আশরাফ রোকনের একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

চেতনারহিত

নিভৃতে যখন কেঁদে উঠে সকলের অলক্ষ্যে হৃদয়
চেতনারহিত হয়ে পড়ে তখনই চাঁদ আর
নৈঃশব্দ্যের অবর্ণনীয় ঘূর্ণির ভিতর হারিয়ে যেতে যেতেই
ফিরে আসি চেতনার অতি উঠোনটাতেই আবার যখন
তখন কিসের দুঃখ কি লাভ ভেবে দুঃখের মৌলিকতা
হে দুঃখের নাবিক অতলান্ত সমুদ্রের কাছেই বিনীত
সমগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন যে পাড়ি দিয়ে গেছো পথ
পথের সমগ্রতা একটা অমূল্য জীবন ভেবে অসামান্য
পাড়ি দিয়ে প্রত্যহ সামান্য সময়ের ফোঁড়মাত্র
আকাশে দাঁড়িয়ে থাকা তারাগুলির চোখের ভিতর তাকিয়েই যতটুকু আলো বোধ হয়
নিরন্তর জ্বলে যে আগুনের তীব্রতা তার কাছে তুমি যাও
অসামান্য বন্ধু হে বিদায় বলি নি একবারও
কেন অত মনে পড়ো প্রহরে প্রহরে তুমুল নিঃশব্দ
স্বপ্ন দেখার মুহূর্তে বারবার জেগে ওঠছ যে
ভাবি বিরস জীবন হতে কিছুটা মুক্তির আনন্দই
বয়ে নিয়ে বেড়ায় সে-সুর আর সে করুণাসিন্ধু
যখন অলক্ষ্যে কেঁদে ওঠে হৃদয় চেতনারহিত তখন।

চাঁদ দেখা

চমকপ্রদ এই মায়াবী অন্ধকারে বুঝি আজ
স্পর্শ করে থাকবে চাঁদ দেখার সাধ
কারো কারো কথার আকাশ
আর কেবলি নির্বাক এখানে আমার
সারাক্ষণ বাসনাবিহীন বসে থাকা
বসেই থাকা আরও অনেক সময়
যেন আকাশের অনেক অনেক নিচে
একটা কোনো ভাঙা কুয়োর পাড়ে একা
বিষাদের জল মেপে মেপেই অদৃশ্যে

কিছুটা বাস্তব ও অবাস্তবের মাঝে
অঢেল ভেবেও দেখিনি কখনো চাঁদ
খুঁজে দেখে পেয়ে যাই শুধু
একটা সাদা বরুণ ফুল।

অলব্ধ

অলব্ধ সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল
স্বকালের ঘূর্ণায়মান আঁখির পরতে কোথাও
মনে হয় লুকিয়ে পড়েছে
সনাতন মুগ্ধতায় বিনম্র যা কিছু শিল্পময়
প্রার্থনার নানান রঙে রঙে স্পন্দিত
হারিয়ে গেছে অন্য কোথাও

যেন আর ফিরে আসবে না মনে হয়
আচ্ছন্ন এখানে কাটে ঘোরে
হয়নি পাওয়া হারানো স্বপ্নগুলিই
মেলে দিয়ে চিত্রল পাখনা
উড়ে চলে গেছে যারা দূর পরবাসে

ভাবনার অনুপৃষ্ঠাজুড়ে বিরল ছায়াই পড়ে
আজ হারানো স্বপ্নগুলির
যাদের ফিরে পাব না কখনও আর।

কাকের জন্যে ভালোবাসা

আধভেজা কাক সন্ধ্যা অবধি উড়ছে তো উড়ছেই একবারও থামছে না নামছে না নিচে
শৈশবের আয়নার ছায়া দেখেও ভীত নয় সে
অনুজ্জ্বল বিষাদে ডুবেই সারাক্ষণ হয়তো-বা
উড়ে উড়ে ঘুরছে এখানে মাথার উপরে আর
বুকের উপরে সাদা সাদা পাগুলিই যার খুব ভালোবাসি
হেঁশেলের ধোঁয়ার আবরণে আচ্ছন্ন কখনও ম্লান নয়
আগুনের আঁচ বুঝতে পেরেই এমন ক্রন্দনের সুর তোলে
সকাল হতে উড়ে উড়েই ক্ষিপ্র অজানা ভাবুক কাকটাকে
ও মেঘ রুখে দিও না কখনো তোমার অসফল চিন্তায়
চলার পথটাকেই তার করে দিও না দুরাশায় অস্পষ্ট।

এই পথে এসে

এই পথে এসে মনে হলো
ছিন্ন পাতাগুলো জোড়া লাগলো আবার
রঙিন ফেনার দিশেহারা বুদ্বুদেই
শেওলাপ্রাচীন পুকুরের ফিরে এলো সম্বিৎ
ভেঙে গেলেই ঘুম এখানে
বনেদী জলের তরঙ্গভঙ্গের গতি
সচল সবেগ আনন্দিত সারাক্ষণ
আকাশের ছায়া পড়ে মুগ্ধ অনিমেষে
এই পথে এসে সম্ভাবনার কুঁড়িরা
ফুল হয়েই ওঠলো ফোটে
মাঠের বিস্তারে মন পেতে শোনা হলো
শস্যমঞ্জরির গান সবুজাভ শিহরণে কাঁপা
বাতাসের সুরের ঝালর দেখা হলো
এই পথে এসে সন্মুখে পড়েছে নদী
শান্ত পলিসার স্বপ্নময় জলেরই কলতান
জোছনারাতের নিঃশব্দতায় বোনা
ক্ষিপ্র বয়ে চলে যে পথে এসেছি আজ
আমারও সোনালি ছায়ার সাথে হেঁটে।

বোধ, বোধগম্যতা

চোখের তারা থেকে কখনো দূরে নয়
রাতের আকাশে তারাগুলি
তাকিয়েই সহসা যাদের দেখা মেলে
আকাশে আকাশে যারা নিত্য
সোনালি বোধ ছড়িয়ে যায়

আর হয়তো-বা বোধগম্যতা হারিয়ে
বিপর্যস্ত কোনো তারার শোক হতেই
মনে হয় জন্ম আমাদের
বনমোরগের শীৎকারের অলীক
শব্দে শব্দেই যেন এখানে

গারো মেয়েটির স্নানের মুহূর্ত শেষে
অপরিণামের ঘোলাটে জলে-জলাধারে
সাঁতার কেটে কেটে আরও বড় হয়ে
তারপর উঠে পড়ে এসেছি ডাঙায়!