করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৩১৩২৬ ৪৭৫৮৯৯ ৮৮০৩
বিশ্বব্যাপী ৯৮৭৫০১০৩ ৭০৯৩৬৭৫০ ২১১৬৪৩৮

শ্রেয়া চক্রবর্তীর উপন্যাস ‘বেহেস্ত’

পর্ব ১১

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৫, ২০২০

ক্রিস্তভ রোজ সন্ধ্যায় ড্রপ করে দিয়ে যায় বাসায়। কোনো কোনো রাতে সে থেকে যায়। রাতভর তার সাথে কথা বলি। বলি জুমেরানের কথা। ফ্রিতির কথা। কথা বলতে বলতে মনে হয়, জীবনের প্রতি এত মোহ যে আমার বাকি ছিল তা আমি জানতেই পারিনি। কোনোক্রমে মেয়েটাকে নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ভেবেছিলাম। এর মধ্যে ক্রিস্তভ যেন ফিরিয়ে নিয়ে এলো জীবনের হারিয়ে যাওয়া রং।

ক্রিস্তভের প্রতি আমার এই সহজ সমর্পণে আমি নিজেও বিস্মিত হতাম। জুমেরান হারিয়ে যাওয়ার পরও তার প্রেমের বলয়ে নিজেকে আবৃত রাখতাম আমি। কখনো সজ্ঞানে সে বলয়ের ভেতর অন্য কাউকে স্থান দেওয়ার কথা ভাবিওনি। কারণ আমার বিশ্বাস ছিল, জুমেরান ঠিক ফিরে আসবে একদিন। আমার সেই বিশ্বাস কি তবে ফিকে হয়ে গেছে অভ্যস্ত যাপনের ক্লীন্ন দাগ লেগে? একটি প্রেম কি পারে আরেকটি প্রেমের তাৎপর্যকে লঘু করে দিতে? আমি কি ক্রিস্তভকে ভালোবাসি? এমন সব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসত আমার মনে।

রাত যত গভীর হয় ক্রিস্তভ তত সঘন হতে থাকে আমার সাথে। সে যেন বেহেস্তের রাতের মতোই রহস্যময়, নিঝুম। সেই রাত এসে মেশে আমার অন্তরের আলো-আঁধারিতে। খেলা চলে রাতভর। ঘুম ভেঙে দেখি, ভোরের আলো এসে পড়েছে আমার ঘরে। আরেকটি নতুন দিন।

ছুটির দিনগুলিতে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে চলে যাই আমি, ক্রিস্তভ আর মিশ্মি। মিশ্মি বেলুন ওড়ায়, বালু নিয়ে খেলা করে। আমি আর ক্রিস্তভ দূরে বসে দেখি। দেখি সূর্যাস্তের আভা লেগে সমুদ্র ও আকাশ কেমন মোহনীয় হয়ে আছে। নীরবে আমার মাথা ছুঁয়ে যায় ক্রিস্তভের কাঁধে। এভাবেই দিনগুলি কাটতে থাকে কোনো এক অশ্রুত সঙ্গীতের ছন্দে।

ক্রিস্তভ বলে, আমি তোমাকে ভালোবাসি মারিয়া। আর তুমি?
আমি এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হাসি। কেবল হাসি।
ক্রিস্তভ বলে, আমি জানি তুমি জুমেরানকে এখনো ভালোবাসো।  তার প্রতি যদি তোমার ভালোবাসা মিথ্যে হতো তবে তুমি আমাকেই বা কেমন করে ভালোবাসতে!
তার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।
ক্রিস্তভ বলে, জুমেরানের মতো না হলেও একটু ভালোবেসো আমাকেও।
আমি নীরব থাকি, নিজের ভেতর সন্দিহান। তবু বুঝি, ক্রিস্তভে প্রতি আমার টান ক্রমশ প্রগাঢ় হচ্ছে ভেতর ভেতর।

এরই মধ্যে তিন-চারদিন বেহেস্তে প্রবল বৃষ্টি হয়। স্টোরে যেতে পারি না। ক্রিস্তভের সাথে দেখা হয় না। সে আসে না, কোনো যোগাযোগও করে না। ভেতর ভেতর অসম্ভব চঞ্চল হয়ে উঠি। প্রতিক্ষণ তার অপেক্ষা করি। একটি জীবনের কিছু সময়ের সঙ্গ লাভের অভ্যাসও কতখানি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তা বুঝতে পারি। ক্রিস্তভকে আমি ভালোবেসেছি। সে কোনো কিছু প্রত্যাশা না করেই আমার সাথে থেকেছে। আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই এ কথা তাকে জানানোর জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনে হয়, এরপর যখনই তাকে দেখবো তার বুকের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবো, ভালোবাসি... ভালোবাসি... ভালোবাসি...

বৃষ্টি যেদিন থামে সেদিন স্টোরে যাই। ফেরার সময় নির্দিষ্ট স্থানে ক্রিস্তভের অপেক্ষা করি। কিন্তু সে আসে না। এক জীবনের ব্যাকুলতা যেন আমার ফুরানোর নয়। ক্রিস্তভের বাড়ির ঠিকানা আমার জানা নেই। পরের দিন `রুবিয়ানা`য় গিয়ে তার খোঁজ করি। শুনি, কদিন হলো সে বারে আসছে না। বার থেকে তার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে রওনা হই। মনের ভেতর যেন গুমরে ওঠে কীসের এক কান্না। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চায় জল। এতদিন কেন সে আসেনি আমার কাছে, এ প্রশ্ন নিয়ে তার বুকে আছড়ে পড়তে ইচ্ছে হয়।

ক্রিস্তভের বাড়ির দরজা অবধি এসে বেল বাজাই। মাথার ভেতর তখন এক সমুদ্র অপেক্ষা, সেসব কোনোক্রমে সামলে দাঁড়িয়ে আছি, দরজা খুলে দাঁড়ায় এক অপূর্ব সুন্দরী। পরনে হাওয়ার মতো ফিনফিনে এক গাউন। দেখে মনে পড়ে যায়, এই তো নেচেছিল রুবিয়ানায়, আমারা! তাকে দেখে আমার এক সমুদ্র অপেক্ষার পৃথিবী যেন নিমেষে ওলট পালট হতে থাকে। আমারা আমাকে চিনতে পারে না।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ক্রিস্তভ আছে?
আমারা আমাকে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে চলে যায়। মনের ভেতর হাজার প্রশ্ন তখন ঝড় তুলছে, পায়ের নিচে পৃথিবী টলমল।
আমারা ফিরে এসে বলে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, ক্রিস্তভ আসছে।
আমারাকে জিজ্ঞেস করি, ক্রিস্তভ আপনার কে হয় জানতে পারি?
আমারা বলে, আমার ফিয়ন্সে।

আমারা ভেতরে চলে যেতেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। পাগলের মতো রাস্তা দিয়ে ছুটতে থাকি। আমার ভেতর আমার একমাত্র আশ্রয় তখন যাবতীয় রক্তক্ষরণ বুকে নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু আমি তো পড়ে যেতে পারি না। আমাকে তো ফিরতেই হবে, একমাত্র মিশ্মির কাছে। এ জীবন তবু এক আশ্চর্য মরীচিকা মনে হতে থাকে। আমি মারিয়া নই। ক্রিস্তভ বলে কারোর সাথে কোনোদিন আমার দেখা হয়নি। আর বেহেস্ত যেন কেবল এক স্বপ্ন...

আমি একটি স্বপ্ন থেকে একটি স্বপ্নভঙ্গের ভেতর দিয়ে আরেকটি স্বপ্নের কাছে ফিরবো বলে সমস্ত ঝড়বৃষ্টি তুফান উপেক্ষা করে দ্রুত পা চালাতে থাকি আর আমার ভেতর ভেঙে পড়তে থাকে একে একে সবকটি মাস্তুল... চলবে