করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৭৭৪৪৩ ১৫৪২২৭৪ ২৮০০১
বিশ্বব্যাপী ২৬৬১২৭৪৬৫ ২৩৯৭৫৭২২৫ ৫২৭০৯৪২

সবকিছু ভোঁতা করে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে

কবীর হুমায়ুন

প্রকাশিত : নভেম্বর ২০, ২০২১

মাথাও শূন্য হয়। বোধও শূন্য হয়। মানে কোনোকিছু আলুলায়িত করে না, এমন সময় আসে। এমন সময়ে তারে কিছু বলা যায় না। এমন সময়ে তারে কিছু বলারও থাকে না। বলতে চাওয়া কথাগুলো ডালপালা বিস্তার করে না। রঙের রেখায় বাড়তি বর্ণিল রূপশোভা প্রত্যক্ষ নয়।

ভোঁতা বলে একটি শব্দ আছে। কোনো কোনো অঞ্চলে এ শব্দটি ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। চোখ ভোঁতা হয়ে গেছে। অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। স্বপ্নগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। শেষ বাক্যে কেমন লয় পতন টের পাই। স্বপ্ন কীভাবে ভোঁতা হয়? হয় কি?

আমার একজন সুলতানা রাজিয়া ছিলেন। রূপ, গুণ, বুদ্ধি, ধৈর্য আর মেধায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। পুরো শৈশবটাই তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছি। সন্তানের মৃত্যু যে কোনো মায়ের জন্য দুর্বিষহ। আর পরপর যদি অনেকগুলো সন্তানের অপঘাত মৃত্যু কোনো মাকে সহ্য করতে হয়, তার বর্ণনা কীভাবে দেওয়া যায়?

যেকোনো শিশু গল্প শুনতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। আমিও চাইতাম। আমার সুলতানা রাজিয়া আমাকে গল্প বলে বলে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে যেতেন। স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যেতেন। সেই স্বপ্নগুলো পরবর্তী সময়ে এতটা প্রলম্বিত হয়, একবার ভাঙলে ফের ঘুমে ওই স্বপ্ন আবার জোড়া লেগে যেত। আমার সুলতানা রাজিয়ার কাছেই প্রথম শুনি ভোঁতা শব্দটি।

এখন বুঝি, তিনি আসলে প্রচলিত কোনো গল্প বলতেন না। বলতেন তার জীবনে ঘটে যাওয়া সুখ-দুঃখের কাহিনি। সেই বলায় এতটা মুন্সিয়ানা ছিল, গল্পের মতোই মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। তো তিনিও একসময় বলতেন, মন ভোঁতা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তার অনুভূতি সেসব গল্প বলায় আর উৎসাহ জোগায় না কিংবা তিনি যেভাবে আবেগের স্ফূরণ জাগিয়ে বলতে চান কথাগুলো তা আর পারছেন না। ভোঁতা হয়ে যাওয়া মন তারে আর সমান তালে জাগিয়ে তোলে না।

উত্তরাধুনিক দুনিয়ায় চোখ বলি, অনুভূতি বলি, মন বলি, স্বপ্ন বলি সবটাকে বিচিত্রভাবে ভোঁতা করে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। করপোরেট সভ্যতা, রাজনৈতিক ধূর্ততা এর পেছনের নিয়ামক শক্তি। মানুষকে যত বেশি অনুভূতিহীন ভোঁতা বানানো যায়, ততই লাভ। হেরেম সভ্যতায় কত মানুষকে যে ভোঁতা করে দেওয়া হতো তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু শেষ বিচারে কোনো সাম্রাজ্যই টেকে না।

সাম্রাজ্যের পতন হলেও নতুন সাম্রাজ্য আসে। হাজার বছর ধরে চলা নিষ্ঠুরতা রং-রূপ পাল্টিয়ে অব্যাহত আছে বলেই মনে করি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কতটা এগুলো সভ্যতা? টেলিভিশনের একটি বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, গ্রাম থেকে আসা দাদু তার নাতি-নাতনিদের দেখাবেন বলে বয়ামে করে জুনিপোকা নিয়ে এসেছেন। নগরপত্তন সংস্কৃতিতে এসব নিয়ে কারো আর ভাবনার সময় কই!

নির্মল পরিবেশ একটি শিশুর মন কতটা নির্মল করে তুলতে পারে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসত প্রকৃত অর্থেই পুরিয়ে গেছে। ফলে মানুষের স্বপ্নগুলো ম্যাচবাতির খুপরিতে খুপরিতে গলাকাটা মোরগের মতো তড়পায়। আর নিষ্ঠুরতারও সীমা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনের এই সীমারেখা টানাও কৌশলে তুলে দেওয়া হয়েছে। হয়েছে বলেই পেট্রলবোমায় জ্বলতে থাকা মানুষসুদ্ধ গাড়ির ছবি তোলে মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নির্বাহ। যেন এর চেয়ে স্বাভাবিক কোনো ঘটনা পৃথিবীতে নেই।

মানুষের মানবিকতা কতটা বিলোপ হলে, ভোঁতা হলে এমন দৃশ্যের ছবি তোলে। কোনো প্রতিবাদ নেই। অভিযোগ নেই। বিপদগ্রস্ত মানুষগুলোকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা নেই। দাউ দাউ জ্বলতে থাকা সময়কে প্রতিরোধ করার ঐক্য নেই। আহারে সময়, ভোঁতা সময়!

লেখক: কবি