করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৭০৩১৭০ ৫৯১২৯৯ ৯৯৮৭
বিশ্বব্যাপী ১৩৭৩৪০৪২২ ১১০৫৩৮৩৬৩ ২৯৬১৪২৩

মারুফ ইসলামের আত্মগদ্য ‘দহনদিনের লিপি’

প্রকাশিত : এপ্রিল ০২, ২০২১

যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই ডায়েরি লেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত আলস্যের কারণে দুই তিন দিন পর প্রতিবার থেমে গেছি। কখনোই কন্টিনিউ করতে পারিনি।

`কন্টিনিউ` বলা কি ঠিক হলো? আমি না বাংলা ভাষার লেখক? আমার উচিত যথাসম্ভব বাংলা শব্দ ব্যবহার করা। ইংরেজি পরিহার করা। কিন্তু কন্টিনিউ মানে যেন কী? ইদানীং পথেঘাটে, ঘরে, অফিসে, আড্ডায়, কাজে সর্বত্র দু’চারটে ইংরেজি বলতে বলতে সেসবের বাংলা আর সহসা মনে পড়ে না। কন্টিনিউ সম্ভবত সেরকম একটা শব্দ। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কন্টিনিউ মানে ধারাবাহিকতা। তো যা বলছিলাম, আমি কখনোই ডায়েরি লেখায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারিনি। নিয়মিত লিখতে পারিনি।

অথচ ডায়েরি লেখা খুবই চমৎকার একটা ব্যাপার। ডায়েরি লেখার অভ্যাস মানুষকে গুছিয়ে চিন্তা করতে শেখায়। আমার ছোট্ট শ্যামল সুন্দর এই দেশে গুছিয়ে চিন্তা করা মানুষের বড্ড অভাব। এদেশে ছেলেমেয়েদেরকে কখনোই ডায়েরি লিখতে বলা হয় না। তবু একটা সময় কিশোর-কিশোরীরা লুকিয়ে লুকিয়ে ডায়েরি লিখত। লুকিয়ে লুকিয়ে মূলত তারা নিজেদের অবিশ্বাস্য এক অনুভূতির কথা লিখে রাখত, যে অনুভূতি তারা এতদিন দেখেনি, ছোঁয়নি, অনুভব করেনি। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে বিস্মিত হয়ে, মূক হয়ে বসে থাকত সেই অনুভূতির সামনে।

আহা প্রেম! বর্ণহীন, গন্ধহীন, স্পর্শরহিত এক অব্যাখ্যাত অনুভূতির নাম। সদ্য কৈশোরে পা দেয়া কিশোর-কিশোরীরা সদ্য প্রেমে পড়ার পর ডায়েরি লিখতে শুরু করত। তারপর মায়ের হাতে, বড় ভাইয়ের হাতে, নয় তো বাবার হাতে ধরা পড়ে বেজায় পিটুনি খেয়ে সেই ডায়েরি লেখার চিরমৃত্যু ঘটত। এসব ঘটনার সর্বশেষ প্রয়োগ আমরা দেখেছি নব্বই দশকে। দু’হাজারের পরের প্রজন্ম কি কখনো ডায়েরি ছুঁয়ে দেখেছে? ডায়েরি যে একটা গভীর গোপন বিষয়, তা কি তারা জানে? ডায়েরি প্রকাশ্যে রাখার জিনিস নয়, তা রাখতে হয় ট্রাঙ্কের ভেতর অনেক কাপড়-চোপড়ের মধ্যে লুকিয়ে, তা কি তারা জানে? লুকিয়ে রাখতে রাখতে ডায়েরিতে ধুলো জমে, সেই ধুলো ঝাড়তে গিয়ে নাকে অ্যলার্জি হয়, হাঁচি দিতে হয় বারবার, ডায়েরির পাতা উল্টালেই পাওয়া যায় অদ্ভূত পুরনো এক গন্ধ, এসব কি তারা জানে?

ডায়েরি অনেক `পুরনো আমি`কে ধরে রাখে। গতকালের আমিকে আজকের আমির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আজকের আমিটা গতকালকে দেখে লজ্জাবতীর মতো নুয়ে পড়ে। আমি এমন ছিলাম! আল্লাহ! ছি, ছি!

এইসব ব্যাক্তিগত লাজনম্র অনুভূতির আলপথ বেয়ে ডায়েরি কখনো কখনো হয়ে ওঠে সময়ের দলিল। ইতিহাসের সাক্ষী। যেমন আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির কথা বলতে পারি। আচ্ছা, ডায়েরিকাহন আপাতত থামাই। মূল কথায় যাই। ভাবছি, আজ থেকে প্রতিদিন ডায়েরি লিখব। যে জল্লাদ সময় অতিক্রম করছি আমি এবং আমরা তার খানিক নমুনা ধরা থাকুক এখানে। আজ থেকে অনেক অনেক বছর পর, ছানিপড়া ঘোলাটে চোখের সামনে যখন মেলে ধরব এই দিনলিপি, তখন পুরনো আমিকে দেখে বৃদ্ধ আমি কি লজ্জা পাব? তখনও কি বলব, ছি, কি ছেলেমানুষ মানুষ ছিলাম!

আজ এপ্রিল মাসের প্রথম দিন। কোনো এক কবি বলেছিলেন, নাম মনে পড়ছে না, এপ্রিল ইজ দ্যা ক্রুয়েলেস্ট মান্থ। কথাটা সত্য হয়ে ধরা দিল একেবারে সাত সকালেই। লোকাল বাসে অফিসে যাচ্ছিলাম। সেই বাসের ড্রাইভার হেলপারের সঙ্গে এক যাত্রীর মারামারি দেখতে হলো। মারামারির কারণ, করোনা সংক্রমণ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সরকার যানবাহনে লোকসমাগম সীমিত করেছে। অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস চালাতে বলেছে। এজন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৬০ শতাংশ। কিন্তু বাসের ড্রাইভার ও হেলপাররা এসব মানছে না। ভাড়া ঠিকই বেশি নিচ্ছে, আবার অতিরিক্ত লোকও ওঠাচ্ছে। এসব নিয়েই মারামারি।

সরকার শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করেই খালাস। কোথাও কোনো মনিটরিং নেই, কোথাও কোনো সমন্বয় নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই। মন যা চায় ত্বরাই করছেন এ ভবে!

অফিসে সারাদিন ভালোই কাটল। কাজের খুব বেশি চাপ ছিল না আজ। শেষবেলা প্রেজেন্টেশন দিতে হলো। অফিসের ভাষায় বলে, ইন্টার্নাল মান্থলি প্রেজেন্টেশন। আনঅফিশিয়াল ভাষায় আমরা বলি, স্যালারি নির্ধারণী প্রেজেন্টেশন। সারা মাস কী কাজ করলাম, কী ভ্যালু অ্যাড করলাম, সরল বাংলায়, কত টাকা আয় করে দিলাম প্রতিষ্ঠানকে তা গুগল মিটের মাধ্যমে প্রেজেন্টেশন দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়। এ এক অদ্ভুত ক্যারিকেচার। চলছে গত এক বছর ধরে। এর বেশি কিছু প্রকাশ্য ডায়েরিতে লেখা সমীচীন হবে না। অতএব রুখ যাই।

অফিস থেকে ফেরার পথে, ফিরছিলাম অফিসের গাড়িতেই, হঠাৎ মনে পড়ল পুরনো একজনের কথা। কেন মনে পড়ল কে জানে? রাস্তার দুপাশে অসম্ভব ধুলো উড়ছে, ধুলোয় গাছের পাতা সাদা হয়ে গেছে, বাসের জানালা গলে দূরে কোথাও আকাশ দেখা যায়, সামান্য নীল—এসবই কি মনে করিয়ে দিলো পুরনো সেইজনকে? জানি না। মন সবসময় যুক্তির পথ ধরে হাঁটে না। টের পেলাম, চোখটা ভেজা ভেজা। সারাপথ চোখটা ভেজা ভেজাই থাকলো। বুকের মাঝখানটায় কেউ একজন খামচি ধরে থাকল। চাপ চাপ ব্যথা! মনে মনে বললাম, টের পাও, টের পাও কিছু? টেলিপ্যাথি বলে জগতে কিছু নেই আসলে। সে কিছুই টের পায় না। বুকের ভেতর লোনাব্যথার ঢেউ বাড়ল। মনে মনে বললাম, তোমার জীবনটা কাঁটাহীন ফুলগাছ হোক!

লেখক: কথাসাহিত্যিক