লুনা আহমেদের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : নভেম্বর ১৮, ২০১৮

তোমাকে মনে পড়ে

তোমাকে মনে পড়ে
খুব বেশি মনে পড়ে
এত বেশি আর কাউকে মনে পড়ে না,

এত এত মানুষ
এত এত রঙ
হৃদয় কারো ছবি আঁকতে পারে না।

শুধু তোমাকেই কেন!
কেন তোমাকেই?
এমনটা কি তোমার বেলায়ও হয়?

নাকি পাড়ভাঙা নদীর মতো আমারই
আমার একারই ভাঙে সমস্ত হৃদয়?

আষাঢ়ের থৈথৈ নদী— জলে-জলে পূর্ণগর্ভ যার
তার বুকও খালি-খালি থাকে যখন না আসে জোয়ার।

ঢেউ হয়ে আসলে প্রিয় বুকের গভীরে
কেন ফুল হয়ে ভাসলে না মনের কিনারে?

আমাদের অন্দরমহল

অনেকদিন দেখা হয় না
অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর হঠাৎ দেখা হয়
কথা হয়
বলা হয়, কে কেমন আছি।

তারপর কুশল বিনিময় করতে করতে
চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে
ভুলে যাওয়া হয়
ভুলে ছিলাম
একে অপরকে।

কত সহজে চোখের দিকে তাকানো হয়
হাসা হয়
বলা হয় বেশ চলছে দিনকাল।

বিস্তারিত আলাপ চলে
চা অথবা কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়ার ফাঁকে
তোমার কেমন, আমার কেমন যাচ্ছে
অফিস, ব্যবসা, সংসার, ছেলেমেয়ে, শরীর।

এভাবে কয়েক ঘণ্টা,
কয়েক মিনিট
কয়েক সেকেন্ড

তারপর ফেরত আসা
পুরনো পথের দিকে
বাড়ানো হয় ক্লান্ত দুটি পা
একটু হাসি হাসি চেহারা নিয়ে জানানো হয় বিদায়।

এতকিছু অথবা কিছুই ঘটেনি
অথবা ঘটেছে,
বলা হয়েছে অথবা বলা হয়নি
হাসা হয়েছে অথবা হয়নি
এসবের ফাঁকে ফাঁকে একবার হলেও বলা যেত
অথবা বহুবার বলা যেত, মন ভালো নেই, মন ভালো ছিল না, মন ভালো থাকে না।

বস্তুত, আমি কিংবা তুমি
আমরা কেউই শরীর ব্যতীত মনের খবর রাখি না।

নামহীন

নামহীন—
তোমাকে লিখতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি সব মুখস্থ বর্ণ,
স্মৃতি থেকে তুলে এনে এক টুকরো মাটি
হৃদয়জমিনে লিখতে বসেছি কবিতা যাতে জন্ম নেবে, তুমি নামক প্রেম কিংবা অসুখ।

তোমাকে মনে পড়ে, কী ভীষণ রকম মনে পড়ে
অথচ, ভুলে থাকার সব নামতা মুখস্থ, ঠোঁটস্থ করেছিলাম একদিন,
তোমাকে ভুলবার সবগুলো কলাকৌশল রপ্ত করা শেষে বুঝে গেলাম
কত বিচ্ছিরি ভাবে মিশে আছো।

নামহীন, তুমি মিছে আছ আমার নিঃশ্বাস, চোখ কিংবা অশ্রুতে
তাহলে কতটুকু চলে গেলে? কতটুকু যেতে পেরেছো?
যেতেই যখন হবে, পুরোটা গেলে না কেন!

মাঝেমাঝে ভুলে যাই, মাঝেমাঝে ভুলে থাকি
তারপর হঠাৎ মনে হয়, বেশ আছি তুমিহীন
এভাবেই চলুক কিন্তু না কোত্থেকে উড়ে এসে
আবারও সেই পুরনো তুমি— নতুন করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরো।

এই যে এতটা অসহনীয় প্রেম! বেদনার্ত অনুভব
দিয়ে গেছ, অনন্তকাল বয়ে বেড়াচ্ছি আমি
কিছু কি আমিও তোমাকে পেরেছিলাম দিতে?
পেরেছি কি একটুও স্মৃতি হয়ে হৃদয়ে বয়ে বেড়াতে!

প্রিয়তমা

শব্দের ছলে বর্ণনা করি প্রেম
যতটুকু ধরতে পারি কলমে কিংবা শব্দে—
লিখে ফেলি সফেদ কাগজের স্ফীত বুকে,

শব্দ দিয়ে তোমাকে
কিংবা প্রেম, কী করে লিখি বলো তো! কতটুকু লেখা যায়?
কী করে বুঝাই লিখে— ঠোঁটের ওই মর্মস্পর্শী ছোঁয়া
কিভাবে লিখে রাখি চিবুকের তিল অথবা তোমার খুনি চোখ! চোখের কাজল...

চাহনি জুড়ে যে স্নিগ্ধ পবিত্রতা, যে সুরভি পাই হাসিতে
কাগজ কিংবা কলম— জ্বলন্ত শিখার মতো ততটা উজ্জ্বল হয়ে ফোটাতে পারে না।

প্রেমিক মন যতটা স্বর্গ খোঁজে প্রেমিকার নাভিকূপে
কতটা দহনে পোড়ে তার অশান্ত হৃদয়— কলম জানে না তা।

প্রিয়, কখনোই কবিতার নামে লিখতে পারিনি প্রেম
বোঝাতে পারিনি মন, বর্ণনায় আঁকতে পারিনি তোমায়।

তবে কি আমাকে অথবা প্রেমকে অস্বীকার করবে?
মেনে নেবে এইসব অলিখিত পাণ্ডুলিপি যা কবিতার নামে ব্যাকুলতা লেখে!

চোখের ভাজে লিখে রাখি, লিখে রাখি বুকের গভীরে
তবু অস্পষ্ট লেখাগুলি, ভাষাগুলি কখনো ছুঁতে পারবে না তোমায়।

প্রিয়তমা,
আমাকে কবি বলো না
যতদিন না প্রেমিক হতে পারি, ততদিন কবি হতে চাই না।

ভালো থেকো

‘ভালো থেকো’
এই কথাটুকু বলে চলে যাও শেষ রেখা পার হয়ে
আর যে ফিরেও তাকাও না,

সব ভালোবাসার বিনিময়ে
সব চাওয়া-পাওয়ার বিনিময়ে
সব ভালো থাকা ভালো রাখার মিথ্যে হাজারও সব সাজানো গল্পের শেষে
এই দুটো শব্দ জুড়ে দিয়ে
বলতে চাচ্ছ, চির বিদায়।

যখন যেতেই হবে
যখন যেতেই হয়
সবাই-ই তো যাবে
যেতেই নাকি হয়!
তবে না বললেই নয়?

কেন বলো তবে?
কথাটুকু শুনে
আমারই বা কীই এমন হবে?

যা হবার তাতো হয়ে গেছে
যে যাবার সেতো চলে যাবে
ব্যথা! তাকে তো বুকেই দিয়েছি বাসা
বুকেই সে করে এখন বাস,
তোমার ওই কথাটুকুকে আমি কোথায় বসতে দেই বলো
হৃদয় ছাড়া!
আকাশের মতো সুবিশাল বুক আমার— যা উন্মুক্ত করেছিলাম একদিন তোমার জন্য
সেতো খালি নেই!

তোমার বিদায়ে
আমার কিছুই দেবার নেই
তাই বলিকি শোনো তবে প্রিয়—
তোমার কথাটুকুই তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম
আমার থেকে তুমি এতটুকুই নিও।