রহিমা আফরোজ মুন্নী
রহিমা আফরোজ মুন্নীর নভেলা ‘ধুরন্ধর’
পর্ব-৬
প্রকাশিত : জুলাই ০১, ২০২৬
১১.
ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে নিধি একা বসে আছে। ইদানীং বিভাসের সাথে খানিকটা সমঝোতা বাড়িয়ে চলতে গিয়েও বিভাসের তরফে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই বুঝতে পেরে নিধি অসহায় বোধ করছে। ইভান ছাড়া তার কোনো প্রিয়জনও নেই যে, এইসব শেয়ার করবে। আর ইভান যদি দুঃখিত হবার কারণ জানে তাহলে উল্টো তাকেই শোনাবে, কেন সে আশা করে বসে আছে বিভাসের পরিবর্তনের। অথচ কারণটা যে ইভান স্বয়ং, সেটাও বলবার জো নেই।
কিন্তু, ‘আমাকেও তো বাঁচতে হবে নাকি’ ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে নিধি। পেছন থেকে ইভান এসে চমকে দিয়ে বলে বসে, ‘কী বলছ নি?’
নিধি ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘দেখো, সবার নাম নিয়ে এইসব ফাজলামি আমার বেলায় বন্ধ করো।’
ইভান কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, ‘ওকে ম্যাডাম, আপনি এমনিতেই সংক্ষিপ্ত।’
টেবিলে রাখা ইভানের ফোন বেজে ওঠে, বাংলায় সেইভ করা নাম ভেসে ওঠে, প্রিয় অতি। মৃদু স্বরে পড়ে নিধি। হচকচিয়ে যায় ইভান। মাত্রই নামকরণ নিয়ে নিধির অসন্তুষ্টি, আর তার পরপরই প্রিয়তির কল। আর সেটা ধরতেই হবে, নাহলে নিধি সন্দেহ করতে ছাড়বে না। প্রিয়তি সিনিয়র স্টুডেন্ট হিসেবে এক্সট্রা কারিকুলামের ক্লাসগুলো নেয়। সেই বিষয়েই আগ বাড়িয়ে কথা বলে ইভান, প্রিয়তিকে অন্য কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই।
প্রিয়তি ইভানকে সবার সামনে স্যার ডাকলেও ফোন কলে বা টেক্সটে ইভু বলে। সাথে কখনো আপনি কখনো তুমি, সব মিলিয়ে এমন গোলযোগ পাকায় যে, সামনাসামনি এইসব ভুলের লজ্জায় লাল নীল বেগুনী হরেক রঙে রাঙিয়ে তোলে নিজকেই। প্রথম বর্ষে পড়বার সময় থেকেই ক্লাসভর্তি স্টুডেন্টদের সামনে স্যারের চোখে নিজের ফটোজনিক চেহারার প্রশংসা শুনবার পর থেকেই তার দূর্বলতার শুরু। এত মনযোগ আর কোনো স্টুডেন্ট পায় না বলে তার প্রতি অন্যদের ঈর্ষা সে ভীষণ উপভোগ করে।
শেষবর্ষ হতে হতে স্যারের প্রেমে সে হাবুডুবু পুরোপুরি। পরস্পরকে ভালবাসার কথা বলা না হলেও প্রিয়তি টের পায়, ইভানের চোখে সে কেবল বন্ধুমাত্র নয়, প্রিয় অতি বা অতি প্রিয় না ডেকে কথা শুরুই করে না ইভান। প্রিয়তির পছন্দ বা অপছন্দের বিষয়গুলো নিয়েও সব সময় সজাগ। প্রিয়তি ভাবে, ভালবাসা না জন্মালে এমন তো হবার কথা নয়। বিশেষত ব্যাপারগুলো যখন ইভান সিক্রেট রাখে অন্যদের সামনে।
প্রিয়তির কল পাবার পর ইভানের অপ্রস্তুত ভাব চোখ এড়ায় না নিধির। তার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে চেয়ে নিজ থেকেই ইভান বলে, ‘এক্সট্রা কারিকুলামের ক্লাসে সবেই জয়েন করেছে মেয়েটা আমার রেফারেন্সে। ওর কিছু ছবি তুলে দিয়েছিলাম, সেসব বেশ ভালো হয়েছে আর একটা কনটেস্টে আমার তোলাগুলোই সিলেক্ট। তাই খুশিতে আট দু’গুণে ষোলোখানা হয়ে নতুন এই ক্যামেরাটা দিল ফী বাবদ।’
নিধি অবাক স্বরে বলল, ‘ছবি তুলেছ তুমি, কনটেস্ট জিতেছ ও। তুমি উল্টো তোমার ফী দেবার কথা যেভাবে অনামিকাকে দাও।’
আকাশ থেকে পড়ল ইভান, ‘অনামিকাকে টাকা দেই তা তুমি জানলে কি করে?’
নিধি বলল, ‘উত্তর দাও আগে আমি যা জিজ্ঞেশ করেছি।’
ইভান স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘প্রিয়তির ধারণা, সে সুন্দর না। কিন্তু সুন্দর আর ফটোজনিক যে আলাদা বিষয়, তা বুঝানোর ধারেকাছেও আমি যাইনি। ছবিগুলো দেখে তার মনে হয়েছে, সে অতি সুন্দর। তাতেই খুশি হয়ে ক্যামেরা দিয়েছে। আর শুধু ক্যামেরা নয়, আরও বেশি দেবার কথা। কারণ ছবিগুলো তুলেছি অমনই। তাছাড়া তার বাবার ম্যালা টাকা। তো, আমি কেন গিফট নেব না!’
নিধি হাসে, ‘আচ্ছা, তাই সে প্রিয় অতি!’
ইভান হতাশ স্বরে বলে, ‘কাম অন নি, আই হ্যাভ টু বি এ্যা প্রফেশনাল।’
নিধি অবাক হয়ে বলল, ‘ওকে মিথ্যে বলছ কেন তাহলে?’
ইভান নির্বিকার সুরে বলে, ‘নাহলে জ্বালাতো এসে।’
নিধি কথা কেড়ে বলল, ‘তুমি জ্বলো তাহলে?’
ইভানের চটজলদি উত্তর, ‘না।’
নিধি বলল, ‘তাহলে?’
ইভানের হাসিমুখে উত্তর, ‘তুমি জ্বলতে তাই।’
বলা শেষ করে আর কথা বাড়াবার সুযোগ না দিয়ে ক্যামেরার ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটা দেয় ইভান। নিধি গালি দেয়, ‘ফাক ইউ!’
১২.
রাস্তায় নেমে ইভান কল দেয় প্রিয়তিকে, ‘তোমাকে না বলেছি, আগে টেক্সট করে তারপর কল দেবে।’
প্রিয়তি অপ্রস্তুত স্বরে বলল, ‘আজ আমার জন্মদিন বলেই ভাবলাম নিয়ম পালনের নিয়ম থাকবে না আজ।’
দুজনেই নীরব কিছুক্ষণ। নীরবতা ভেঙে ইভান আদুরে স্বরে বলল, ‘জন্মদিনের এক ছটাক শুভেচ্ছা প্রিয়।’
উচ্ছ্বসিত হাসি দুজনেরই। ইভান বলল, ‘আসছি আমি, সময় গুণতে থাকো।’
সন্ধ্যা নামতেই প্রিয়তির অ্যাপার্টমেন্টের নিচ থেকে কল দেয় ইভান, ‘প্রিয়, এক থেকে পঁচিশ গুণবো, এর মধ্যে তোমাকে নিচে আসতে হবে।’
প্রিয়তি হাসে, ‘ওকে কমরেড।’
প্রিয়তি তৈরি ছিল আগে থেকেই। এক দৌড়ে লিফট পার হয়ে নামল নিচে, ‘কত পর্যন্ত গুনলে?’
ইভান বলল, ‘বিশ।’
প্রিয়তি জয়ের হাসি দিয়ে বলল, ‘ওহ, বড় বাঁচা বেঁচেছি আজ। কিন্তু ঠিক পঁচিশ কেন বলো তো?’
ইভান উত্তর দেয়, ‘আমি যখন যেই গার্লফ্রেণ্ডের কাছে যাই তখন তার বয়সের হিসাবে সময় ঠিক করি।’
দুজনেই হাসল। জাদুর মতো কায়দা করে ইভান একটা বক্স বের প্রিয়তির হাতে দিয়ে বলল, ‘প্রিয়র জন্য প্রিয়র প্রিয় জিনিস।’
অধৈর্য হাতে র্যাপিং পেপার খুলল প্রিয়তি। ঝলমল করে ওঠে একগাদা রঙিন চুড়ি। উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরে ওঠে প্রিয়তির। ইভান বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ প্রিয়। আমার ছোট সাইজের গিফটে এমন বড় হাসি দেবার জন্য।’
দুজনেই হাসে। ইভান প্রিয়তির গাল ছুঁয়ে আদর দিয়ে বলে, ‘যাই।’
প্রিয়তি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে লিফটের দিকে এগোয়। দরজা খুলতেই বাসাভর্তি লোক সারপ্রাইজ করে দিয়ে গাইতে থাকে, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।’
প্রিয়তি শক্ত করে চুড়ির বক্স শাড়ির আড়ালে এগিয়ে যায় টেবিলের কেকের দিকে, তার মুখে বিশ্ব জয়ের আনন্দ।
১৩.
ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় ইভান আর নিধি এলোমেলো হাঁটছে। গাছপালার আড়ালে গিয়ে নিধি সিগারেট ধরায়। এইটা সে নতুন শিখেছে উদ্বিগ্নতা দূর করতে। ইভান ক্যামেরা বের করে দূর থেকে কিছু স্ন্যাপ নেয় অগোচরে। পেছন থেকে রিনিঝিনি চুড়ির শব্দে ঘুরে তাকায়। প্রিয়তিকে দেখে হকচকিয়ে যায়। কিছু বলবার আগেই উচ্ছ্বসিত স্বর প্রিয়তির, ‘দেখো, কেমন সুন্দর তোমার চুড়িগুলো!’
টিপ আর শাড়িতে বিশেষ সাজ তার আজ। আড়চোখে নিধিকে আসতে দেখে ইশারায় থামাতে চায় ইভান। প্রিয়তি বুঝতে না পেরে বলল, ‘সত্যি দেখো।’
বলে চুড়ি পরা হাতগুলো নাচের ভঙ্গিতে দোলায়। পরিস্থিতি সামলাতে ইভান স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘ভালো দেখাচ্ছে প্রিয়। কিন্তু আজ তো ছবি তুলব না। আবহাওয়া দেখেছো? মন ভার না!’
নিধি কাছাকাছি চলে আসছে ততক্ষণে। বলল, ‘তুমি খালি ফ্রেমিং বুঝো, মন ভার না মন উজ্জ্বল এইসব বুঝো না। বেচারি কী সুন্দর সেজেছে, ছবি তুলে দাও।’
প্রিয়তি অপ্রস্তুত বোধ করে নিধির সামনে। ইভানের ইশারার মানেও বুঝে ততক্ষণে, আফসোস করে নিজের বোকামিতে। ভাবে, স্যার আর কখনো ছবি তুলে দেবে না, চুড়ি গিফট করবে না, লুকিয়ে ভালবাসবেও না। স্পষ্টতই তার চেহারায় একরাশ হতাশা।
ইভান বুঝে যায়, এইবার নিধির কাছে পার পাওয়া কঠিন। তবুও চেষ্টা করে, ‘আমি আবহাওয়ার মন ভালো না খারাপ তোমার চেয়ে বেশি বুঝিনি, আজ মোটেই ভালো ছবি তোলা সম্ভব না প্রিয়তি। তুমি অন্যদিন আসো আর আবহাওয়া অফিসে ফোন দিয়ে খবরাখবর নিয়েই আসবে কিন্তু।’
এই বলে নিজের কথায় নিজেই হাসল। প্রিয়তি ঘাড় নেয়ে সায় দিয়ে চলে যাবার ভঙ্গি করতেই নিধি ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ওকে থামাও ইভান, ছবি তুলে দাও। যাহোক বড়লোকের মেয়ের মন খারাপ করানো স্বাস্থ্যকর হবে না তোমার জন্য।’
অপ্রস্তুত ইভান হাত চাপা দেয় নিধির মুখে, ‘প্লীজ নি, বিশ্বাস করো, এমন কিছুই না।’
নিধি ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দেয়। বলে, ‘সীন ক্রিয়েট করো না ইভান। ডিপার্টমেন্টের সামনে তোমাকে পিটাই আমি, তা নিশ্চয়ই চাও না!’
ইভান হাতজোড় করে বলল, ‘আমাকে সুযোগ দাও একবার নি।’
উত্তর দেয় নিধি, ‘সুযোগ দিতে পারবে প্রিয়তি। ওর বাবার ম্যালা টাকা তো, ম্যালা সুযোগ।’ এই বলে হনহন করে ডিপার্টমেন্টের ভেতর চলে যায় নিধি। চলবে























