রক্তমাখা চাঁদের আলো অথবা নিজের কথা

পর্ব ৬৭

জাকির তালুকদার

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৪, ২০১৯

ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় আছে আমার স্ত্রী, পুত্র, ভাই, বোন, ভাগ্নেরা, তাদের স্ত্রী, এবং আমার পরিবার সংশ্লিষ্ট আরো অনেকে। তাছাড়া আমার সব পোস্ট যেহেতু পাবলিক, সবার জন্য উন্মুক্ত, তাই তারা আমার বন্ধু তালিকায় না থাকলেও আমার সব লেখাই পড়তে পারে। লেখকের সব লেখাই তো সবার জন্যই। কেবলমাত্র ব্যক্তিগত চিঠিপত্র হয়তো শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য লেখা হয়। সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হলে লেখকের মৃত্যুর আগে বা পরে প্রকাশিত হয় সম্পাদনার আকারে।

ফেসবুককে আমি কখনো সাহিত্য প্রকাশের জায়গা হিসাবে গ্রহণ করিনি। তার জন্য অন্য মাধ্যম আছে। যেসব লেখা পত্রপত্রিকার জন্য নয়, অথচ লেখাটা জরুরি মনে হয়, সেসব লিখি আমি ফেসবুকে। কখনো বিতর্কেও জড়াই। সব বিতর্কেই যে আমার অবস্থানই সবসময় সঠিক, তা আমি দাবি করি না। কোনো ভুল তথ্য উপস্থাপন করার পরে সেই ভুলটা বুঝতে পারলে আমি প্রকাশ্যেই ভুল স্বীকার করি।

তো যেখানে আমার সব লেখা সকল পরিজনরা পড়তে পারে, সেখানে আমি অশ্লীলতা বা নোংরাচর্চা তো করতে পারি না। আমি এমনিতেও কখনো অশ্লীলতাকে কোনো লেখাতেই আনিনি। প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণ আমি শব্দ-ব্যবসায়ী নই, সাহিত্যিক। ব্যবসা করার বা টাকা উপার্জন করার অনেক জায়গা আছে। সেগুলো বাদ দিয়েই সাহিত্যজগতে এসেছি। কাজেই সরস্বতিকে বাজারে নাচানো আমার লক্ষ-উপলক্ষ-চিন্তা কোনোটাই নয়। কোনো কোনো লেখায় স্ল্যাং আসে। তা অপরিহার্য বলেই আসে। সেসব বুঝতে আমার পরিবারের কারো কোনো অসুবিধা হয় না। এবং তার জন্য আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার কোনো কমতি হয়নি কোনোদিন। হবেও না। কারণ তারা আমার মননকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পারে। বিভিন্ন মতবাদের আড়ালে লুকিয়ে যারা নোংরামি চালিয়ে যায়, তাদের সম্পর্কে তীর্যক লেখাগুলিতে স্ল্যাং আসে মূলত বিদ্রূপ এবং ব্যঙ্গকে তীক্ষ্ণতা দিতে। তাছাড়া অনেকসময় এক শব্দের একটি স্ল্যাং দিয়ে যা পরিষ্কারভাবে বোঝানো যায়, তা একপৃষ্ঠা লেখার পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে, কিন্তু অশ্লীলতার অভিযোগ আসেনি কখনো।

আরেকটি প্রসঙ্গ বলে রাখি। ফেসবুকে একটি জিনিস নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। তা হচ্ছে ইনবক্স। পুরুষ হলে নারীবিষয়ে ইনবক্স-ভীতি। আমার সেই দুশ্চিন্তা নেই। কারণ আমি কখনোই কোনো বয়সের কোনো নারীকে ইনবক্সে নক করিনি। কারণ আমি ফেসবুকে এসেছি অন্য কাজ করার জন্য। তাছাড়া নারী-পুরুষ কারো সাথেই ইনবক্সে চ্যাট করার মতো যথেষ্ট সময় আমার নেই। আমার ইনবক্স ব্যবহৃত হয় তথ্য বিনিময়ের জন্য। আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল স্কুলপড়ুয়া পুত্র। ফেসবুকের ব্যাপক ব্যবহার আমি শুরু করি ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময়। সমস্ত হৃদয়-মন নিয়ে আমি শাহবাগে ছিলাম। একটা খুন করলে তার শাস্তি হয় মৃত্যুদণ্ড। অথচ কাদের মোল্লা যাবজ্জীবনের রায় পেয়ে বিজয়-চিহ্ন দেখালে তা আমার সহ্য হয়নি। ঐ রকম অস্বাভাবিক রায়ের দুইটি কারণ থাকতে পারে বলে আমার মনে হয়েছিল। একটি হচ্ছে, সরকারি পক্ষের আইনজীবীরা মামলাটি গোছাতে পারেননি ঠিকমতো। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, সরকারের ভেতরের কোনো মহলের যোগসাজসে কাদের মোল্লা রক্ষা পেয়ে গেছে।

কাদের মোল্লার বিজয়-চিহ্নের প্রতিক্রিয়ায় শাহবাগ আন্দোলনের জন্ম। সেখানে যেতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয়নি। তখন সেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানারকম কুৎসা এবং অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল। নিজের প্রত্যক্ষদর্শী অভিজ্ঞতা থেকে সেসবের প্রতিবাদ জানানো কর্তব্য বিবেচনা করেই ফেসবুকে সক্রিয় হয়েছিলাম। উল্লেখ্য, আমি শাহবাগ আন্দোলনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কেউ ছিলাম না। কোনোদিন মঞ্চে উঠিনি। ছিলাম মাটিতে কাগজ বিছিয়ে বসাদের দলে। পরবর্তীতে গণজাগরন মঞ্চ যখন বিভিন্ন সংকলন করেছে, সেগুলোতে তারা আমার লেখা চেয়েছে। আমি লেখা দিয়েছি। তারা সম্মানের সাথে ছেপেছে। আমার সাথে খুবই আন্তরিক এবং সম্মানজনক ব্যবহার করেছে।

তারপরে মাঝে মাঝে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ফেসবুক আর ছাড়া হয়নি আমার। পরবর্তীতে তীব্র বিতর্ক হয়েছে অনলাইনে নাস্তিকতা প্রচারকারীদের সাথে। ব্লগাররা আহত-নিহত হলে প্রতিবাদ জানিয়েছি, মিছিলে থেকেছি, প্রতিবাদ সভায় থেকেছি, বক্তৃতাও করেছি। কিন্তু শাহবাগ আন্দোলনকে ইসলামবিরোধী আন্দোলন বলে প্রতিপন্ন করার ক্ষেত্রে যখন প্রতিপক্ষ প্রায় সফল হয়ে উঠেছে, সেই সময়ে নাস্তিকতার নামে একচেটিয়া ইসলামবিরোধী প্রচারণাকে আমি আত্মঘাতী মনে করেছি, সমর্থন করতে পারিনি। শাহবাগ আন্দোলনের সময় বিরোধীরা আমাকে যতখানি গালাগালি করেছে, অনলাইনের নাস্তিকতা প্রচারকারীরা তারচেয়ে কম করেনি। যুক্তির পরিবর্তে তারা আমাকে কেবল গালিগালাজই করে গেছে। তাতে তাৎক্ষণিক আহত বোধ করলেও সেগুলো আমার মনের ওপর কোনো স্থায়ী প্রভাব রাখতে পারেনি।

এখন ফেসবুক আমার জন্য প্রধানত সরকারের গণবিরোধী সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিবাদ করার জায়গা। সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জায়গা। সেইসাথে সমমনাদের একত্রিত করার চেষ্টার প্লাটফর্মও বটে। ফেসবুকের বুদ্ধিবৃত্তিচর্চা তো বাংলাদেশের মানুষের গড় বুদ্ধিবৃত্তিরই সমানুপাতিক। এখানেও আওয়ামী এবং বিএনপি পন্থিদেরই প্রাধান্য। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা দিয়ে জামাত-শিবিরও ব্যাপক প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছে। সেইসাথে আছে নারীবাদী গ্রুপ, ফরহাদ মজহারের গ্রুপ, ব্লগার গ্রুপ। এই সমস্ত গ্রুপের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা সবসময় দলবদ্ধভাবে থাকে ফেসবুকে। তাদের কোনো যৌক্তিক সমালোচনাও তারা সইতে নারাজ। একসাথে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে গালি দিতে, ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে, প্রয়োজনে হুমকি দিতে। এরাও আমার বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডা কম ছড়ায়নি। যদিও তাতে তাদের কোনো লাভ বা আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

সব অর্থে বেঁটে বা বামন, এমন কিছু লোক আমার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া নিয়ে অপপ্রচার চালায়। তাদের বলি, বাছারা আগে লিখতে শেখো। অনেক ভালো লেখকই পুরস্কার পাননি, অনেক বাজে লেখকও পুরস্কার পেয়েছেন, আমাকে তাদের সাথে মেলানোর আগে আমার লেখাগুলো পড়ে দেখো। বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিতে যাওয়ার দিন আমি পোস্টে লিখেছিলাম, ‘তেল-গ্যাস-বন্দর-সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনকারীদের একজন হিসাবে আমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি; মফস্বলে বসে যারা সাহিত্যসাধনা করেন, তাদের একজন হিসাবে আমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি; যারা সমাজপ্রগতির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের একজন হিসাবে আমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি।’

ফেসবুক ফিরিয়ে দিয়েছে আমার ২০-২৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের। ফেসবুক আমাকে তৈরি করে দিয়েছে বিশ্বসাহিত্য এবং বিশ্বের মানবিক এবং প্রগতিশীল আন্দোলনকারীদের সাথে সংযোগসূত্র। আমাকে সংযুক্ত করে দিয়েছে বিশ্বের অনেক দেশের মুক্তবুদ্ধির মানুষ এবং সংগঠনের সাথে। ফেসবুক দিয়েছে দূর-দূরান্তের পাঠক-পাঠিকাদের আমার লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ। লেখকের জন্য, বন্ধুর জন্য, সহযোদ্ধার জন্য এরচেয়ে বড় পাওয়া আর কী থাকতে পারে! এইসবের বিনিময়ে অক্ষম লেখক ও পঙ্গুচিন্তার মানুষদের গালাগালি, হুমকি-ধামকি সয়ে যেতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। চলবে

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ধারাবাহিক