মারিয়া সালাম

মারিয়া সালাম

ভালোবাসা দিবসের গল্প ‘লিপস্টিক’

মারিয়া সালাম

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬

মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখল নীরা—রাত ৯টা বেজে গেছে। কললিস্টে গিয়ে আবিরের নম্বরে একটা কল দিয়েই কেটে দিল সে। ভাবল, থাক, ওকে আর কল দেব না, যা ইচ্ছা করুক।

রাগে নীরার শরীর রি রি করছে। এত অবহেলা আর সহ্য করা সম্ভব নয়। নীরা মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘আমারই চলে যেতে হবে।’ গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কষ্টটা গিলে সে ফেসবুকে রিলস দেখা শুরু করল।

প্রথমেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল— কীভাবে বুঝবেন আপনার সঙ্গী পরকীয়ায় জড়িত?

সেখানে বলা হচ্ছে, পরকীয়া প্রেমের কিছু লক্ষণ সহজেই বোঝা যায়:

    • সঙ্গী পাশে বসেও সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকা বা গোপনে কথা বলা।

    • অকারণে আপনার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।

    • বিনা কারণে খিটখিট করা বা রেগে কথা বলা।

পড়া শেষ করতে পারল না নীরা, দু’চোখ ফেটে অশ্রু নামল। সব লক্ষণ আবিরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ইদানীং সে রাত ১০টার আগে বাসায় ফেরে না। ফিরেই ফোন নিয়ে পড়ে থাকে, কথা বলতে গেলেই খেঁকিয়ে ওঠে। পরিবারের অবাধ্য হয়ে আবিরকে বিয়ে করেছিল বলে নীরা এখন কাউকে কিছু বলতেও পারছে না।

এমন সময় আবিরের ফোন এলো। নীরা জানে সে কী বলবে— ‘সরি নীরা, অফিসের চাপে দেরি হচ্ছে।’ রাগে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মারল নীরা। দ্বিতীয়বার কল এলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা ধরল। ধরা গলায় `হ্যালো` বলতেই ওপাশ থেকে আবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে নীরা? তুমি কি কাঁদছ?’

নীরার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবির ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ‘প্রতিদিন এই নাটক আর ভালো লাগে না। এখনই কান্না থামাও, নয়তো আজ আমি বাড়ি ফিরব না। সারা দিন কাজ শেষে তোমার ওই হাঁড়িমুখ দেখার ইচ্ছা আমার নেই।’

নীরা জানে, আবির রেগে গেলে সত্যিই ফিরবে না। গলার স্বর সামলে নিয়ে সে বলল, ‘শুধু শুধু কাঁদব কেন? আজাইরা কথা বলার জায়গা পাও না? এসব ফালতু কথা অন্য কোথাও গিয়ে বলো।’ কল কেটে দিয়ে সে বারান্দায় গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পর আবিরের অফিসের গাড়ি এসে থামল। অন্য সময় নীরা নিজে গিয়ে দরজা খুলে দেয়, আজ চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎ পেছন থেকে আবিরের ডাক শুনে তাকিয়ে দেখল, ওর হাতে একগুচ্ছ গোলাপ। নীরা ভাবল, আজ তো বিশেষ দিন নয়, নিশ্চয়ই ওর নতুন প্রেমিকা দিয়েছে। অভিমানে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আবির বারান্দায় এসে ফুলগুলো নীরার কোলে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘সরি।’
নীরা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সরি কেন?’
‘এই যে আমি সারাদিন ব্যস্ত থাকি, তোমার খারাপ লাগে, তাই। আগামীকাল ছুটি নিয়েছি, তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবো।’ এই বলে আবির হাত ধরে নীরাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল।

অনেক দিন পর নীরা একটু স্বস্তি বোধ করল। দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করল। কিন্তু ঝামেলা বাধল ঘুমানোর আগে। নীরা দেখল, আবিরের নাকের ডগায় লিপস্টিকের দাগ!
‘তোমার নাকে লিপস্টিকের দাগ কীভাবে এলো?’ নীরা তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল।

আবির অবাক হয়ে আয়নায় দেখে টিস্যু দিয়ে নাক মুছতে মুছতে বলল, ‘তোমার থেকেই লেগেছে হয়তো, আর কোত্থেকে আসবে?’

সন্দেহবশত নীরা নিজের সব লিপস্টিকের রঙের সঙ্গে টিস্যুর দাগ মেলাল। হ্যাঁ, রঙটা ওরই লিপস্টিকের। কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে সে রাতে ঘুমাতে গেল।

পরদিন বেলা করে ঘুম ভাঙল নীরার। আবিরকে রুমে না দেখে সে ভাবল, ‘হারামজাদা আবার মিথ্যা বলেছে, সকালেই অফিসে চলে গেছে।’

ঠিক তখনই আবির ঘরে ঢুকে বলল, ‘গুড মর্নিং! দেখলাম তুমি ঘুমাচ্ছ, তাই ডাকিনি। আমি আর চাঁদনি মিলে নাস্তা বানিয়ে ফেললাম।’ সকালের আলোয় আবিরকে খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল।

হঠাৎ নীরার চোখ আটকে গেল আবিরের নাকে। আবার লিপস্টিকের দাগ! অথচ রাতে সে নিজ চোখে ওটা মুছতে দেখেছিল। নীরা ভাবল, তবে কি চাঁদনির সঙ্গে...? চাঁদনি এই বাসায় মাস তিনেক হলো কাজ করছে, বয়স মাত্র ১৪-১৫ বছর।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে নীরা চিৎকার করে উঠল, ‘লম্পট! শেষ পর্যন্ত একটা নাবালিকা মেয়েকে হেনস্তা করছিস? আমি এক মুহূর্ত তোর সাথে থাকব না, তোকে জেলের ভাত খাওয়াব!’

হতভম্ব আবির বলল, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? আমি কী করেছি?’
‘তোর নাকে আবার লিপস্টিকের দাগ কেন? আজই বিদায় হবো আমি!’

নীরার রণমূর্তি দেখে আবির অসহায় হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি দ্রুত বিদায় হও। এভাবে আমিও আর পারছি না।’

নীরা ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে গিয়ে দুর্বল বোধ করল। দরজায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই চাঁদনি এসে হাত ধরল, ‘আন্টি, একটু বসেন। পানি খান, আপনাকে খুব অসুস্থ লাগছে।’

নীরা চাঁদনিকে চড় মারতে গিয়েও থেমে গেল। ভাবল, ছোট মেয়েটার আর কী দোষ!

সে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মুখ ধুতে। আয়নায় তাকিয়েই সে চমকে উঠল, নীরার নিজের নাকের ডগাতেই ঠিক একই জায়গায় লিপস্টিকের দাগ! একটু আগে যে গ্লাসে পানি খেয়েছে, সেটা হাতে নিয়ে দেখল গ্লাসের কিনারায় লিপস্টিক লেগে আছে। আসলে গতকাল সন্ধ্যায় সে ওই গ্লাসেই পানি খেয়েছিল, যা থেকে তার নিজের নাকে এবং পরবর্তীতে আবিরের নাকে দাগ লেগেছিল।

ভুল বুঝতে পেরে গ্লাসটা হাতে নিয়ে লিভিং রুমে এলো নীরা। আবির বিরস মুখে বলল, ‘কী, এখনও যাওনি কেন?’

কথা না বাড়িয়ে নীরার পাশে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি হরর মুভি দেখব। তোমাকেও দেখতে হবে, নয়তো কিন্তু এখনই বাসা থেকে বের হয়ে যাব!’