রহিমা আফরোজ মুন্নী
রহিমা আফরোজ মুন্নীর নভেলা ‘ধুরন্ধর’
পর্ব-৫
প্রকাশিত : জুন ৩০, ২০২৬
৮.
কফি শপে বসে আইসক্রীম খাচ্ছে নিধি আর ইভান। ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলছে ইভান। নিধি বিরক্ত হচ্ছে মনোযোগ না পেয়ে। বলল, ‘আমার ছবি তুলে দিতে কতবার বলতে হয়, অথচ অন্য মেয়েদের ছবি তুলছ খুব আগ্রহ নিয়ে।’
বিরক্ত হয়ে ইভান বলল, ‘বোকার মতো কথা বলো না নিধি। আমি চেহারা দেখে ছবি তুলি না, দেখি কম্পোজিশন, ফ্রেমিং এইসব।’
নিধি আচম্বিতে ক্যামেরা টান দিয়ে নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘আইসক্রীম গলে সেটার কম্পোজিশন নষ্ট হচ্ছে, খাও আগে।’
বলতে বলতে ছবিগুলো দেখছে, ‘এই তোমার ফ্রেমিং!’ বলতে না বলতেই আগের তোলা অনামিকার ছবিগুলো চলে এলো। ওর ছাত্রী, তাই চিনতে দেরি হলো না। দ্রুত এক ঝলক দেখেই ফিরে আসলো কফি শপের ছবিতে।
হতাশ চেহারায় ভাবল, কম্পোজিশনের নামে ছাত্রীর উলঙ্গ ছবি তুলতে ইভানের মোটেও অস্বস্তি হলো না। নিধির চেহারার পরিবর্তন চোখ এড়ালো না ইভানের। দ্রুত ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে চেক করল। অনামিকার ছবিগুলো পর্যন্ত যাওয়া হয়নি দেখে আস্বস্ত হলো।
মুড অফের কারণ জানতে জিজ্ঞেশ করল, ‘আইসক্রীম পছন্দ হয়নি মাদামোজোয়েল?’
নিধির অসহ্য লাগলো নাটুকেপনা। বলল, ‘বাসায় যাব।’
৯.
ইভানের সাথে বের হলে নিজেই গাড়ি চালায় নিধি। চাবিটা ড্রাইভারের হাতে দিয়ে লিফটে ঢুকল। হাতে ফুলের তোড়া আর বিভাসের পছন্দের কেক। মনে মনে গজগজ করছে সে, আর না, যথেষ্ট হয়েছে! মজার ছল করে ইভানের ছেলেখেলা, এই চ্যাপ্টার এবার শেষ, চিরতরে শেষ, তার ওপর ভরসা করে সে বিভাসের প্রতিও অবহেলা করেছে সামান্য হলেও। নাহলে হয়তোবা এতদিনে খানিকটা পরিবর্তন আসত তাদের সম্পর্কে।
লিফট থামতেই চাবি হাতে দরজা খুলতে গিয়ে নিধির কেক ধপাস করে পড়ে মেঝেতে, কেকের বেহাল দশা দেখে নিধি ভাবল, এটাই ইঙ্গিই, আর বোধহয় কিচ্ছু সামলানো যাবে না। হতাশ হাতে সব জড়ো করে টেবিলে রাখল। গোসল সেরে কোনো এক জমানার বিভাসের পছন্দের লাল শাড়ি আর লাল টিপ পরে, ফুলদানিতে ফুলগুলো সাজায়। বিভাসের পছন্দের গান চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না।
আলমিরা খুলে বের করে অ্যালবাম। বিয়ের সময় তোলা এইসব ছবি ছাড়া আর কিছুতে জীবন্ত নেই তাদের সম্পর্কের। মনটা বেদনায় হুহু করে ওঠে নিধির। কলিং বেলের শব্দে দ্রুত উঠে যায় অ্যালবাম খোলা রেখেই। বিভাস ঘরে ঢুকেই ফুলের মিষ্টি গন্ধ নাকে টেনে বলে, ‘আমি ভাবলাম ভুল করে অন্য ফ্ল্যাটে ঢুকে গেছি।’
নিধির শাড়ি টিপ কিছুই তার চোখ পড়ল না। খোলা অ্যালবাম দেখে হাসল। নিজকেই বলে, ‘শিশু লাগছে আমায়।’
নিধি কেক বেড়ে দেয়। কফি বানিয়ে এনে লাইব্রেরি রুমে ঢুকে বসে থাকে। আজকে আঠার মতো লেগে থাকবে বলে ঠিক করেছে। বিভাস বিরক্ত হয়ে তাকায়। অকারণে নিধিকে বসে থাকতে দেখা যায় না। বলল, ‘কী বলবে?’
নিধি বলল, ‘কিছু না, এই যে তুমি জিজ্ঞেশ করবে, এর জন্যই।’
১০.
ইউনিভার্সিটির এক্সট্রা কারিকুলামের ক্লাসে পরিচয় হয় অনামিকা আর তনুশ্রীর। তাদের সখ্য বিপদজনক পর্যায়ের। সবাই ফোঁড়ন কাটে ম্যাড ফর ইচ আদার বলে। অনামিকার পুরো নাম অনামিকা শীল। কিন্তু ইভান স্যার সবার একটা করে সংক্ষিপ্ত নাম ধরে বেঁধে ডাকে, অনামিকা হলো অনু, তনুশ্রী তনু, এই রকম বাকিদেরও, এমনকি কলিগদেরও ছাড় নেই। প্রিয়তি ম্যাডাম হলো প্রিয়, শুধু নিধি ম্যাডামের বেলায় তার এইসব ছেলেমানুষীর কোনো সুযোগ নেই।
তার ব্যাক্তিত্বই এমন যে, ভীষণ ভক্ত বনে গেছে অনামিকা। ক্লাসে কিছু জানতে চাইলে অতি উত্তেজনায় সে খেই হারিয়ে ফেলে। ম্যাডামের ঘাড় ছাটা চুলের নিচে ট্যাটু করা জায়গাটা তার খুব প্রিয়। ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেখে নিজেও এমন করাবে বলবে। ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু লিখতে গেলে ম্যাডামের ঘাড় থেকে চোখ সরে না তার। অবসেশন যখন এমন বাড়ছে সেই সময় ম্যাডামের অফিস রুমে ডাক পড়ে অনুর। হতচকিত অনু বুঝতে পারে না কারণ।
ম্যাডাম কি টের পেয়ে গেছে তার অবসেসড হওয়া! ভীষণ নার্ভাস অনু সবচেয়ে ভালো জামাটা পড়ে তৈরি হয়। নার্ভাসনেস কাটাতে গাঁজা টেনে এসেছে সে। রুমে ঢুকতেই নিধি বলল, ‘দরজাটা বন্ধ করে দাও।’
হৃদপিণ্ডটা যেন ফেটে বেরিয়ে যাবে এমনভাবে বুকে হাতচাপা দিল অনামিকা। ম্যাডাম কিছু টের পেয়েছে তবে! উত্তেজনা আর খুশি মিলে স্মার্ট হবার চেষ্টা করে, ‘শিউর ম্যাম।’
নিধি স্বাভাবিক মুখ করে বলে, ‘যা জিজ্ঞেশ করব, তার ঠিকঠাক জবাব দেবে। আর এই রুমে যা কথাবার্তা হবে এখন, তা বাইরে যাবে না।’
খসে পড়ল সমস্ত উত্তেজনা। নিজেকে প্রায় উলঙ্গ লাগল অনামিকার। প্রাণপণে শেষ কাপড়টুকু ধরে রাখবার ভঙ্গিতে ফতুয়ার বুকের কাছটা খাঁমচে ধরল। শীতল স্বর নিধির, ‘ইভানের সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক?’
অনামিকা বুঝতে পারে কেন এত রাখঢাক। জেলাস আর রাগ মিলিয়ে তার উত্তর, ‘পেশাগত সম্পর্ক, আমি প্রফেশনাল মডেল, টাকার বিনিময়ে পোজ দেই, স্যার আমার কিছু ছবি তুলেছে স্রেফ।’
অনামিকার মুখ থেকে কথা কেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ সেই ছবিগুলোর বিষয়েই জানতে চাইছি। ছাত্রীর এমন ছবি স্যার তুলে কি করে সেই গল্প শোনাও।’
অনামিকা বলে ওঠে, ‘গল্প নয় সত্যি, ফ্যামিলি থেকে আমাকে সাহায্য করা হয় না, খরচ চালাতে বাধ্য হয়েই।’
কথা কেড়ে নিয়ে নিধি বলে, ‘আদর করে অনু ডাকে, পুরো ন্যাংটো করে ছবি তুলে কিন্তু একটু ছুঁয়েও দেখে না, বলো আরও, গাঁজা খেয়ে এসেছ এবার গাঁজাখুরি গল্প শোনাও।
অনামিকা অবাক, ‘আপনি টের পেলেন?’
নিধি মুচকি হাসে, ‘তোমার প্রিয় স্যারের সাথে এটাও চলে?’
অনামিকা উত্তর দেয়, ‘স্যারের অভ্যাস।’
নিধি কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘যেমনটা তোমার সাথে শোয়াটাও।’
অনামিকা শান্ত স্বরে বলতে থাকে, ‘না ম্যাম, আমি টাকার বিনিময়ে পোজ দেই। এর বাইরে কোনো সম্পর্ক নেই। বরং অ্যাজ অ্যা ক্যারেক্টার হি ইজ সো চীপ যে আমি ভাবতেই পারি না…’
কথা শেষ হবার আগেই নিধি বলে, ‘শোবার বিনিময়ে বুঝি পেমেন্ট করে না?’
অনামিকা এবার অধৈর্য হলো, ‘আপনি পুরো কথাটা শেষ করতে দিচ্ছেন না। আমি একজন লেসবিয়ান, আমার গার্লফ্রেণ্ড আছে। পুরুষের সাথে শোবার ইচ্ছেই আমার নেই।’
নিধি কৌতূহলী চোখে জানতে চায়, ‘মেয়েটা কে?’
অনামিকা উত্তর দেয়, ‘তনুশ্রী, ফার্স্ট ইয়ারের। আমাদের দুজনকেই বাসা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ভালো গ্রেডের বলে আমি হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু তনু বিভিন্ন বন্ধুদের বাসায় কোনোভাবে ম্যানেজ করে থাকছে।’ চলবে























