চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই, যুগের সঙ্গে সবকিছুর পরিসমাপ্তি
রাহমান চৌধুরীপ্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০২৬
বাংলাদেশের কোনো সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতি বন্ধ করতে আরম্ভ করে, নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চায়; সেই সরকারের বিরুদ্ধে সবার আগে চটে যাবে, ষড়যন্ত্র করবে এবং আন্দোলনে নামবে শিক্ষিত ভদ্রলোকরা, মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা। কারণ তাদের সকল রকম ভোগ-বিলাসিতা, সম্পদের উৎস, আভিজাত্য আর চাকচিক্য টিকে আছে দুর্নীতির ওপরে। ঠিক একই কারণে এদেরই একটি বড় অংশ হাসিনার পতন মেনে নিতে পারেনি। কারণ তাদের দুর্নীতি আর সম্পদ বানাবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ, জনগণ কিছুই এসব দুর্নীতিবাজদের কাছে বড় কথা নয়, তাদের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধকে কেনাবেচা করে সম্পদ বানানো। ঠিক যেভাবে আরেক পক্ষ ক্ষমতা লাভের জন্য ধর্ম কেনাবেচা করছে। দুর্ভাগ্যজনক, এদেশের সুবিধামতন মুক্তিযুদ্ধ ক্রয়বিক্রয় হয়, ধর্মের বেচাকেনা চলে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাহিমাকে এভাবেই একদল দুর্নীতিবাজ কলঙ্কিত করেছে।
বাংলাদেশে চলে লাশের রাজনীতি, সবাই লাশের ওপরে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য পাল্টায়। ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের পর ঠিক তাই ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে একদল লোক সম্পদ বানিয়েছে। নব্বইয়ের আন্দোলনের পর তাই ঘটতে দেখা গেছে। ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পর এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সামনের সংসদ নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসতে চাইছে সেখানেও আছে ব্যাংক লুটপাটকারীদের একটা অংশ। রাজনীতির লক্ষ্য জনগণের মুক্তি নয়, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলা নয়। জনগণকে দাবার ঘুঁটি বানিয়ে বিদেশি শক্তির কাছে নতজানু হওয়া। পরে লুটপাট চালানো, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে সুবিধামতন বিদেশে গিয়ে সুখের আস্তানা গড়ে তোলা
মাতৃভাষার মর্যাদা নেই এদেশে, ভাষা আন্দোলন একটা গল্পে পরিণত। হয় ইংরেজি, না হলে আরবি ভাষার দৌরাত্ম্য চলে নানাভাবে। এর মধ্যে সামান্য দেশপ্রেম নেই, রয়েছে ভোগের লক্ষণ। রয়েছে সবাইকে বাদ দিয়ে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ভাষাকে সম্মান না দেখাতে পারা মানে, এরা জনবিচ্ছিন্ন। অথচ ইউরোপ যেদিন থেকে মাতৃভাষাকে সম্মান দিতে শিখেছে, মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা শুরু করেছে, সেদিন থেকেই তারা উন্নতি লাভ করতে আরম্ভ করে। কথাটা এশিয়ায় জাপান আর চীনের ক্ষেত্রেও সত্য। তারা ইংরেজি না জেনেই এশিয়ার সবচেয়ে এগিয়ে থাকা জাতি বা দেশ।
যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে বশে রাখতে চায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সামান্য বিশ্বাস রাখে না, দেশের ও জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু তারা। যতক্ষণ এই ধরনের রাজনীতি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ছাড়া একটা দেশের সত্যিকারের ভবিষ্যত দাঁড়াতে পারে না। বিশ্বের কোথাও তা দাঁড়ায়নি। চীন ও জাপান ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রেখেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেয়নি। হিন্দুত্ববাদী ভারতেও পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভুত্ব চলে না। ফলে বিশ্বের সকল বড় বড় বিজ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানে ভারতীয়রা বিপুলভাবে বড় বড় পদ দখল করে আছে। দখল করে রেখেছে বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বা বহুজাতিক সংস্থার প্রধান নির্বাহীর পদগুলো। বাংলাদেশের পরিচয় সেখানে তলানিতে বহুকাল ধরে।
মুক্তির প্রধান শর্ত মুক্তচিন্তা, মানবসভ্যতার সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করা। বিশ্বসভ্যতার যা কিছু বিশ্বমানবতার পক্ষে দাঁড়ায় তা সারা বিশ্বের সম্পদ, সকলের তাতে অধিকার জন্মেছে। নিজেদেরকে তা থেকে বঞ্চিত করা, সভ্যতার সেইসব ইতিবাচক অর্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার নামই পশ্চাৎপদতা। নিজের ভোগ-বিলাসিতার জন্য, নিজের সন্তানকে ধনী আর বিলাসী বানাবার জন্য রাজনীতি করার নামই অপরাজনীতি, নিজের ইচ্ছা আর মতাদর্শ জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার নামই স্বৈরাচার, তা যার দ্বারাই ঘটুক। বিশ্বে এমন কোনো চিরস্থায়ী মতবাদ নেই যা সর্বকালের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, ধর্মের ক্ষেত্রে তা একইভাবে সত্য। সেই কারণে সময়ের সাথে সাথে ধর্মগুলো পর্যন্ত নানা রকম সম্প্রদায়ে আর উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাই সকল মতাদর্শই নানা দলে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। নিজেকেই একমাত্র শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করবার সুযোগ নাই কারও।
বিশ্বে কোনো মানুষ নেই যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বিশ্বের সকল মানুষ এক হয়ে একই সঙ্গে কাউকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মানবে না। বিশ্বের সকল মানুষ একবাক্যে কোনো ধর্মগ্রন্থকে, কোনো মতাদর্শকে, কোনো নেতাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মানতে রাজি হবে না। ফলে নিজের মতামত, পছন্দ-অপছন্দকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। নিজের মতকেই একমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বের সকলের সমর্থন নেই তাতে। এই বিরাট বিশ্বে কত লক্ষ-কোটি মানুষ জন্মেছে, সেই বিচারে সকল মানুষ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজেদের অবদান রেখেছে। মানুষ সমাজে অবদান রাখতে পেরেছে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে। ফলে কোনো মানুষ সমাজে এককভাবে অবদান রাখে না। সকল রকম মানুষের সব অবদান রাখার পেছনে আছে তার আগের মানুষের নানা রকম ত্যাগ-তিতিক্ষা। সব কিছুর পিছনে আছে ইতিহাসের প্রবাহমানতা। মানুষকে তাই সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবার কিছু নেই, সবাই তার যুগের প্রয়োজনে সৃষ্টি। ভিন্ন দিকে কাউকে এক কথায় বাতিল করার চেয়ে সমালোচনাসহ তাকে গ্রহণ করাটাই যুক্তযুক্ত।
বিশ্বের মানব সভ্যতার ব্যাপ্তি বিরাট। বহু বহু বছর আগে আরম্ভ হয়ে হাজার হাজার বছর পার করে সামনে এগিয়ে চলেছে। বর্তমান মানুষরা তার একটি ক্ষুদ্র পর্বে জন্মেছে, সভ্যতা আরও এগিয়ে যাবে। সভ্যতা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কেউ বলতে পারে না। মানব সভ্যতার বিরাট পরিসরের এক ধাপে এসে মানুষ অস্ত্র বানাতে শিখেছে। মানুষ অস্ত্র বানায় এবং তা ব্যবহার করে, মানুষ এখানেই অন্য প্রাণী থেকে আলাদা। মানুষ অস্ত্রের দ্বারা অন্য মানুষকে হত্যা করেই মানবসভ্যতার জন্ম দিয়েছে। মানবসভ্যতার পেছনে আছে মানুষের রক্তাক্ত হাত, এটা ইতিহাসের এক অনিবার্য পরিণতি। মানুষ অন্য মানুষকে রক্তাক্ত করেই, অন্যকে বঞ্চিত করেই তার সম্পদ বানিয়েছে। অন্য মানুষকে বঞ্চিত না করে বিরাট সম্পদের মালিক হওয়া যায় না। ধনীদের পূর্ব ইতিহাস হচ্ছে তাই লুটপাটের ইতিহাস। বহু মানুষকে বঞ্চিত করে, শোষণ করে তারা হঠাৎ একদিন নিজেকে ধনবান বলে প্রচার করছে।
সারা বিশ্বে লুণ্ঠিত হওয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে বঞ্চিত মানুষদের। বঞ্চিত আর লুণ্ঠনকারীদের মধ্যকার লড়াই মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় ঘটনা। হাজার হাজার বছর ধরে এ লড়াই চলছে। শ্রমের দাসত্ব থেকে মানুষের মুক্তি না ঘটা পর্যন্ত এ লড়াই খণ্ডিত আর বিরামহীনভাবে চলবে। সম্পদ বাড়াবার জন্য লুণ্ঠনকারীদের নিজেদের মধ্যেও রক্তাক্ত সংগ্রাম চলে। লুণ্ঠনকারীদের সঙ্গে লুণ্ঠনকারীদের লড়াই আরো বড় ঘটনা। ইলিয়ড অডিসি আর মহাভারতে রয়েছে তার বর্ণনা। দু’দুটো মহাযুদ্ধও তাই। ধনীদের আরও সম্পদ বাড়ানোর বা অন্যের দখলের, কিংবা অস্ত্র বিক্রির পাঁয়তারা ছিল তা। লুণ্ঠনকারীদের মধ্যকার লড়াইটাই বিশ্বকে বেশি উত্তপ্ত রাখে। ধ্রুপদী বিশ্বসাহিত্যে দেখা যাবে, লুণ্ঠনকারীদের সঙ্গে লুণ্ঠনকারীদের লড়াইয়ে কল্পিত দেবতারা দু’পক্ষে চলে গেছে নিজেদের স্বার্থে। মানুষ তো ভালো, দেবতারাও নিজের স্বার্থের কথা ভাবতে পছন্দ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে, সাহিত্যে, ধর্মগ্রন্থে কত দেবতারা এসেছে যাদের আজ আর অস্তিত্ব নেই। কত শত মানুষ এককালে নিজেদের ভালো-মন্দের জন্য ঐসব দেবতাদের পূজা দিয়েছে, সর্বশক্তিমান ভেবেছে। যাদেরকে রক্ষাকর্তা আর সর্বশক্তিমান ভেবেছে, আজ সেইসব দেবদেবির আর খবর নেই। যারা মানুষকে রক্ষা করবে, সেই দেবতারা নিজেদেরকেই রক্ষা করতে পারলো না। সবাই তারা কেবল গ্রন্থের পাতায় নাম রাখা ছাড়া এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষও ঠিক তেমনই, যুগের সন্তান, যুগের প্রয়োজনে সে নায়ক কিংবা খলনায়ক হয়। চিরস্থায়ী নায়ক বলে কিছু নেই, যুগের সঙ্গে তার পরিসমাপ্তি। ইতিহাস যাকে যতটা প্রয়োজন ততটা স্বীকৃতি দেয়, কাউকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেয় না।
ধর্মের ইতিহাস একই রকম। কত ধর্ম এসেছে আর হারিয়ে গেছে। কিছু মানুষের বিচারে তাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম থাকতে পারে, সভ্যতার বিচারে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে কিছু নেই। মানুষের প্রয়োজনে, ঘটনার বাস্তবতায় বহু ধর্ম এসেছে আবার হারিয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও জানা গেছে বিশ্বে এখন বিয়াল্লিশশো ধর্ম আছে। বিশ্বাসীরা সবাই তার একটা গ্রহণ করে বাকিগুলো বাতিল করেছে। যারা ধর্মহীন তারা সবগুলোকে বাতিল করেছে। বিশ্বাসীরা অনেকে একেশ্বরে বিশ্বাস করেছে, কেউ সর্বেশ্বরে বিশ্বাস করেছে আবার কেউ নানা রকম মাটির প্রতিমা বা দেবতা বানিয়ে পূজা দিয়েছে। নানান মানুষের মনের দরজা নানান রকম, কারও উচিত নয় সেখানে জোর করে নিজের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দেওয়া। দিতে চাইলেও লাভ নেই।
মানুষ যে ধর্মের নামে নিজের ইচ্ছাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তার পেছনেও আছে লুণ্ঠনের আকাঙ্ক্ষা। সকল বড় বড় ধর্ম যারা নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চেয়েছে তারা অন্যের দেশ দখল করেছে, সেখানে লুণ্ঠন চালিয়েছে। সন্দেহ নেই, সেইসব ধর্মের অবশ্যই কালের প্রেক্ষিতে নানান ইতিবাচক ভূমিকাও আছে। ইতিহাসের চোখ দিয়ে দেখলে সেটাই প্রমাণিত হবে। সবকিছুর ভিতর ইতিবাচক আর নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাবে। যা এককালে ইতিবাচক ছিল, পরবর্তীকালে নেতিবাচক ফল রেখেছে। ভালো ফল বা দ্রব্য পচে যাবার মতন। ডখন পচে যায়, তখন তা ফেলে দেয়া হয়। ভিন্নভাবে এটাও লক্ষ্য করা গেছে, যখন ধর্ম নিয়ে ব্যবসা বা রাজনীতি করা আরম্ভ হয়, তখন সেটা আর মূল ধর্মের জায়গায় থাকে না। ধর্মের রূপ পাল্টায়। ধর্মকে নিজেদের মতন করে ব্যাখ্যা দেয় পুরোহিত বা ধর্মব্যবসায়ীরা। ঠিক সে কারণেই তখন একটা ধর্ম নানান রকম চিন্তা আর দলাদলিতে বিভক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে তাই আজ বহুরকম ইসলামি দল দেখা যাচ্ছে। সত্যি তো, ধর্ম আজ এত দলে আর উপদলে বিভক্ত কেন? সকলেই কেবল নিজেকেই সঠিক মনে করছে। সেখানে সত্য কার মধ্যে খুঁজবে মানুষ? ইসলাম ধর্মের নবি বারবার বলেছেন জ্ঞান অর্জনের কথা। বলেছেন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষালাভ আবশ্যক। আরব মনীষী ইবনে সিনা, আবু রুশদ, আল রাজি, আল বেরুনী প্রমুখ তাই বলে গেছেন। অথচ ইসলামের তথাকথিত অনেক কর্ণধর এখন বলছেন ভিন্ন কথা। বলছেন, নারীর জন্য শিক্ষালাভ চাকরি করা নিষেধ। বিবি খাদিজা ছিলের আরবের একজন বড় ব্যবসায়ী, পর্দার আড়ালে ছিলেন না তিনি কখনো। নবির আরেক স্ত্রী তরবারি হাতে ময়দানে যুদ্ধ করেছেন। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাধা দিতে চায়, মানুষের মুক্তচিন্তায় বাধা দিতে চায় তারা কি সত্যিই প্রকৃত ইসলামকে ধারণ করে? নাকি তারাই বহুকাল ধরে ইসলামের শত্রু?
যাকে মানুষ স্বাধীনতা বলছে, ইতিহাসে দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা লুণ্ঠনকারীদের হাত বদলের ঘটনা। বিশেষ করে বিভক্ত ভারতবর্ষের ক্ষমতায় এসেছে এক লুণ্ঠনকারীর জায়গায় অন্য লুণ্ঠনকারীরা। সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। যারা প্রাণ দিয়েছেন মুক্তির স্বপ্ন দেখে, প্রায় প্রতিবার তারাই বঞ্চিত হয়েছেন। নতুন শাসকদের দমনপীড়নের শিকার হয়েছেন। বিচার করলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতাও তাই। স্বাধীনতার নামে এক পক্ষকে সরিয়ে দিয়ে আর এক পক্ষের লুণ্ঠন আরম্ভ হয়। স্বাধীনতার নামে সাধারণ মানুষ এবং নতুন রাষ্ট্র নতুন নিপীড়নের মধ্যে প্রবেশ করে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে ঠিক তাই ঘটেছে। মানুষ নতুন স্বপ্ন নিয়ে অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে সরকারকে হটিয়ে দিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন নিপীড়নের মধ্যে প্রবেশ করেছে। পরের সরকার তাদের স্বার্থ রক্ষা করেনি। সেই কারণে কি অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম বন্ধ করে রাখতে হবে? না, প্রতিবার চলবে বঞ্চনার বিরুদ্ধে বৃহত্তর মানুষের সংগ্রাম।
সকল শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি রাখতে হবে। না হলে শাসকদের দুর্বিনীত হওয়া রোখা যাবে না। শাসকদের উচ্ছিষ্টভোগীদের তাণ্ডব বন্ধ করা যাবে না। হেরে গেলেও লড়াই চালাতে হবে চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত। অত্যাচারীর কাছে কখনো মাথা নত করা চলবে না। বড় অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অনেক সময়ই ছোট অত্যাচারীতে সঙ্গে নিয়ে লড়তে হয় মানুষকে। ফলে লড়াইয়ের শেষে হতাশা আসতে পারে ছোট শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতা দেখে। তখন ছোট শত্রুই আবার বড় শত্রু হয়ে দেখা দেয়।
ভারতের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, সকলেই সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখে গেছেন। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাবানরা তাদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। প্রতিটি সংগ্রামে এমন সুযোগসন্ধানী বিশ্বাসঘাতকদের পাওয়া যায়। সংগ্রামের প্রতিটি মিছিলে এইসব কুচক্রীরা থাকবে, কখনো কখনো তারাই নেতৃত্ব দেবে, জনগণের সংগ্রামকে বিপথে পরিচালিত করবে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে তা স্পষ্টভাবে ঘটেছে। সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারী শাসনের যাতাকল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে, আর ভিন্নতিকে একদল পুরানো শাসককে হারিয়ে নিজে স্বৈরাচার হতে চেয়েছে।
লড়াই শেষে বহু মানুষ এখন ধর্মের অনুভূতি বিক্রি করে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এসব অপকর্ম ঘটা সত্ত্বেও জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম বন্ধ রাখা যাবে না। বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম মুখ থুবরে পড়লেও, প্রতিটি সংগ্রাম মানুষের চিন্তাকে তা শানিত করবে। মানুষ এসব ঘটনার ভিতর দিয়ে ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি আর মানবসভ্যতার প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারবে। এর ফল শেষ বিচারে বৃথা যাবে না।
ফরাসি বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছিল। বারবার ব্যর্থ হয়। ইউরোপে তার পরে কত সংগ্রাম ব্যর্থ হলো। ফরাসি বিপ্লবে ঘটনা পরম্পরায় প্রথমবার নেপোলিয়নের মতন এক স্বৈরাচার ক্ষমতায় বসেছিল। ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে কাউকেই সানছিল না, ক্ষমতা হারালো আবার। হিটলারের কথা স্মরণ থাকবে, ফরাসী বিপ্লব সেদিন পর্যন্ত ব্যর্থ ছিল। ফরাসি বিপ্লবের পর নতুন ব্যবসায়ী, যারা টাকা গুণতে পছন্দ করে, তারা ক্ষমতায় আসে। পরে দু দুটা বিশ্বযুদ্ধ ডেকে এনেছে তারা। কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের বাণী কখনো হারিয়ে যায়নি, শেষ বিচারে ফরাসি বিপ্লব পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। বিরাট অবদান রেখেছে ইউরোপে এবং সারা বিশ্বে বর্তমানকালে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায়। ফরাসি বিপ্লবের দুশো ষাট বছর পর ১৯৫১ সালে ফরাসি বিপ্লবের দাবিগুলো, যেমন `ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র`, `মতপ্রকাশের স্বাধীনতা`, `মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা`র দাবি মেনে নিতে হয়েছিল ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে।
প্রতিটি লড়াইয়ের নানা স্তর থাকে। নানা স্তরের একটার পর একটা পার হতে হয় চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। সংগ্রামের একটা দুটা স্তর পার হওয়া মানেই চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছানো নয়। বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনীতিতে কী ঘটেছে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, খণ্ডিত নানা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, ১৯৪৭ এর পর পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট গঠন, পূর্ববাংলার স্বাধীকারের লড়াই, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের আন্দোলন, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান; এসব চুড়ান্ত আকাঙ্ক্ষার জায়গায় পৌঁছাবার আগের এক একটা স্তর। এমনটা আরো ঘটবে, হয়তো সুফল পাওয়া যাবে না। তাতে হতাশ হওয়া চলবে না। হতাশ হলেই শত্রু পক্ষ সুযোগ পাবে, নিজেকে মহীরুহ ভাববে।
প্রতিটা লড়ায়ের ইতিবাচক ফল আছে, যা সর্বদা বোঝা যায় না। লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে বহু মানুষের মনের নানা দরজা খুলতে থাকে। বৃহত্তর মানুষ যখন এসব ঘটনার ভিতর দিয়ে সমাজবিজ্ঞানের সচেতনতা লাভ করবে, লড়াইয়ের প্রতিটা কানাগলি চিনতে পারবে, নিজেরা নিজেদের চাওয়া পাওয়া সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির জায়গায় পৌঁছাবে, তখনি চূড়ান্ত বিজয়ের কাছাকাছি একদিন পৌঁছাতে পারবে মানুষ। পথটা দীর্ঘ, বারবার রক্ত দিয়ে তাই তার দায় চুকাতে হবে। রক্ত দেয়ার আগে গভীরভাবে চিন্তা করে পথে নামতে পারলেই, সংগ্রামের পর সাফল্য বেশি আসবে। ফলে আবেগ বিসর্জন দিয়ে গভীর চিন্তাচেতনা অর্জন করতে হবে সকলকে। সেজন্য দরকার বিশ্বের ইতিহাস আর সারা বিশ্বের মহৎ সাহিত্য পাঠ করা। সারা বিশ্বের সংগ্রামের ইতিহাসকে জানা। গভীরভাবে তাতে মনোসংযোগ করা।
সংগ্রামী মানুষদেরকে তাই হতাশ না হয়ে ইতিহাসের দিকে বারবার ফিরে তাকাতে হবে। ইতিহাস থেকে শিখতে হবে, ইতিহাসকে গভীরভাবে অধ্যয়নের ভিতর দিয়ে নিজেদের চিন্তাকে শাণিত করতে হবে। নিজেদের মধ্যে অকারণ বিভেদ না বাড়িয়ে প্রকৃত শত্রুকে চিনতে হবে। নিজেদের অজ্ঞতা আর কূপমণ্ডুক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে সত্যিকারের বিজয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে হলে। বারবার প্রশ্ন করতে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সুফল কার হাতে চলে গেল। কেন গেল। মুক্তিযুদ্ধের পর কেন বৃহত্তর মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো না। বাইরের শত্রুকে পরাজিত করার পর কারা কারা ছিল ঘরের আসল শত্রু?
লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ























