মুজতবা আহমেদ মুরশেদের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জুন ২৮, ২০২২

অলৌকিক কুয়াশাগণের আমন্ত্রণ

অলৌকিক কুয়াশাগণ এসেছেন শীতের জন্মদিন পালনে
বাতাসের দোলায় চেপে আমাদের শ্যামল জনপদে।
তারা সাথে করে এনেছেন
খেজুরের রস,
আখের পাটালি ।

শর্ষেফুলের বিস্তৃত বাগান আর মৌমাছির আহ্লাদ ছড়িয়ে
তাহারা জমিনে ফুটিয়েছেন
বাহারি ফুল হলুদ-বেগুনি লাল নীল,
আর আমাদের নারীদের প্রাণে
নকশিকাঁথার গান আনমনে।

কুয়াশাগণ নিজেদের সাথে করে আনা শিশিরের ঝাড়বাতি
ঘাসের ডগাদের অনুরোধ করে দিয়েছেন মাঠের ওপর জ্বেলে।
শিশিরের আলোতে
টুনিবগার বাড়ি,
নৌকোর গলুই
আর বৃক্ষপাতারাও
বিহ্বল আলোতে
মাতামাতি পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে ।

দূর বিদেশের পাখিরাও তুষারপাতের মায়াবী স্মৃতি দূরে রেখে
নদী আর বিলে উৎসবে উঠেছেন মেতে ঘোরলাগা উড়ন্ত আয়োজনে।

জানো, আমার সাথে প্রভাতেই কুয়াশাগণের দেখা হলো আজ।
কুশলাদির পর তাহারাও বলেছেন আমাকেও শিশিরের সাথে মিশে যেতে।

বৃষ্টির গহীন পরাণ

উদোম রাত্রির কাছে বৃষ্টি গিয়ে কথা বলে সুনিপুণ
উবু হয়ে শ্বাস নেয় মাটির ভাঁপের,
আহ্লাদি ঘাসের ডগায় হাসে খিলখিল, ঝুমঝুম ।
বৃষ্টির রুপোলি ঠোঁটের োপর কী এক যাদুর খেলা !

আমি চমকাই বৃষ্টিতে স্মৃতির জীবন মেলে
দেখি বাতাসে উড়ে যায় না ফেরার মেঘ,
মেঘের ভেতর দেখি বৃষ্টি আমাকে ডাকে!

সহসাই বৃষ্টি ভেজা মাঠ ছেড়ে কাছে আসে,
ডাকে পরাণ ধরে, জানালায় দেয় মৃদু টোকা,
আমাকেও ভেতরে নাও, গহীন পরাণে,
অভিসারী হবো আমি তোমার ভাঁপে ।

বৃষ্টির যাদুময় ঠোঁট কথা বলে,
‘ছায়ার আঁধারে মুড়ে ক্যামনে থাকি দূরে তোমাকে রেখে!’

ঘনঘোর বৃষ্টি ওর ঘ্রাণে মুঝে দেয় রাত
ভোর রোদ দুপুর বিকেল
মুঝে দেয় ক্ষণ ।

মুঝে দেয় অগোছালো প্রাচির,
অনর্থক দুয়ার দেয়া জটিল জীবন।

চির পঁচিশের লোহানী

মাঝরাতে দরজায় সাড়া পড়ে,
ঠকঠক।
সময়টা চমকায়, পলকে তাকায়,
কে ওখানে, দরজায়
করে নক?

আমি বিপ্লব, হাতে নিয়ে আছি
লাল ফুল গুনে সত্তুর।
এটা কি প্রিয় লোহানীর বাড়ি?
দারুণ তরুণ। চিরকাল সে
ঝকঝক।

বিপ্লব বলে একসার কথা, বলে চলে খুব তরতর,
বলবেন আজ লোহানীকে ভোরে,
সত্তুর যেন না বানায় তাকে সাদা চুলে
মহা থুত্থুরে বুড়ো, কাঁথা গায়ে বড় নড়বড়।

পঁচিশ বছরের যৌবন পেতে লোহানীকে আজ দরকার।
বুকে পিঠে আঁকা সবুজের ছোপ,
না যেন বলে ভালো আছি খুব
সাদা পোষাকে মোমবাতি জ্বেলে
নাতিপুতি সাথে মৌতাতে মেতে।

বলবেন তাকে, যৌবন চাই রুদ্র।
আগ্নেয় লাভায় দৃষ্টি শাণাই,
দু’হাতে ঘুরাই ক্রোধের নাটাই
বুকেতে অগ্নি ক্ষুধিত শিখায় ক্ষুব্ধ।

দ্যাখো চারিদিকে বেনিয়া সময়
স্বপ্নকে ধরে শবাধারে পুরে,
এ সময় আজ লোবানে চুবানো
শবের গন্ধে শকুনেরা ওড়ে।

ব্যারিকেড ভাঙা ঝাণ্ডা ওড়ানো লোহানীকে চাই দুঃসময়ে
দিপ্ত তেজের শ্লোগান ঝাঁঝানো কমরেড।
লাল সত্তুর ফুলগুলো রেখে,
আমাদের সাথে গান গাও পথে,
ভেঙে ফেলি চলো অপশাসনের ব্যারিকেড।

মাঝরাতে এত বলে গ্যালো কথা ফুল হাতে এক বিপ্লব।
দুই হাতে করে খুব জোরে জোরে
কড়া নেড়ে নেড়ে দরজায় আজ,
ঠকঠক!

মেনকার দহলিজে স্মৃতি

প্রগাঢ় রাতের জোছনা নিংড়ে আমি আকণ্ঠ মাতাল
মেনকার দহলিজে স্মৃতি ফেলে পলাতক দুপুর খুঁজি।
আমি বিস্ময়ে থমকাই !
দুপুরে আবার জোছনা নামে ক্যানো?
ক্যানো সব অচেনা লাগে আশপাশ?
পথ কি ভুল হয়ে গ্যালো এবার আমার?

এমন দুপুরেই ফিরে দেখি,
আবার মাতাল হতে মন চায়।
অমোন জোছনা চুয়ানো দহলিজ চিনে খুঁজে এখন কোথা পাই?

পরাজয়

এক মুঠো শূন্যতা পলকে পলকে ফুলে ওঠে পালের মতো
কী ভীষণ তোলপাড় বুকে।
সময়ের হাঙ্গর আমাকে ভেবেছে পরাজিত মীন,
জলের অতল গভীরে ধরে নিচ্ছে আমাকে নিয়ত বহু দূরে।