রাশেদ মেহেদীর প্রহসন গল্প ‘মহাজনের মহাকীর্তি’
প্রকাশিত : মার্চ ২১, ২০২৬
এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো চরিত্র কিংবা ঘটনার সঙ্গে গল্পের কোনো সম্পর্ক নাই।
সুখীনগরে বিষাক্ত সাপ, বিচ্ছু আর হিংস্র প্রাণীর চাষ শুরু করেছেন সবার প্রিয় মহাজন। তিরিশ বছর ধরে মহাজনগিরি করার অভিজ্ঞতায় তিনি বেশ ভালো করেই বুঝে গিয়েছিলেন, মানুষ দিয়ে তার স্বপ্নসাধ পূরণ হওয়ার নয়। অতএব এবার দরকার কিছু সাপ-বিচ্ছু, বিষাক্ত প্রাণী। দরকার মানুষের চেহারায় কিছু খেঁকশিয়াল, যারা মানুষের মাঝে গুপ্ত থেকে চারদিকে নোংরা বিষ্ঠা ছড়িয়ে যাবে, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে নাগরিকবৃন্দ দম বন্ধ করে বসে থাকবে। সেই সুযোগে হিংস্র শ্বাপদের তাণ্ডবে সব কিছু তছনছ হবে। বহু দিনের স্বপ্নসাধ পূরণ হবে মহানজন মহোদয়ের।
এমনিতেই মহাজন মশাই নিতান্তই সজ্জন মানুষ। মুখে জন্মগত মিষ্টি হাসি। তিনি কথা বললে গানের কোকিল নিজের সুর থামিয়ে তার সুরে মেলায় নিজের অজোন্তেই। তিন দশকে মহাজন বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন সুখীনগরের মহারাজার কৃপায়। তবু তিনি নিতান্তই দীনহীন মলিন পোশাকে জনসম্মুখে আসেন। তার স্বভাবে এক বিন্দু অহংকার নেই, আবার কারও সাতে-পাঁচেও নেই তিনি। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তেমন একটা যান না। কেউ সুখে থাকলেও তার কিছু যায়-আসে না, কেউ কাঁদলেও তিনি খোঁজ নেন না। তিনি শুধু নিজের ব্যবসায় সম্মোহিত করে রাখেন নাগরিকবৃন্দকে। যেন সবাই তার পকেট ভরিয়ে দেয় সবসময়। তার অসাধারণ সম্মোহন ক্ষমতায় মহারাজা নিজেও সম্মোহিত হয়ে আছেন বহু বছর ধরে। মহাজন রাজ্যের একমাত্র ব্যবসায়ী, যাকে তিরিশ বছর ধরে কোনো খাজনা দিতে হয় না।
তারপরও মহাজনের মন ভালো নেই। বয়স বাড়তে বাড়তে শরীরে বেশ টান লাগে। আগে পাগলা ঘোরার মতো ছুটতে পারতেন, এখন দশ কদম হাঁটলেই শরীর ঝিম মেরে আসে, পা আর চলে না। বয়সের ভারটা বেশি ভারী মনে হয়, যখন হাতের মাঝখানে শরীরের নিম্ন প্রদেশের ছোট মহাজন আর দপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে না, সেই চরম পুলকের অনুভূতিও হয় না। বয়স বাড়ার এই যখন অবস্থা, তখনও মহাজন শুধুই একজন ব্যবসার কারবারি, আর কিছুই নন, এটা হয়! একটা বার, শুধু এক বার যদি সিংহাসনের ওই চেয়রাটার হাতল ধরে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন, তাহলেও রাজ ক্ষমতার কিঞ্চিৎ স্বাদ লাভে ধন্য হতে পারতেন। উজির, লাঠিয়াল, কোতয়াল ও আধিকারিকদের সঙ্গে তো আর সরাসারি কোনো আলাপ চট করে করা যায় না। মাঝখানে সুধীজন কতজনকে বোঝান, ক্ষমতার ভাগ দিয়ে দুই দিনে ধন সম্পদে শীর্ষ স্থানে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখান, কেউ রাজি হয় না। তবে মহাজন মশাই হাল ছাড়েন না।
অবশেষে তার সাক্ষাৎ হলো সেই সাধু বাবার সঙ্গে। সাধু বাবার নিজস্ব একটি ইতিহাস আছে। তিনি একসময় সুখীনগরে চুরিবিদ্যার চর্চা করতেন। তার একটি দল ছিল, যারা গৃহস্তের গোলা থেকে রাজকোষ পর্যন্ত চুরিবিদ্যা প্রয়োগে মোটামুটি সিদ্ধহস্ত ছিল। বর্তমান মহারাজার স্বর্গীয় পিতৃদেব তখন সিংহাসনে। চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন—এই প্রবাদকে সত্য প্রমাণ করে একদিন সাধু বাবা দলবলসহ ধরা পড়লেন। তার গর্দান নেওয়ার আদেশ হলো। বাকিদের আজীবন কারাবাস। তবে চুরিবিদ্যার ‘জাহাজ’ সাধুবাধা আরও কিছু কেরামতি জানতেন। গর্দান নেওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এক রাজপ্রহরী খবর নিয়ে আসলো, রাজ্যের সীমান্তে প্রতিবেশী রাজার সৈন্য সমাবেশ হয়েছে, যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করে সব কিছু দখল করে নেবে। মহারাজা মুহূর্তে সব রাজকার্য স্থগিত রেখে দ্রুত সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সীমান্তে ছুটলেন। রাজপ্রহরী মুহূর্তে কারাগারের দরজা খুলে দিল, সাধু বাবা তার চোরবাহিনী নিয়ে পালিয়ে গেলেন। সেই রাজপ্রহরীকেও আর রাজ্যে আর দেখা গেল না।
মহারাজা সীমান্তে গিয়ে দেখলেন, কোথাও কোনো সৈন্যদল নেই। পাশের রাজ্যের কিছু রাজপ্রহরী সীমান্তে ঘোরাঘুরি করছে, এর বেশি কিছু নয়। সেই প্রহরীরাও জানালো, তাদের রাজ্যের মাহারাজা তো সুখীনগরের মহারাজার ওপর খুবই প্রসন্ন। তিনি কেন হঠাৎ আক্রমণ করতে আসবেন? এদিকে প্রতিবেশী রাজ্যের রাজার কাছে সীমান্তে সুখীনগজর রাজ্যের সৈন্যদল হঠাৎ জড়ো হওয়ার খবর গেল। রাজা খুব বিচলিত হলেন এবং রাজদূত পাঠালেন সুখীনগরে। রাজদূতের সামনে দারুণভাবে লজ্জিত হলেন সুখীনগরের মহারাজা। তিনি বেশ বুঝলেন, তার বয়স বেড়েছে। যে কারণে প্রহরীর কথা যাচাই-বাছাই না করেই সৈন্য নিয়ে ছুটে এসেছেন। এত বড় ভুলের আর কোনো পুনরাবৃত্তির সুযোগ নয়। অতএব রাজ দরবারে ফিরে এক সপ্তাহের মধ্যে অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পন্ন করলেন। পঁচিশ বছরের পুত্রের হাতে সিংহাসন বুঝিয়ে দিলেন। এত সব ডামাডোলের মধ্যে চোরের দলের কারাগার থেকে নিঃশব্দে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আর সরব হলো না।
সেই চোরদলের নেতাই আজকের সাধু বাবা। কারাগার থেকে পালিয়ে পাশের রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা জঙ্গলের ভেতর এক ডাকাতদলের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিলেন। দুই বছরের মাথায় ডাকাতদলের সঙ্গে আরেক ডাকাতদলের জোর লড়াই বেঁধে গেল। লড়াইতে দুই দলেরই ডজনখানেক লোকের প্রাণ গেল। আর এক ডজন ধরা পড়ল। সুখীনগরের চোর মহাশয় দুই দলের লড়াই শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সটকে পড়েছিলেন। দ্বিতীয় দফায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার পর এবার তিনি আর বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিলেন না। কিছু দিনের মধ্যেই সুখীনগর সীমান্তের জঙ্গলে পুরোনো বটগাছের গোড়ায় এক সাধু বাবা উদয় হলেন। এতই নিখুঁত ছদ্মবেশ আর কণ্ঠের কারুকাজ, কেউ বুঝতেই পারল না কীভাবে চোর মহাশয় সাধু বাবা হলেন!
সেই সাধু বাবার সঙ্গে মহাজন মশাই নিজে গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন, আশীর্বাদ চাইলেন। সাধু বাবার অন্তর্দৃষ্টি প্রখর। বছরের পর বছর যে মহাজন রাজ্যের সাধু বাবাদের দুই পয়সার দাম দিতেন না, সুযোগ পেলেই ভণ্ড বলে ভৎর্সনা করতেন, তিনি আজ আশীর্বাদ নিতে চলে এসেছেন স্বয়ং, ব্যাপারটার ভেতরে নিশ্চয়ই একটা ‘কিন্তু’ আছে। সেই কিন্তুটাই বুঝতে চেষ্টা করলেন সাধু বাবা। মহাজনের চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির চোখ রেখে বললেন, ‘আপনার মস্তিকে কিছু একটা প্রদাহের মতো ঘুরছে। সেটা প্রকাশ করুন। তাহলে যথার্থ আশীর্বাদ দিতে পারব। ব্যবসার চুক্তি আর সাধুর আশীর্বাদ, দুটোতেই হিসাব-নিকাষটা একই, ষোলো আনাকে আট আনায় দুই ভাগ করতে হয়। আপনি বিচক্ষণ মানুষ, আশা করি আমাকে আর দ্বিতীয় বাক্য ব্যয় করতে হবে না।’
মহাজন সত্যিই বিচক্ষণ, সাধু বাবার অন্তর্দৃষ্টিতে মুগ্ধ হলেন। তার মুখের সেই মধুমাখা মিষ্টি হাসি সাধু বাবার হৃদয়ে তোলাপাড় তুলল। ‘একবার মহাজন মহারাজা হলে সাধু বাবা তবে উজির!’ কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মহাজন সিংহাসনে বসবেন কেমনে? বর্তমান মহারাজাকে রাজ্য ছাড়া না করলে তো কোনো উপায়ই নেই। অতএব মহারাজাকে রাজ্যছাড়া করার উপায় খুঁজে বের করার গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন সাধু বাবা। মহাজন প্রায়ই আসেন সাধু বাবার দরবারে। উৎসুক নয়নে তাকিয়ে থাকেন। এক-দুই ঘণ্টা পার হলে ফিরে যান, পরে আবার আসেন। অবশেষে এক মাস ধ্যানের পর সাধু বাবা মোক্ষম উপায় বাতলে দিলেন। ‘শুধু মানুষের রাজ্য হলে মহারাজাকে সিংহাসনচ্যুত করা অসম্ভব। কারণ, রাজ্যের মানুষ মহারাজার শাসনে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে মহারাজার খামখেয়ালিতে যখন-তখন খাজনা বাড়ানো হলে তারা অখুশি হন, কিন্তু তেমন একটা উচ্চবাচ্য করে না;, মনে মনে অখুশি হলেও মেনে নেয়। লাঠিয়ালরা যখন খেয়ালখুশিমতো নিরীহ কৃষককে খাজনা না দেওয়ার কারণে ধরে এনে বেঁধে রাখে, তখনও অনেকে ঘরে বসে হায় হায় করলেও রাজপথে নামে না। কোন সংগীত শিল্পীর গান পছন্দ না হলে তাকে যখন প্রহরীরা তুলে নিয়ে কারাবন্দি করে, তখনও মানুষ অসন্তুষ্ট হয়, প্রতিবাদ করতে চায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় চুপচাপ থেকে যায়। অতএব, এই নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে অশান্ত করতে হলে সমাজে কিছু দুর্গন্ধ ছড়াতে হবে। আমাদের একান্ত অনুগত কিছু খেঁকশিয়ালকে মানুষের চেহারায় সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। তারা দিন-রাত সমাজে বিষ্ঠা ছড়াবে। সেই বিষ্ঠা থেকে সাপ-বিচ্ছু, আরও কিছু বিষাক্ত ইতর প্রাণীর জন্ম নেবে। যাদের বিষে সমাজে মানুষ ক্রমাগত দমবন্ধ হয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে, মহারাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হবে। আমাদের পোষা খেঁকশিয়ালের দল তখন সিংহাসন তছনছ করে মহারাজাকে রাজ্য ছাড়া করবে, এরপর আপনাকে সিংহাসনে বসিয়ে দেবে।’
মহাজন সব শুনে কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে বললেন, ‘কিন্তু অনুগত খেঁকশিয়ালের দল কিভাবে তৈরি হবে? খেঁকশিয়ালকে বশে আনার বিদ্যা কি আপনার জানা আছে?’
সাধু বাবা মুচকি হাসেন, ‘অবশ্যই জানা আছে, মহাজন।’
মহাজনের চোখ চকচক করে ওঠে। সাধু বাবা এবার সেই বিদ্যা জানিয়ে দেন। বলেন, ‘মহাজন, এটা খুবই সামান্য বিদ্যা। অর্থই সকল অনর্থের মূল, এই প্রবাদ বাক্য নিশ্চয়ই আপনার স্মরণ রয়েছে। অতএব সেই অর্থ প্রয়োগ করেই যতসব অনর্থ, অনাসৃষ্টি করতে হবে। আপনার অঢেল অর্থ রয়েছে। আপনি অর্থ দেবেন, আমি সবার মাঝে আমাদের অনুগত খেঁকশিয়াল তৈরি করে দেব, যারা বিষ্ঠা ছড়াতে দারুণ পারদর্শী হবে। আপনি অর্থ দিন, বাকি দায়িত্ব আমার।’
মহাজন খুব একটা আশ্বস্ত হলেন না। আবার ‘না’ বলতেও পারলেন না। ‘প্রিয় সাধু বাবা, কিছু মনে করবেন না। ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করুন। ব্যাপারটা আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।’
সাধু বাবা এবার গলাখাঁকারি দিয়ে একেবারে ঝেড়ে কাশেন। ‘মহাজন, আপনি জানেন এই জনপদের মানুষ অতিশয় সহজ সরল প্রকৃতির। কৃষক, কামার, কুমোর, জেলে, মাঝি, মুটে, মজুর— এরা সবাই দু’বেলা কোনো রকমে পেট পুজো করতে পারলেই সন্তুষ্ট। তাদের বিশেষ কিছু চাহিদাও নেই। অথচ এদের খাজনাতেই জোর বাজনা বাজে রাজমহলে, মোটা বেতন পান আধিকারিকরা। মহাজন, আপনি নিশ্চয় বোঝেন, অতি সরলতা প্রকৃত অর্থে মূর্খতার লক্ষণ। এ কারণে ওদের সরলতার সুযোগ নিয়েই সস্তার মাল বেশি দামে বেচে আপনি হয়ে যান মহান মহাজন, আমি চোর; তবু সাধু বাবার সং সেজে দিব্যি আয়েশে জীবনযাপন করি।’
মহাজন মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। সাধু বাবার গলা এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে যায়, ‘মহাজন, আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন, রাজ কারবারে সবসময় নিয়ম-নীতি চলে না, মহানুভবও হওয়া যায় না। সুখীনগরের রাজপরিবারও মহানুভব নন। তারা ক্ষমতার জন্য প্রজা নয়, আধিকারিক আর প্রহরীদের মনোরঞ্জনে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফি বছর খাজনা বাড়িয়ে রাজপ্রাসাদের জৌলুস বাড়াতে অধিক ব্যয় করেন। আধিকারিকদের বশে রাখার জন্য হুটহাট বেতন বাড়িয়ে দেন, বাজারে জিনসিপত্রের দামে আগুন লাগে। সেই কৃষক, মুটে-মজুরই তখন আধপেটা খেয়ে থাকে, আর রাজাবাহাদুর পারিষদ নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে যান। আধিকারিকরা বেতন বাড়লেই অবকাশ যাপনে অধিক মনযোগী হয়ে যান। অথচ কৃষকের ভোর হয় মাঠেই, জেলের দিবানিশি কাটে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে।’
মহাজনের চোখ-মুখ হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে ওঠে, ‘সাধু বাবা, আপনি তো রাজনৈতিক দর্শন তত্তে¡ অতি প্রাজ্ঞ। আপনি কেন বটতলায়? আপনার তো সিংহাসনের পাশের চেয়ারে বসা উচিত ছিল আরও আগেই।’
সাধু বাবা ছোট্ট একটা কাশি দেন, ‘মহাজন, সেই ব্যবস্থাই তো করতে যাচ্ছি। এবার শুনুন আসল কথা। সুখীনগরের মানুষকে বোকা বানানো খুব সহজ। আমাকে সবাই সাধু বাবা হিসেবে মান্য করে, এটাই তার বড় প্রমাণ। অতএব এদের বোকা বানাতে হবে। আর সেই কাজটিইর করবে খেঁকশিয়ালের দল। নিজেরা বিষ্ঠা ছড়াবে আর বদনাম দেবে রাজার। তারা বলবে, অতিশয় দুর্নীতির কারণেই রাজকর্মীরা নগরে পরিচ্ছন্নতা কাজে দারুণ অবহেলা করছে। ফলে, দুর্গন্ধে টেকা দায় হচ্ছে।’
মহাজনের চেহারায় বেশ উত্তেজনা দেখা যায়। ‘সব বুঝলাম, কিন্তু খেঁকশিয়াল জোগাড় হবে কীভাবে? তাও আবার মানুষের চেহারায় খেঁকশিয়াল?’
সাধু বাবা চোখ বুজে কয়েক সেকেন্ড বিড়বিড় করেন। কয়েক বার মাথা ঝাঁকান। তারপর তার চোখ-মুখ কি খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তিনি আবার মুখ খোলেন, ‘মহাজন, আগেই বলেছি অর্থই অনর্থের মূল। অতএব এই অর্থ দিয়েই সমাজের কতিপয় মানুষের মস্তিস্ক আমরা খেঁকশিয়ালে বদলে দেব। তাদেরকে সমাজের গুপ্ত অবস্থানে থেকে নিরাপদে বিষ্ঠা ছড়ানোর যথার্থ প্রশিক্ষণ দেব। মনে রাখবেন, কৃষক, জেলে, মুটে, মজুর— খেটে খাওয়া মানুষকে এ কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, তাদের ভেতর লালসার লেশমাত্র নেই। কিন্তু এই যে কতিপয় দালাল আছে, যারা গ্রামে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে শস্য কিনে নগরে বেশি দামে বেচে, সেই দালালদের একটা অংশ খেঁকশিয়াল হবে। ওই যে শিল্পী-সুধীজনের মধ্যে অনেকে আছে, যাদের লোভের জিহ্বাা সর্বদা লকলক করে, তাদের অর্থ দিয়ে বশে এনে খেঁকশিয়ালে পরিণত করা যায় খুব সহজেই। এদের কেনাও যায় কম দামে। কিন্তু আমাদের রাজ আধিকারিক আর প্রহরীদের মধ্যে কিছু খেঁকশিয়াল দরকার। সেটা জোগাড় করতে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে; এরা হবে উচ্চ স্তরের খেঁকশিয়াল এবং এদের বিষ্ঠার গন্ধও খুব তীব্র হবে। তখনই ঘটানো হবে চূড়ান্ত অঘটন। আশা করি বুঝতে পেরেছেন মহাজন।’
সাধু বাবার ‘খেঁকশিয়াল তত্ত্ব’ খুব বেশি মনে ধরল না মহাজনের। কিন্তু এর বাইরে এই মুহূর্তে তেমন কোনো বিকল্পও খুঁজে পেলেন না। অতএব সাধু বাবার কথায় কিছু অর্থ ব্যয় করতেই হবে। বয়স বাড়ছে, সিংহাসনের স্বাদ একবার পেতে হলে অর্থের প্রতি মায়া কাটাতেই হবে। অতএব মহাজন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। ‘সাধু বাবা, অর্থ কোনো সমস্যা না। আপনি আপনার প্রয়োজনমতো অর্থ পেয়ে যাবেন। অতএব মানুষের চেহরায় অনুগত খেঁকশিয়াল তৈরিতে দ্রুত মনোনিবেশ করুন।’
দিন যায়, মাস যায়। এক বর্ষা থেকে আরেক বর্ষা আসে। মানুষ দু’একটা খেঁকশিয়ালের হুক্কা হুয়া শুনতে থাকে। বছর দুয়েক পর খেঁকশিয়ালের ডাক বেশ ঘন হয়। কিন্তু বিষ্ঠার দুর্গন্ধ তখনও ছড়ায় না। মহাজন চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে কি এতগুলো অর্থ জলে যাচ্ছে! তিনি সাধু বাবার কাছে যান। ‘সাধু বাবা, কী হচ্ছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কোথায় দুর্গন্ধ? কোথায় প্রজা বিদ্রোহ? কোনো কিছুরই তো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’
সাধু বাবা চোখ বুজে বিড়বিড় করেন। দু’হাতে মুখ ঢাকেন। তারপর হাত সরিয়ে সোজা মহাজনের চোখের দিকে তাকান, ‘মহাজন, এত বিচলিত হলে কি চলে? আপনি কি দেখেন নাই, সুগন্ধি ফলের বৃক্ষ কি শৈশবে, কৈশোরে ফল দেয়? তার যৌবনপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অতএব আপনি বুঝদার মানুষ, ধৈর্য ধরুন।’
মহাজন কিছুটা বিরক্তি মুখে নিয়ে ফিরে যান। তিনি এই সাধু বাবার ওপর নির্ভর করবেন কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে থাকেন। এখনই অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করবেন, নাকি নিজেই বিষ্ঠা ছড়ানোর লোক নিয়োগের জন্য দরপত্র আহবান করবেন, ভাবতে থাকেন। তার সেই ভাবনা আরও ছয় মাস লম্বা হয়, শেষ হয় না।
অবশেষে মহাজনের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। সেবার বর্ষায় জোর বন্যা হলো। ফসলের মাঠ ভেসে গেল। দিঘির মাছ, নদীর মাছ সব একাকার হয়ে কোন দূর জলাশয়ে চলে গেল! ঘড়বাড়ি সব জঞ্জালের স্ত‚প হয়ে ভাসতে লাগল। কৃষক, মুটে, মজুরদের অনেকে ডুবে মরলও। বন্যা শেষ হলে শুধুই হাহাকার। সুখীনগরের মহারাজা রাজকোষ উন্মুক্ত করে ত্রাণ সহায়তা দিতে লাগলেন। ঠিই সেই সময় গ্রামে-নগরে, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল বিষ্ঠার তীব্র দুর্গন্ধ। প্রথমে সবাই ভাবল, বন্যারে জল টেনে যাওয়ার পর পচা আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিন্তু যখন এক মাস পার হয়ে দ্বিতীয় মাসেও সেই দুর্গন্ধ বন্ধ হলো না, তখন সুখীনগরের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলো। এই মুহূর্তে দুর্গন্ধ দূর করার দাবিতে প্রজা বিদ্রোহ শুরু হলো রাজ্যের সর্বত্র। মহারাজা প্রজাদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু দুর্গন্ধের মাত্রা এত বেশি তীব্র হতে লাগল, সেখানে মহারাজার অনুরোধ নিতান্তই প্রহসন মনে হলো। এরপর লাঠিয়ালের দল নামল। ঠেলেঠুলে প্রজাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা। ঠিক সেই সময় সাপ-বিচ্ছুসহ কিছু হিংস্র প্রাণীর আনাগোনা দেখা গেল পাড়ায়-মহল্লায়। এখানে-সেখানে বিষে নীল হয়ে মানুষ মরে পড়ে থাকতে লাগল। একদিকে তীব্র দুর্গন্ধ, আরেকদিকে নীল বিষে মৃত্যু, এবার প্রজাসকল আর কিছুই মানল না। তারা রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করল। সেই সুযোগে খেঁকশিয়ালের দল ঢুকে পড়ল রাজপ্রাসাদে। একসঙ্গে হুক্কা হুয়া শব্দে মাতিয়ে দিল প্রাসাদের প্রতিটি ইট। তীব্র চিৎকারে রাজদরবারে সবার প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। অগত্যা মহারাজা, তার পরিবারের সব সদস্য, উজির, আধিকারিক প্রধান, কোতওয়াল প্রধান, প্রহরী প্রধান— সবাই গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে গেলেন রাজ্য ছেড়ে।
মহাজন তার সাধের সিংহাসনে বসেছেন। পাশে উজিরের বেশে বটতলার সাধু বাবা। চৌর্যবৃত্তি থেকে উজিরে আলা— আহা, কী মহান অর্জন। কিংবদন্তির পাতায় এবার সাধু বাবার নাম লেখা ঠেকায় কে! সাধু বাবা ভাবলেন, এবার তাকে নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনার জন্য একজন যথার্থ কল্পনাশক্তি সম্পন্ন লেখক ভাড়া করতে হবে। সেখানে তাকে নিয়ে আবেগঘন বর্ণনা থাকবে। জঙ্গলে জঙ্গলে, পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে তার সাধনা আর সাধু হওয়ার বিস্তৃত কাহিনি রচনা করা হবে। গল্প যত কাল্পনিক হয়, তত বেশি রোমহর্ষক হয়। অতএব কল্পনার রং খুব বেশি মেশাতে হবে। তারপর একদিন মহারাজার সিংহাসনে সাধু বাবা নিজেও বসবেন।
সাধু বাবার ভাবনায় ছেদ পড়ে মহাজনের কণ্ঠে, ‘সাধু বাবা, সিংহাসন তো অধিকার করলাম। কিন্তু রাজ্যে তো শান্তি নাই। প্রধান আধিকারিক খবর দিলেন, রাজ্যে ব্যাপক মাত্রার দুর্ভিক্ষ চলছে। রাজ বিত্রোহের সময় খেঁকশিয়ালের দল রাজকোষ লুট করে চলে গেছে। এখন তো নতুন করে প্রজা বিদ্রোহ হবে। কিছু একটা ভাবুন সাধু বাবা।’
সাধু বাবা কোনো জবাব দেন না। চোখ বুজে মাথা নিচু করে ভাবতে বসেন। মহাজন গালে হাত দিয়ে বসে থাকেন। বাইরে থেকে প্রজাদের শোরগোল ভেসে আসছে। তার ভয় হয়, আবার তাকেও পালাতে হবে না তো আগের মহারাজার মতো? তার কপাল ঘামতে থাকতে। শরীর খুব বেশি দুর্বল লাগে। তিনি উঠে দাঁড়ান, পায়চারি করেন। সাধু বাবার ধ্যান শেষ হয় না। এবার মহাজন ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘এই ভণ্ড সাধু, আপনার ধ্যানের ভণ্ডামি রাখেন। এবার বাঁচার উপায় বলুন। না হলে প্রজাদের সামনে আমি সব সত্য প্রকাশ করে দেব।’
সাধু বাবার ধ্যান চট করে ভেয়ে যায়, ‘মাননীয় মহারাজা, প্রিয় মহাজন, আপনি বিচলিত হবেন না। আমার মাথায় একটা উপায় এসেছে। আমি বর্ণনা করি। এরপর আপনি ভাবুন, সম্মতি দেবেন কি না।’
মহাজন ধপ করে সিংহাসনে বসে পড়েন, ‘সাধু বাবা, ভূমিকা না করে চট করে উপায় বলুন।’
সাধু বাবা এবার উঠে দাঁড়িয়ে মহানজকে কুর্নিশ করেন। তারপর বলতে শুরু করেন, ‘মহাজন, মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। কিছুটা কঠিন সিদ্ধান্ত। তবু বাঁচার জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় নাই। আপনি ভেবে দেখুন, আপনাকে-আমাকে রাজক্ষমতায় সুখীনগরের মানুষেরা আনেনি। এনেছে এক দল খেঁকশিয়াল, সাপ-বিচ্ছু আর কিছু বিষাক্ত প্রাণী। অতএব, আমাদের ক্ষমতায় থাকতে হলে তাদের ওপরই নির্ভর করতে হবে। আপনি আরও ভাবুন এবং নিশ্চয়ই মানবেন যে, মানুষের রাজ্যে রাজত্ব করার বড় সমস্যা মানবকুলের বিচার ও বিবেচনাবোধের ক্ষমতা। এই মানুষ একদিন ঠিকই বুঝে যাবে, আমাদের দুর্গন্ধ ছড়ানোর দুরভিসন্ধি। অতএব, মানুষের ওপর ভরসা করে ক্ষমতা খুব বেশি দীর্ঘায়িত করা যাবে না। এই দুর্ভিক্ষের বোধ আগের মহারাজার প্রতি তাদেরকে সহানুভূতিশীল করে তুলতে পারে। অতএব আসুন, এখনই সুযোগ, সমাজ থেকে সব মানুষ নির্মূল করে দিই। আমাদের দরকার ক্ষমতা, রাজত্ব। যে ক্ষমতা আমাদের মানুষ দেয়নি, অনুগত খেঁকশিয়াল আর সাপ-বিচ্ছুর করুণায় যে রাজ্যের সিংহাসন আজ আমাদের; সেই সুখীনগর তবে ইতর প্রাণীদেরই জনপদ হোক।’
মহাজনের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘ঠিক বলেছেন সাধু বাবা। একসময় আমরা সুখীরগরকে ‘আদর্শ ইতর প্রাণীর’ চিড়িয়াখানা ঘোষণা করব। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে সুখীনগরে আসবে বিশ্বের বিস্ময়কর ইতর প্রাণী দেখতে। রাজকোষে অর্থেরও আর অভাব হবে না !’























