদায়িক বিভেদের অন্যতম কারণ। তিনি চমৎকারভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। হিন্দু-মুসলিম লড়াইয়ে অন্যতম একটি কারণ ছিল শিক্ষায় আধিপত্য বিস্তার। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভদ্রলোকরা যখন ইংরেজ শাসনে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে গেলেন এবং বিদ্যালয়ের জন্য তাঁদের অনেকে পাঠ্য বই লিখতে শুরু করলেন, দেখা গেল সেই পাঠ্য বইয়ে হিন্দুদের সংস্কৃতি বা হিন্দুধর্মের বহুকিছু স্থান পেল। হিন্দু এই ভদ্রলোকেরা গ্রন্থ লিখবার সময় এ কথা ভাবেননি যে, বাংলার একটি বড় সম্প্রদায় হচ্ছে মুসলমান। হিন্দুদের দেবদেবী বা হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠানকে গ্রন্থে স্থান দিলে তা ধর্মনিরপেক্ষ রচনা হবে না। মুসলমানদের আত্মমর্যাদায় স্বভাবতই তা ঘা দেবে এবং মুসলমানরা এক ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করবে। কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে হিন্দু ভদ্রলোকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই নিম্নবর্ণের সাধারণ হিন্দুকে তাঁরা যেমন অগ্রাহ্য করেছেন; একইভাবে বিরাট সংখ্যক মুসলমানদের ভালোমন্দ নিয়ে তাঁদের মাথা ব্যথা ছিল না।

শিক্ষার প্রশ্নে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তার প্রকৃতি বুঝতে গেলে এটা বুঝতে হবে, শিক্ষা কখনো সংস্কৃতি নিরপেক্ষ হয় না। শিক্ষার সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও জটিল। শিক্ষার সাথে সম্পর্কিতরা সেখানে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব দেখাতে না পারলে সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিরোধ বাড়বেই। যখন পাঠশালা শিক্ষা ছিল, পাঠশালার কমবয়সের শিশুদের জন্য ইতিহাস বা ধর্মশিক্ষার ব্যাপার ছিল না। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে পাঠশালার শিক্ষাক্রম রচিত হয়েছিল। পাঠশালা শিক্ষায় ছাত্র এবং শিক্ষকদের একটা বড় অংশই ছিলেন হিন্দু। মুসলমান ছাত্র সে তুলনায় খুবই কম ছিল। অথচ পাঠশালার পাঠ্যক্রমে মুসলমানদের হেয় করা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো কারণ ঘটেনি। পাঠশালা শিক্ষার একটি বড়ো দিক ছিল এখানে শাসকদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল না। শিক্ষকেরও শাসকবৃন্দকে খুশি করার জন্য গ্রন্থ লেখার প্রয়োজন পড়েনি। শাসকদের মধ্যেও তখন সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল না। মুসলিমদের শাসনে দেখা গেছে হিন্দুরাই শাসনকার্যের সব বড় বড় পদে আসন রয়েছেন। ধর্মের কারণে নয়, সরকারের পদ মিলতো যোগ্যতার মাপকাঠিতে। বলতে গেলে সে সময়টা ছিলো ধর্মীয় নানা কু-সংস্কারে প্রভাবিত এবং সকলেই নিজ নিজ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলি পালন করতো। ধর্মের বাড়াবাড়ি থাকলেও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির দেখা পাওয়া যায়নি।

ইংরেজ শাসনে যাঁরা পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানে আলোকিত হয়ে সমাজের কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছিলেন, বাংলার দুর্ভাগ্য যে তাঁদের নানা ভুল চিন্তার কারণেই সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশ ঘটলো। এর প্রথম সূত্রপাত হলো ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এবং পাঠ্যক্রম রচনার মধ্য দিয়ে। শিক্ষিত হিন্দুরা বাঙালীত্বের অধিকার মুসলমানকে দিতে চাননি। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সীমানা থেকে হিন্দুধর্ম পুনরুজ্জাগরণের নামে তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখলেন। পশ্চাদপদ মুসলমানরা যদি তখন নিজেদের ধর্মকেই ঢাল বানিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, সমাজে মর্যাদার আসন লাভের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চায়; সেক্ষেত্রে তাঁদের মুর্খতা নিয়ে সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দোষ দেওয়া যাবে কি? শিক্ষিত মুসলমানদের চিন্তার একটা বড় বিভ্রান্তি ছিল, বর্ণহিন্দুদের তাঁরা হিন্দু হিসেবে দেখেছেন আর নিজেদের ভেবেছেন মুসলমান। প্রশ্নটা সত্যিকার অর্থে হিন্দু মুসলমানের ছিল না। সেভাবে ব্যাখা করাটাই ছিল ইতিহাস বিরুদ্ধ। বর্ণহিন্দুদের মূল পরিচয় ছিল তাঁরা শাসকশ্রেণীর অংশ। হিন্দু সংস্কৃতির সুবিধাগুলি তাঁরা ভোগ করতে চেয়েছিলেন কারণ তা নিম্নবর্গকে শোষণ করতে সাহায্য করে। হিন্দুত্ব ছিল তাঁদের কাছে উচ্চবর্ণ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার আলখেল্লা। কিন্তু মূলত তাঁরা ছিলেন ইংরেজ শাসকদের দাসানুদাস।

বিশ শতকে এসে শিক্ষিত মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার লক্ষ্যে ইংরেজদের হাত ধরে সুযোগ-সুবিধা নিতে গিয়ে একই পথ ধরে হাঁটলেন। নিজেদের ইংরেজ শক্তির দাসানুদাসে পরিণত করলেন। বাংলার ভদ্রলোকদের হিন্দুজাগরণ যদি হিন্দুত্বের ব্যাপারই শুধু হতো তাহলে নিম্নবর্ণের বিশাল হিন্দুদের মধ্যেও তা সাড়া ফেলতো। বঙ্কিমের রচনা শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করলে গ্রামের সাধারণ হিন্দুরা এসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন চলাকালেও দেখা গেছে হিন্দু আর মুসলিম কৃষকরা অনেকক্ষেত্রেই এক হয়ে লড়েছেন হিন্দু চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে। গ্রামের নিম্নবর্গের মুসলমানরা নিজেদের বাঙালী বলে ভাবতেন এবং নিজেদেরকে হিন্দু কৃষকদের সমগোত্র বলেই মনে করতেন। সুবিধাভোগী শিক্ষিত বাঙালী ভদ্রলোকদের একগুঁয়ে স্বভাবের কারণেই সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নগুলি দানা বাধতে থাকে। মুসলমানরা হিন্দু পুনরুজ্জীবনের বিরুদ্ধে ইসলামকে না দাঁড় করিয়ে যদি বাঙালী নিম্নশ্রেণীর সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন, তাহলে সমস্যার চমৎকার সমাধান হতে পারতো। কিন্তু ইতিহাস কখনো সহজ-সরল রাস্তা ধরে চলে না।  

বাংলার মুসলমানদের একটা বড় অংশই হলেন ধর্মান্তরিত। সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্য থেকে যাঁরা ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, স্বভাবতই তাঁরা ছিলেন পশ্চাদপদ। বিত্তে এবং শিক্ষায় বহুকাল তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন। সাধারণ মুসলমানদের একটি অংশ যখন পাটচাষের মধ্য দিয়ে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান করে তুলেছিলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত কারণেই তাঁরা কিছুটা প্রতিযোগিতার মনোভাব পোষণ করতেন। দীর্ঘদিন তাঁদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের অবহেলা প্রদর্শনের একটা জবাব তাঁরা দিতে চাইছিলেন। ধনী মুসলামনারা এসময় জমি ক্রয় করা শুরু করে। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে পূর্ববাংলায় মুসলমান জোতদারদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। খুব শিগ্রই তাঁরা হিন্দু জমিদারদের প্রতিপক্ষ একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। স্বভাবতই শিক্ষাদীক্ষায় এঁরা এগিয়ে যেতে চান। তাঁরা নিজেরা জমিদার না হওয়াতে নিম্নবর্গের কৃষকদের সাথে তাঁদের সরাসরি সংঘর্ষের কারণ ছিল না। দ্বিতীয়ত তাঁরা বুঝতে পারছিলেন ব্যাপকভাবে মুসলমানদের উত্থান না ঘটলে হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করা কঠিন হবে। নিজস্বার্থেই তাঁরা মুসলিম জনসাধারণকে কিছুটা এগিয়ে যেতে নানা পদক্ষেপ নেন। তারমধ্যে শিক্ষার প্রসার একটি।    

নব উত্থিত মুসলমানরা যখন নিজেদের পশ্চাদপদতা থেকে এগিয়ে যাবার কথা ভাবলো, ব্যাপারটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষিত হিন্দুদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা মনে হয়েছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার, পরগাছা জোতদার আর ধনী কৃষক নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখালেও দরিদ্রদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখুক এটা চাইতেন না। তাহলে লেখাপড়া শিখে তাঁদের সন্তানদের ‘বাবু’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তারা আর জলেকাদায় গায়গতরে খাটতে চাইবে না। বাপদাদার আমল থেকে চাষাবাদের যে নিয়ম চলে আসছে লেখাপড়া শিখলে ছোটো লোকরা কি আর সে নিয়ম মানতে চাইবে! আর এদের লেখাপড়া শেখার দরকারটাই বা কী। ফলে নীচের দিক থেকে উঠে আসা হিন্দু মুসলমানরা যখন প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন করতে চাইলেন, তখন সুবিধাভোগীরা সবার আগে তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ভূত দেখতে পেলেন। উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচনে জয়লাভ করে ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর দায়িত্বে রাখেন। তিনি মুসলিম প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য মক্তবগুলোকে সম্পূর্ণভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। উনিশশো আটত্রিশ সালে প্রাথমিক শিক্ষার নতুন পাঠ্যসূচী প্রকাশিত হয়। এই পাঠ্যসূচী পূর্বের পাঠ্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। বর্ণহিন্দুদের কেউ কেউ এ ব্যাপারে ফজলুল হককে সমর্থন করলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়াকে বর্ণহিন্দুদের বড় অংশটাই পছন্দ করেননি। ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কালে মাধ্যমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে বাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক পুনরায় অবনতির দিকে গিয়েছিল।

মুসলিম সমাজে প্রাথমিক শিক্ষার কিছুটা সাফল্যের পর মধ্যশিক্ষার ব্যাপারটা সামনে চলে আসে। মধ্যশিক্ষার দায়িত্ব ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল বর্ণহিন্দুদের একচেটিয়া আধিপত্য। বর্ণহিন্দুদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাকে মুক্ত করার জন্য একটি ‘মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ’ গঠনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষাকে কলকাতা বিশ্বদ্যিালয়ের হাত থেকে একটি শিক্ষা পর্ষদের হাতে অর্পণ করার জন্য ইতিপূর্বেও বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনের জন্য বারবার খসড়া প্রস্তাব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে বিশ্ববিদ্যালয় এর বিরোধিতা করে। যার ফলে উনিশশো বিশ সাল থেকে উনিশশো চল্লিশ সাল পর্যন্ত বাংলা সরকার অন্তত ছয়বার শিক্ষা পর্ষদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়। ফজলুল হক যখন মাধ্যমিক শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণহিন্দুরা সেটাকে সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টা বলে নিন্দা করেন। ফজলুল হক এই নিন্দার জবাবে বলেন, আঠারো বছর আগে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মাধ্যমিক শিক্ষাকে সুষ্টুভাবে পরিচালনার জন্য একটি মাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদ গঠনের জন্য জোর সুপারিশ করেছিলেন। ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সে পরামর্শ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠন করেছে। কিন্তু নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলায় এখন পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও সংরক্ষণ এবং বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে অহেতুক কর্তৃত্ব স্থাপন করছে। প্রকৃত পক্ষে এটি প্রদেশের শিক্ষার অগ্রগতির পক্ষে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্ণ হিন্দুগণ মোট জনসংখ্যার ষোল ভাগ, যাঁরা শূদ্রদের ছাত্রাবাসে আসন দেন না, তাঁরাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব করছেন। তিনি বলেন, বাংলার জনসংখ্যার বায়ান্ন শতাংশ মুসলমান এবং ত্রিশ শতাংশ তফসিলির পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণে কোনো হাত নেই।

ফজলুল হক যখন মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, বর্ণহিন্দুরা খুব সহজেই এটা বুঝতে পারছিলেন তাহলে শিক্ষার উপর থেকে তাঁদের দীর্ঘদিনের একাধিপত্য কমে যাবে। সেজন্য তাঁরা বললেন, মাধ্যমিক শিক্ষাকে শিক্ষাবিদদের তত্ত্বাবধানে না রেখে একটি রাজনৈতিক সংস্থার অধীনে আনা হচ্ছে। শিক্ষাবিদ পরমেশ আচার্য বর্ণ হিন্দুদের এই বক্তব্যের সমালোচনা করে লিখছেন, ব্যাপারটা যেন এই, শিক্ষার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই এবং কোনোদিন ছিল না বা থাকা উচিৎ নয়। এ থেকে বোঝা যায় বর্ণহিন্দুরা নিজেদের একাধিপত্য রক্ষায় কীরকম অন্ধ ছিলেন। ফজলুল হক কিন্তু তাঁর প্রস্তাবে পঞ্চাশ সদস্যর এক শিক্ষা পর্ষদের প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে বাইশ জন হিন্দু, বিশ জন মুসলমান এবং সাত জন ইউরোপিয়ান থাকবে। পঞ্চাশ জন সদস্যের মধ্যে বাইশ জন সরাসরি শিক্ষার সাথে যুক্ত প্রতিনিধি হবেন এবং বাকিরা বিভিন্ন অংশ থেকে আসবেন। সুবিধাভোগী হিন্দুদের পক্ষে কিছুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার এই মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। প্রস্তাবটি আইন সভায় উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা জুড়ে এক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলার আইন সভায় যদিও কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না, মুসলমান সদস্যরা সংখ্যায় বেশি ছিলেন। বাংলা সরকারে মুসলমানদের এই প্রাধান্য হিন্দুদের বেশ সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। সভার হিন্দু সদস্যগণ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাবকে হিন্দু বিরোধী, শিক্ষা ও কৃষ্টি ধ্বংসকারী, প্রগতি বিরোধী প্রভৃতি আখ্যায় আখ্যায়িত করেন। বহুদিনের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পরিবর্তিত আবস্থার সঠিক মূল্যায়নে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। সভার জনৈক মুসলিম সদস্য বলেন, বর্ণহিন্দুরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই এই প্রস্তাবকে সমর্থন করছেন না। কংগ্রেস সদস্য হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী গর্বের সঙ্গে তার পাল্টা জবাব দেন, ‘এই বর্ণহিন্দুরাই তাঁদের রক্ত দিয়ে এইসব বিদ্যালয় গড়েছেন। আর কি সাহস! তাঁদের সম্পর্কে আপনারা প্রশ্ন তুলছেন।’ ঢাকার ফজলুর রহমান তখন বর্ণহিন্দুদের দ্বারা দরিদ্র কৃষকদের শোষণ করা কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাংলার গরীব কৃষকদের খরচায় বলুন।’ হরেন্দ্র চৌধুরী তখন রেগে গিয়ে উত্তর দিলেন, গরীব কৃষকদের কথা আসছে কেন? ছাত্রদের বেতন আর বেসরকারী স্বেচ্ছাদানে বিদ্যালয়ের খরচ সংকুলান হয়। বিদ্যালয়ে পড়তে পারে না যে-সব গরীব কৃষক, সেসব গরীব কৃষকদের পয়সায় নয়। হরেন্দ্র চৌধুরী সরাসরি বর্ণহিন্দুদের পক্ষ নিলেন।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও সরাসরি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্ণহিন্দুদের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, এই সরকার পরপর একাধিক বিতর্কিত আইন প্রণয়ন করেছেন, তবে এটির মতো আর কোনোটিই নয়। এই প্রস্তাব সাম্প্রদায়িকতার জঘন্যতম নিদর্শন। তিনি বলেন, সরকারের পুনর্গঠিত পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষাকে ছাড়খার করে দেওয়ার পথ ধরেছে। তিনি সরকারকে মনে করিয়ে দেন, তিনি কী করে ভুলবেন এই প্রদেশের পনেরশো উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকটি বাদে প্রায় সবই হিন্দুদের দানে আর উদ্যোগে গঠিত। শ্যামাপ্রসাদ খোলাখুলিই বলেন, এই প্রস্তাবকে আইনে পরিণত করা হলে তিনি তা মানবেন না। তিনি বলে দেন, এই প্রস্তাব জোর করে তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হলে হিন্দুদের বিরোধিতার সম্মুখিন হতে হবে। সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপোষের কোনো রাস্তা খোলা নেই এবং আমরা এই নতুন বিপদের বিরুদ্ধে লড়তে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একে স্বীকার করার অর্থ হিন্দুর সর্বনাশ।’ শ্যামা প্রসাদ দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘোষণা দেন, ‘আমি বলছি যদিও আমরা সংখ্যালঘু তবু আমাদের যথেষ্ট দেশাত্মবোধ, সাহস ও প্রভাব রয়েছে আমাদের ন্যায্য অধিকার সুরাক্ষা করার জন্য রুখে দাঁড়াবার। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার চাইতে মহান আর কোনো কর্তব্য আমাদের নেই। এরজন্য আমরা যে-কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।’

হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ খণ্ডন করে আবু হুসেন সরকার বলেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরের সরকারের পুরো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এবং উপাচার্য বাদে একশো দশ জন সদস্যর মধ্যে মাত্র বিশ জন নির্বাচিত, দশ জন পদাধিকার বলে সদস্য আর বাকি আশিজন আচার্যের মনোনীত। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চিত্তরঞ্জন দাশ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘গোলামখানা’ বলেছিলেন। তিনি অভিযোগের সুরে জানান যে, বিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই শিক্ষকদের উন্নতির জন্য কিছুই করেননি। মধ্যশিক্ষা প্রস্তাবকে কিরণশঙ্কর রায় শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা আমদানীর ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান চোদ্দশো বিদ্যালয়ের বারশোই হিন্দুদের দ্বারা স্থাপিত, তিন লক্ষ ছাত্রের মধ্যে মাত্র আশি হাজার মুসলমান।’ প্রচ্ছন্ন গর্বের সঙ্গে তিনি আরো বললেন যে, যদিও তিনি এর জন্য গর্ব প্রকাশ করছেন না কারণ একজন কংগ্রেসী হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাম্প্রদায়িক নয়। কিন্তু মুসলমানরা কিছু চাপিয়ে দিলে তিনি অবশ্যই সাম্প্রদায়িক হতে দ্বিধা করবেন না।

নলিনীরঞ্জন সরকার মধ্যশিক্ষা প্রস্তাবটিকে সাম্প্রদায়িক এবং অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করলেন। হিন্দু সদস্যদের বিভিন্ন আলোচনা প্রেক্ষিতে মুস্তাফা গসোয়াল বলেন যে, সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে বিরোধী পক্ষ আইনের মাধ্যমে সরকারের নেয়া সব ভালো প্রচেষ্টাকে বিনষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে দেখান যে, বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইন, বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষা আইন, বঙ্গীয় কৃষি ঋণ-সংক্রান্ত আইন, মহাজনী আইনগুলি প্রায় বৈপ্লবিক ফল দিয়েছে। অথচ বিরোধী পক্ষ সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে সেদিনও সে-সব আইনের বিরোধিতা করেছিলেন। সৈয়দ বদরুদ্দোজা বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব সাম্প্রদায়িক নয়, শুধু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে মাত্র। তিনি বলেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে সংখ্যাধিক্যের জোরে সমস্ত কণ্ঠস্বর চেপে দেওয়া হয় এটা সেরকম নয়। মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠিত হলে শিক্ষা পরিচালনায় মুসলমানরাও তাঁদের বক্তব্য বলার সুযোগ পাবেন। তিনি বলেন মাধ্যমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ একান্তই জরুরী, শুধুমাত্র এক সম্প্রদায়ের দ্বারা এবং এক সম্প্রদায়ের স্বার্থ দেখার জন্য নয়; এদেশে বসবাসকারী সকল শ্রেণীর এবং সকল অবস্থার মানুষের জন্য।

শরৎচন্দ্র বসু সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, মধ্যশিক্ষা প্রস্তাব আইনে পরিণত করা হলে প্রয়োজনে সরকারী পর্ষদের পাল্টা জাতীয় মধ্যশিক্ষা পর্ষদ গঠন করা হবে। আবদুর রশিদ মামুদ হিন্দু মানসিকতার পর্যালোচনা করেন এভাবে যে, হিন্দু ভাইয়েরা সবসময়ই সাম্প্রদায়িক চিন্তা করেন কিন্তু প্রকাশ করেন জাতীয় পরিভাষায়। তিনি আরো বলেন, যদিও মুসলমানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হেতু মধ্যশিক্ষা প্রস্তাব গ্রহণ করলে তা হবে আইনসঙ্গত এবং গণতান্ত্রিক কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তা করতে চাইছেন না বলেই তা করাটা হবে এখন তাদের চোখে সাম্প্রদায়িক। মধ্যশিক্ষাকে ঘিরে এই যে বিতর্ক, তা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে আবার জাগিয়ে তুললো। মাধ্যমিক শিক্ষা প্রস্তাব সম্পর্কে অতুলচন্দ্র সেন দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, ‘যদি কখনো এই জঘন্য প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করার চেষ্টা করা হয় তখন আমরা দেখাবো, আমরা জানি কী করে একে রুখতে হয়। পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমরা একবার তা দেখিয়েছিলাম বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে অনেক বড় মাপের এক ব্যক্তির সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে লড়ে।’ তিনি বঙ্গভঙ্গ রদ করার উদাহরণ টানেন। সুহরাওয়ার্দী তখন বলেন, সেটা আজকে আর সম্ভব নয়। অতুলচন্দ্র দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, ‘হ্যাঁ মশায়। আজকেও আমরা যে কোনো সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারি। নিষ্পত্তি হওয়া ব্যাপারকেও রুখে দিতে পারি।’ ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত তাই দাঁড়িয়েছিল। বর্ণহিন্দুরা তা রুখে দিয়েছিলেন বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে। অথচ সাতচল্লিশের দেশভাগের পর বায়ান্ন সালেই পশ্চিমবঙ্গে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ গঠিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত থেকে মাধ্যমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমিক পর্ষদের হাতে চলে যায়। বর্ণহিন্দুরা তখন আর ব্যাপারটিতে আপত্তি তোলেননি।

মূল বিতর্কে বলা হয়েছিল, মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ মুসলমানদের হাতে পড়লে বাংলা ভাষা ধ্বংস হবে। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষই বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছে। ইতিহাসে নানা অপব্যাখ্যা, ভুল বিচার বিবেচনা বহু মহৎ কার্যক্রমকে পিছিয়ে দেয় বা দ্বিধাবিভক্ত করে।

রচনাটি লিখবার জন্য উপরে আলোচ্য ব্যক্তিরা ছাড়াও যাদের রচনার সাহায্য নেয়া হয়েছে তারা হলেন, পুলক চন্দ, বিনয় ঘোষ, গৌতম ভদ্র, রণজিৎ ঘোষ, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, কমল চৌধুরী, অবণী লাহিড়ী, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়, সুদিন চটোপাধ্যায়, সুকান্ত পাল, যোগেশচন্দ্র বাগল, হিতেশরঞ্জন স্যান্নাল, গোলাম মুরশিদ, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জিত সেন, অরবিন্দ পোদ্দার, সুখময় সেনগুপ্ত, মুস্তফা নূরউল ইসলাম, আশিষ খাস্তগীর, সিদ্ধার্থ গুহ রায় ও সুখরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।