খোয়াজ খিজির এবং উপন্যাসের বিষয়বস্তু
স্বকৃত নোমানপ্রকাশিত : মার্চ ২৫, ২০১৮
প্রাচীন মিশরীয় প্রণয়কাহিনি ইউসুফ-জোলেখার মতো সেমেটিক উপাখ্যান মোজেস ওরফে মুসা নবি ও খোয়াজ খিজিরের সাক্ষাৎপর্বটি কিন্তু উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে চমৎকার। সেই কবেকার ইউসুফ-জোলেখার প্রণয়কাহিনির অভিঘাত এই বাংলায় একদা বেশ ভালোভাবেই পড়েছিল। কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তো ‘ইউসুফ-জোলেখা’ নামে কাব্যই রচনা করে ফেললেন। শুধু কি শাহ সগীর? মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম, শাহ গরিবুল্লাহ, গোলাম সফাতুল্লাহ, সাদেক আলী, ফকির মোহাম্মদও ‘ইউসুফ-জোলেখা’ নাম দিয়ে কাব্য রচনা করেছিলেন। ইরানের মহাকবি ফেরদৌসী ও সুফিকবি জামীর মূল কাহিনি পল্লবিত করে ইউসুফ-জোলেখা নামে কাব্য রচনা করলেও তাদের কাব্যের সঙ্গে শাহ সগীরের কাব্যের তেমন কোনো মিল নেই। তবে ফেরদৌসীর কাব্যের রোমান্টিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শাহ সগীরের কাব্যের যথেষ্ট সামঞ্জস্য বিদ্যমান।
মুসা নবির প্রভাব এই বঙ্গভূমিতে খুব বেশি নেই। অর্থাৎ তিনি বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে নেই। কুরআনে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ একজন নবি হিসেবেই কেবল তিনি এদেশের মুসলমানদের কাছে নমস্য। অপরপক্ষে খোয়াজ খিজির সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে এসে স্থান করে নিয়েছেন বাঙালি মুসলমানের মননে, নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছেন বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানে। বাংলায় তার স্থান একেবারেই আলাদা। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায় তিনি হাজির থাকেন না, তার হাজিরা ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে। অর্থাৎ কেতাবি বিশ্বাসে নয়, তিনি আছেন লোকবিশ্বাসে। বঙ্গভূমির মিথে খোয়াজ খিজিরকে ‘পানির নবি’ বা ‘সমুদ্রের অধিকর্তা’ জ্ঞান করা হয়। একদা গৌড়ের মুসলমানরাও খোয়াজ খিজিরের সম্মানে উৎসব পালন করত, যাকে বলা হতো ‘বেড়া উৎসব’। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ সাড়ম্বরে পালন করতেন সেই উৎসব। কলাগাছ ও বাঁশের তৈরি নৌকায় কাগজের তৈরি ঘর ও মসজিদ নির্মাণ করে সেই নৌকা ভাগীরথীতে ভাসিয়ে দেয়া হতো। কদিন আগে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে গিয়ে বন্ধু প্রাবন্ধিক মামুন হাসান নির্ঝরের কাছ থেকে জানতে পারি, এই উৎসবটা নাকি এখনো পালিত হয়। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও নবাব সিরাজুদ্দৌলার উত্তরপুরুষরা বছরের নির্দিষ্ট একটা দিনে উৎসবটি পালন করে থাকেন।
শুধু মুর্শিদাবাদে নয়, মোগল আমলে ঢাকাতেও সরকারি উদ্যোগে ‘বেড়া উৎসব’ পালিত হতো। উৎসব উপলক্ষে বসত মেলা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূলেও একদা ‘বেড়া উৎসবের’ প্রচলন ছিল। সেসব উৎসবের একটা প্রধান বৈশিষ্ট ছিল, সব ধর্মের লোক মিলিত হতো সেখানে। সেই উৎসব ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সহায়ক। সময়ের বিবর্তনে, স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে জলপথের ব্যবহার কমে যাওয়ায়, সর্বোপরি সালাফি ইজমের বিস্তারের ফলে এই লোক উৎসবটি এখন আর পালিত হয় না। মোল্লা-মৌলবিরা এই উৎসবকে ‘কুসংস্কার’ হিসেবে ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মানুষকে এর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। ‘বেড়া উৎসব’ হয়তো এক ধরনের কুসংস্কার (যদিও আমি একে কুসংস্কার বলতে নারাজ, জোসেফ ক্যাম্পবলের ‘মিথের শক্তি’ বইটি পড়ার পর এই নারাজি আরো পোক্ত হয়েছে) তবে কোনো কোনো কুসংস্কারের অন্তরালে রয়েছে মাঙ্গলিকতা। যেমন সুন্দরবন অঞ্চলের বনবিবি। বনবিবিকে হিন্দুরা বলে বনদূর্গা। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে এই দেবি নমস্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সহায়ক হিসেবে এ ধরনের অসাম্প্রদায়িক লোকদেবতার প্রয়োজন আছে বৈকি। অন্তত এই সাম্প্রদায়িকার কালে তো আছেই।
বাংলাদেশের সমুদ্রবর্তী কোনো কোনো অঞ্চলে এখন ‘বেড়া উৎসব’ পালিত হলেও অত জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে হয় না। উৎসবটি না হলেও খোয়াজ খিজিরের দৌর্দণ্ড প্রতাপ কিন্তু এখনো সমুদ্র উপকূলের জনপদগুলোতে ভালোভাবেই আছে। নিরক্ষর মৎস্যজীবীদের ওপর এখনো তার প্রভাব আগের মতোই। তাদের কাছে বদর পিরের যেমন কদর, তেমনি কদর খোয়াজ খিজিরেরও। বদর পিরের মতো খোয়াজ খিজিরের কাহিনিও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের মুখে মুখে ফেরে। বহু বছর আগে ফেনীর সমুদ্রতীরবর্তী এক গ্রামে গিয়ে শুনেছিলাম একটি মিথ: ওই গ্রামের অধিবাসীদের পূর্বপুরুষরা নাকি দেখেছে এক ঝড়-তুফানের দিনে খোয়াজ খিজির সমুদ্রের পানির উপর দিয়ে হেঁটে এসে গ্রামবাসীকে ঝড়-তুফানের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তারা খোয়াজ খিজিরের নামে শিরনি দেয়, মানত করে। খোয়াজ খিজিরকে প্রকৃতির সঙ্গে তারা একীভূত করে নিয়েছে। খোয়াজ খিজিরের শক্তিতেই তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করতে চায়।
অনেক দিন থেকেই মুসা ও খোয়াজ খিজিরের সাক্ষাৎপর্ব নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কথা ভাবছিলাম। আজ জোসেফ ক্যাম্পবেলের ‘মিথের শক্তি’র পাঠ শেষে করে সেই আকাঙ্ক্ষা আবার জেগে উঠল। মোজেসের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো জীবনটাই অসাধারণ এক কাহিনি। বালক বয়সে মুসা কর্তৃক কিবতি হত্যা, মিশর থেকে মুসার পলায়ন, মুলকে মাদইয়ানে আরেক নবির গৃহে আশ্রয়লাভ এবং তার কন্যাকে বিয়ে করে আবার মিশরে প্রত্যাবর্তন, ধীরে ধীরে বনী ইসরাইলের ত্রাণকর্তা হয়ে ওঠা... কাহিনি হিসেবে কিন্তু এটা খুবই চমৎকার। বিশেষ করে কোরআনে বর্ণিত খোয়াজ খিজিরের সঙ্গে মুসার সাক্ষাৎপর্বটির তো তুলনা নেই। শুধু এই পর্বটিকে অবলম্বন করেই রচিত হতে পারে দারুণ এক উপন্যাস। মধ্যযুগের কবিদের একটা বিশেষ গুণ ছিল, আরব্য পটভূমির কাহিনিকে তারা বাংলাবর্তী করে দারুণ সব কাহিনিকাব্য লিখতে পারতেন। সেই ক্ষমতা তাদের ছিল। একুশ শতকের এই আধুনিক যুগে সেই ঝুঁকি কোনো লেখক এখন আর নিতে চাইবেন না। কাহিনি হিসেবে এগুলো এখন তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না। কারণ উপন্যাসের বিষয়বস্তু পাল্টেছে। উপন্যাস এখন চরিত্রের মনোজগতে প্রবেশ করতে চাইছে। পাল্টেছে আঙ্গিক, পাল্টেছে ভাষা। উপন্যাস এখন বর্তমানকে ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের কোণাকাঞ্চিতে প্রবেশ করতে চাইছে। প্রাচীন কালের কোনো বিষয়স্তু নিয়ে ঔপন্যাসিকরা আর উপন্যাস লিখবেন কেন? পশ্চিম বাংলার ঔপন্যাসিক আবুল বাশার অবশ্য সেমেটিক মিথকে উপজীব্য করে দুটি উপন্যাস লিখেছেন― মরুস্বর্গ, রাজাবলি। তার সারা জীবনের লেখা শ্রেষ্ঠ দুটি উপন্যাস। শামীম আহমেও লিখেছেন একটি উপন্যাস― বিষাদবিন্দু, কারবালার কাহিনিকে উল্টে দিয়ে, এজিদকে নায়ক বানিয়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার ঔপন্যাসিকরা কিন্তু মিথ নিয়ে আধুনিক আঙ্গিকে কাজ করেছেন, করছেন। মাস ছয় আগে হেরমান হেসের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘সিদ্ধার্থ’ পড়লাম। উপন্যাসটির কাহিনি নির্মিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক সময়কে কেন্দ্র করে। সেই সময়ে গৌতমবুদ্ধ তার নির্বাণের দেশনা প্রচার করেছিলেন। অর্থাৎ এ কাহিনি আড়াই হাজার বছর আগের। হেরমান হেসের বাড়ি জার্মান। কোথায় জার্মান আর কোথায় ভারতবর্ষ! তবু হেরমান হেসে কিন্তু ভারতবর্ষেরই একটা মিথ নিয়ে লিখে ফেললেন অসাধারণ এই উপন্যাস! এরকম নজির আরো অনেক রয়েছে। অর্থাৎ এই একুশ শতকে মিথ নিয়ে কাজ করতে বাধা নেই, কাজ করাই যায়, যদি কব্জির জোর থাকে।
অবশ্য বিকাশমান মোল্লাতন্ত্রের এই বাংলাদেশে এই ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করার ঝুঁকিও কম নয়। ধর্মানুভূতির ব্যবসায়ী মোল্লারা তেড়ে আসবে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল তার বইয়ের নাম ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ রাখায় মোল্লারা যে প্রতিক্রিয়া দেখাল, মুসাকে নিয়ে উপন্যাস লিখলে তো রীতিমতো কল্লা নামিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেবে! কৈফিয়ত চাইবে, মুসা নবিকে নিয়ে মিথ্যা কল্পকাহিনি লেখার এত বড় সাহস তোমাকে কে দিয়েছে? ইহুদি নাসারার দালাল কোথাকার! একবারও বলবে না মধ্যযুগের কবি শাহ মুহম্মদ সগীর বাইবেল ও কোরআনে বর্ণিত নবি ইউসুফকে নিয়েই যে মনের মাধুরি মিশিয়ে কাব্য রচনা করেছিলেন। শাহ সগীর, আবদুল হাকিম, শাহ গরিবুল্লাহ, গোলাম সফাতুল্লাহ, সাদেক আলী বা ফকির মোহাম্মদদের সময়টা আসলে ভালোই ছিল। তাদের রচিত কাব্যের কাহিনি তো বাইবেল-কোরআনের কাহিনির সঙ্গে হুবহু মিল ছিল না। তারা মনের মাধুরি মিশিয়ে তাদের মতো করে লিখতে পেরেছেন। তাদেরকে কেউ হুমকি-ধমকি দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষ সেসব কাব্য সাদরে গ্রহণ করেছিল। শাহ সগীরকে তো পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন খোদ গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। তখনো মুসলমান ছিল, এখনো মুসলমান আছে। তখনকার মুসলমানরা ছিল উদার, সমন্বয়বাদী, সংস্কৃতিমনস্ক, আর এখনকার মুসলমানরা কট্টর, কূপমণ্ডুক এবং কুসংস্কারমনস্ক। তাই এখন এসব বিষয়বস্তু নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখা যাবে না। পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার জন্য এখন তো আর কোনো গিয়াসউদ্দিনও নেই। এখন আমরা গণতন্ত্রের লেবাসে, উদারবাদের লেবাসে, বহু পথ, বহু মত এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার লেবাসে আসলে একটি বদ্ধ সমাজে বসবাস করছি।
তবে একটা উপায় আছে। বাঙালি লেখকদের মধ্যে দেশের বাইরে যারা থাকেন তারা এই বিষয়বস্তু নিয়ে একটা উপন্যাস কিন্তু লিখতে পারেন। নবি মুসাকে বাংলার প্রাচীনকালের জমিদারের পালিতপুত্রের চরিত্রে এবং খোয়াজ খিজিরকে লোকদেবতার চরিত্রে দাঁড় করিয়ে অসাধারণ একটি উপন্যাস লেখা যায়। এটা কিন্তু পরামর্শ নয়, আকাঙ্ক্ষা। হেরমান হেসের মতো আমিও লিখতে পারতাম মুসা-খিজিরের এই মিথকে কেন্দ্র করে একটি উপন্যাস। কিন্তু জীবন-জীবিকার ফাঁদে পড়ে আটকে গেছি এই বদ্বীপের কাঁটাতারের ঘেরাটোপে। আমি লিখতে না পারি, আশাবাদ, ভবিষ্যতের কোনো না কোনো ঔপন্যাসিক নিশ্চয়ই লিখবেন। লিখবেন কীভাবে সেমেটিক মিথপুরুষ খোয়াজ খিজির এই বঙ্গে এসে তার আসানটি স্থাপন করেছেন, কীভাবে তিনি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রাতস্মরণীয় হয়ে উঠেছেন। অনাগত সেই ঔপন্যাসিকের প্রতীক্ষায় থাকা ছাড়া আর উপায় কী।
লেখক: কথাসাহিত্যিক























