করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

শেষ জাহাজের আদমেরা: সমুদ্রের বুকে একখণ্ড নরক

রহমান মুফিজ

প্রকাশিত : জুন ০২, ২০২০

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে লা আমিস্টাড নামের দাস বহনকারী আমেরিকান এক জাহাজের দাসবিদ্রোহ এবং তার পরবর্তী ঘটনা নিয়ে গত শতকের শেষদিকে স্টিফেন স্পিলবার্গ বানিয়েছিলেন তার বিখ্যাত ছবি `আমিস্টাড`। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ ট্রাইবদের অপহরণ করে আমেরিকার বিভিন্ন বন্দরে দাস হিশেবে বিক্রি করতো জাহাজটি। জাহাজে কী অবর্ণনীয় ও বর্বরোচিত আচরণ করা হতো বন্দিদের সঙ্গে, মেরে-কেটে কীভাবে তাদের দমিয়ে রাখা হতো, পান থেকে চুন খসলেই চাবুকের পর চাবুক চলতো— তার মর্মান্তিক চিত্র উঠে এসেছিল স্পিলবার্গের ছবিটিতে।

লা আমিস্টাডে ঘটে যাওয়া বিদ্রোহ, বন্দিহত্যা, এবং পরবর্তী ঘটনার দারুণ দলিল আমিস্টাড ছবিটি। সেইসঙ্গে তৎকালীন আমেরিকার ঘৃণ্য দাস ব্যবসার চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে এখানে। আমিস্টাডে বিদ্রোহের পর আবার বন্দিদেরই অপরাধী সাব্যস্ত করতে আদালতে তোলা হয়েছিল। বন্দিদের পক্ষে আদালতে এক তরুণ আইনজীবী লড়েছিলেন প্রাণপণ। ছবিটি যারা দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, বন্দিদের পক্ষে আইনজীবী আর্গু করতেন জজদের সঙ্গে। কিন্তু বন্দিদের ভাষা কেউ বুঝতেন না, বন্দিরাও বুঝতেন না আমেরিকানদের ভাষা। তা নিয়ে কী বিড়ম্বনা, কী হতাশাজনক পরিস্থিতি গোটা আদালতে!

মনে আছে, ঠিক সেই রকম একটা মুহূর্তে বন্দিদের নেতা, অভিনেতা জাইমোন হন্সো অনেক কষ্টে রপ্ত করা মাত্র তিনটি ইংরেজি শব্দ— `গিভ আস ফ্রি`; ভাঙা ভাঙা, কিন্তু অভাবনীয় তেজস্বী ভঙ্গিতে চিৎকার করে উচ্চারণ করছিলেন? মনে আছে, সে পুনঃপুন উচ্চারণ কীভাবে আর্তনাদের কোরাস হয়ে উঠেছিল আর পুরো বিচারকক্ষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল? জাইমোন হন্সোর চোখে তখন চিকচিক জল। সে চিৎকারের প্রতিধ্বনি, আর চিকচিক জল বুক বিদীর্ণ করেনি এমন কোনো দর্শক আছে নাকি? বিশ্বাস করি, নেই। সেই ছবি দেখার সময় মুহূর্মুহু চাপা আর্তনাদ আমার বুক ভেঙে কান্না হয়ে বের হয়েছে বারবার। জল ছলছল চোখে ভেসে উঠেছে জাহাজে বন্দিদের ওপর ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত সব দৃশ্য। সে অনুভূতি বর্ণনার ভাষা খুবই দুর্লভ। সে ভাষা আমার কাছে নেই।

অনেক দিন পর সেই একই অনুভূতির মুখোমুখি হয়েছি স্বকৃত নোমান এর উপন্যাস `শেষ জাহাজের আদমেরা` পড়তে গিয়ে। কথিত এই আধুনিক সভ্যতার আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা কী দুর্বহ লজ্জা, গ্লানি, বর্বরতা আর নিদারুণ অন্ধকারের এক জগৎ উন্মোচিত হয়েছে এ উপন্যাসে, তা রীতিমতো ভয়ংকর। মানুষের ধারণারও অতীত পৃথিবীর বিস্তীর্ণ সমুদ্রাঞ্চলে কেমন অবর্ণনীয় অসভ্যতা ঘটে চলেছে প্রতিদিন। এখনও যে মধ্যযুগীয় দাসব্যবসা দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে বর্তমান, তার নীরব সাক্ষী হয়তো সমুদ্র অঞ্চলগুলোই। যদিও স্বকৃত নোমান তার উপন্যাসে তাবৎ সমুদ্রের কাহিন বিধৃত করেননি। আমাদের নিঃশ্বাসের নিকটে বঙ্গোপসাগর আর আন্দামান সাগরের মতো ছোট্ট একটি জলখণ্ডের অন্ধকার বর্ণনা করেছেন মাত্র। তাতেই ঘোষিত হচ্ছে পৃথিবীর লজ্জা, মানুষের লজ্জা।

এই উপন্যাস যে ভূমির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছে তা আমাদের অদেখা এক নরক। তা আমাদের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রায় চারশো বছরের নির্মম অভিজ্ঞতার স্মারক। বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ সীমান্তে মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যু— হার্মাদদের লুটতরাজ এবং মানবপাচারের ঐতিহাসিক অন্ধকারের পরম্পরা এখনো বহন করে চলেছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট। তাদের ভয়াবহ তৎপরতার শিকার এই ভূখণ্ডের ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষেরা। সামান্য স্বচ্ছলতা আর উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষায়, কথিত স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে উন্মুখ এই দেশের বেকার যুবকদের যেমন টার্গেট করছে আদমপাচারকারীরা তেমনি উপকূল অঞ্চল থেকে মাঝে মাঝেই অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সমর্থ যুবকের। এছাড়া এই সিন্ডিকেটের সবচাইতে বড় শিকার উন্মূল, অসহায় রোহিঙ্গা নর-নারী। উপকূল থেকে ট্রলারবোঝাই করে এইসব আদমদের অবৈধপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার নাম করে কোথায় যে নিয়ে যায়, কার কাছে যে বিক্রি করে দেয় তার ইয়াত্তা নেই।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচারের রোমহষর্ক নানা ঘটনা উঠে এসেছিল দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে। সেই সময় মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আবিস্কৃত হয়েছিল অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহু গণকবর ও পাচারকারীদের ক্যাম্প। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে দিনের পর দিন ভাসতে থাকা নৌযানগুলোতে ঠাসা মানুষের হাড় জিরজিরে দেহ, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি দেখে কারো অনুমান করতে কষ্ট হয়নি কী সীমাহীন দুর্দশা, ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে তারা মরছিলেন। উদ্ধারকৃতদের বয়ান থেকে উঠে এসেছিল সমুদ্রপথে কী অমানবিক, নিষ্ঠুরতম অভিজ্ঞতার মুখে তারা পড়েছিলেন। কত সঙ্গীকে নিজের কোলে মরতে দেখেছেন তারা। কত সঙ্গী পাচারকারীদের হাতে খুন হয়েছেন। লেখক নিজেই মুখবন্ধে উচ্চারণ করেছেন `ষোল ও সতের শতকে হার্মাদদের মানবপাচারের সঙ্গে একুশ শতকের মানবপাচারের পার্থক্য কোথায়?`

`শেষ জাহাজের আদমেরা` উপন্যাসে কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান সেই প্রশ্নের সূতা ধরে যে আখ্যান তুলে এনেছেন, তার পরতে পরতে জীবন্ত হয়েছে ঐতিহাসিক সত্য ও বাস্তবতা। অভিবাসনপ্রত্যাশী সমুদ্রযাত্রীদের উপর ঘটে যাওয়া নারকীয় অভিজ্ঞতাকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এক সরল ভাষায়। এরপরও সে ভাষা আপনাকে স্তব্ধ করে দেবে। নির্মমতায় ঠাসা ঘটনা পরম্পরা কখনো কখনো আপনাকে অস্থির, দমবদ্ধ আর অসহ্য করে তুলবে। ছোট্ট ট্রলারে ইলিশফাইলের মতো মানুষকে ঠেসে রাখা, সামান্য ছু্ঁতোয় কোনো বন্দিকে ধরে খুন করে পেট কেটে দিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে মারা, নারী বন্দিদের উপর্যুপরি ধর্ষণ, অনাহারে মারা, খাদ্য আর তেল ফুরিয়ে গেলে বেমান সমুদ্রে ট্রলার রেখে পাচারকারীদের পালিয়ে যাওয়া, খাবার না পেয়ে মৃত সহযাত্রীর মাংস খাওয়া, তৃষ্ণা সইতে না পেরে সমুদ্রের লোনাজল পান করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া, ছোট্ট জাহাজে সীমিত খাবার নিয়ে মারামারি, খুনোখুনি, সেই বিভৎসতা থেকে বাঁচতে কারো কারো সমুদ্রে ঝাপ দেয়া আর থাইল্যান্ডের বনে পাচারকারীদের ক্যাম্পে হাজারে হাজার ক্ষুধার্ত হাড় জিরজিরে মানুষের আর্তনাদ— এমন দৃশ্যই ঠাসাঠাসি এ উপন্যাসে।

এরপরেও আপনি এই দৃশ্যাবলি থেকে চোখ ফেরাতে পারবেন না। কারণ যে যাত্রা আপনি শুরু করবেন সেটার শেষ দেখে ছাড়বেন। কারণ, এর মধ্যেই একেক চরিত্রের বিচিত্র সব গল্প, চমকপ্রদ জীবনাভিজ্ঞতার বয়ান আপনাকে লোভে ফেলে দেবে। আপনি প্রতিটি ভিন্নস্বাদের চরিত্রের পরিণতি জানতে চাইবেন! কী সুন্দর তাদের স্বপ্ন, অথচ কী নারকীয় তাদের বাস্তব! কী সুন্দর মানুষ আর তার বিপরীতে কী কুৎসিত ও পাষাণ আবার এই মানুষই! আপনি ভড়কে যেতে যেতেই পড়তে থাকবেন, জানতে থাকবেন— শেষতক কী ঘটেছিল শেষ জাহাজের আদমদের জীবনে।

উপন্যাসে বর্ণিত অমানবীয় দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে দাস বহনকারী জাহাজ আমিস্টাডের কথা মনে পড়তেই পারে পাঠকের। অথবা আমিস্টাড যারা দেখেননি তারা অবধারিতভাবে উপলব্ধি করবেন প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা বর্বর দাসপ্রথা, মানুষের ওপর চলা অকথ্য নির্মমতার ধারা বহনকারী এই সময়ের আদমব্যবসা বা নতুন মোড়কে চলা দাসব্যবসার ঘৃণ্য বাস্তবতাকে। বর্তমানে এ ব্যবসা এতটাই গোপন আর শক্তিশালী চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যে, এখানে অবস্থার শিকার কোনও আদমের চিৎকার— `গিভ আস ফ্রি` পৌঁছতেই পারে না পৃথিবীর কোনো আদালতে।

লেখক চারশো বছরের এই অন্ধকার ও নারকীয় পরম্পরাকে তুলে আনতে কী দারুণ কৌশলের দ্বারস্থ হয়েছেন সেটাও একটা চমৎকার বিষয়। সিতারাবানু নামের এক রূপক নারী চরিত্র দাঁড় করিয়েছেন তিনি। চারশো বছরের যন্ত্রণাদগ্ধ স্মৃতি নিয়ে ইশ্বরের চোখ দিয়ে তিনি দেখছেন সমুদ্রের সমস্ত বিভৎসতা। আর তারই চোখে দেখা ঘটনাকে আখ্যানে, বয়ানে তুলে আনছেন লেখক। সিতারাবানু চারশো বছর আগেও যেমন হার্মাদদের হাতে হারিয়েছিল তার স্বামী-পুত্রকে, তেমনি চারশো বছর পরেও একই ট্র্যাজেডি বুকে নিয়ে সমুদ্রতীরে এক বিপন্ন-বিষণ্ণ সন্ধ্যায় আর্তনাদের হাওয়া গায়ে মেখে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকে সে। এমন এক জাতিস্মর চরিত্রে ভর করে উপন্যাসের শুরু এবং শেষ হলেও প্রতিটি পরিচ্ছেদে কল্পনারহিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড়াবে পাঠক।

সমুদ্রের `শেষ জাহাজটির` নির্মমতা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করা বাবুর্চি আসগরে কথা বলি। যে মূলত ছিল জাহাজের খালাসি এবং পাচারকারীদের হাতে বন্দি। তার অনেক কষ্টে জমানো সঞ্চয় কুড়ি হাজার টাকা আমানত রেখেছিল উপন্যাসের প্রধানতম চরিত্র কমলের কাছে। বলেছিল, যদি কখনো এই নরক থেকে সে মুক্তি পায়, যেন নিঝুম দ্বীপে তার স্ত্রীর কাছে সেই টাকাটা দিয়ে আসে। ঘটনার নানা দুর্গম বাঁক পার হয়ে নরক অভিজ্ঞানের ঝুলি নিয়ে মুক্ত ও শান্ত কমল একদিন ঠিকই দুর্গম উপকূল নিঝুম দ্বীপে আসগরের বাড়িতে গিয়ে হাজির। দেখা হয় আসগরের স্ত্রীর সাথে। আমানতের কুড়ি হাজার টাকা তুলে দিয়ে কমল কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চায় আসগর বাবুর্চির স্ত্রীর নাম। মহিলা তখন মুখ নামিয়ে হারানো স্বামীর শোকে নাকি টাকা প্রাপ্তির আনন্দে— ঠিক বুঝা মুশকিল, নোনা অশ্রুতে সিক্ত চোখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে— `আমার নাম সিতারাবানু`।

এই হলো উপন্যাসের শেষ উচ্চারণ। এই হলো উপন্যাসটির চূড়ান্ত হাহাকার। এইখানে এসেই স্বকৃত জানান দিতে চাইছেন সিতারাবানু আর কেউ নন, সিতারাবানু আমাদের মাতা, মাতামহীরা। সিতারাবানু আমাদের দেশ, আমাদের ত্রস্ত উপকূল। শত বছরের সন্তানহারা জননীর কান্নাচাপা বুক, সন্তানের ফিরে আসার প্রতিক্ষায় আশার বুকে তিরতির প্রদীপ জ্বালিয়ে বেঁচে থাকা, টিকে থাকা মাটিগন্ধি মা!

কত বিচিত্র চরিত্রের যে সমাগম ঘটেছে এ উপন্যাসে, কত বিচিত্র ঘটনা, কত বিচিত্র বিভৎসতা— এতসব পেরেছেন কিভাবে স্বকৃত? উত্তর একটাই— ইতিহাস, বাস্তবতা, বাস্তব চরিত্রগুলো থেকে ছেনে নেয়া অভিজ্ঞান, জীবন পর্যবেক্ষণ, সর্বোপরি একটা কালপর্বকে সাহিত্যিক সত্য দিয়ে উৎকীর্ণ করার পবিত্র প্রচেষ্টাই স্বকৃত করে গেছেন গোটা যাত্রায়। আমাদের দিয়েছেন অসামান্য এ উপহার। স্বকৃত, আপনার হাতে কী উপহার তুলে দিতে পারি— ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ভালবাসা জানুন। আমার আর্দ্র হৃদয়ের উষ্ণতা গ্রহণ করুন। আর্দ্র হৃদয় আবার উষ্ণ হয় নাকি? হয়। যখন আর্দ্র হৃদয়ে ভালবাসা উৎপন্ন হয়, শ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়, তখন তা আর আর্দ্র থাকে না, উষ্ণ হয়ে ওঠে।

শেষ জাহাজের আদমেরা উপন্যাসটির প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদশিল্পী রাজিব রায়।

একুশে বইমেলা ২০১৮