আশরাফ রোকনের ৭ কবিতা
প্রকাশিত : জুন ১২, ২০১৯
বিবর্ণ সঙ্গীত
অনুজ্জ্বল বিবর্ণ সংগীত সর্বত্র:
আমারই স্বপ্নের ভূমিতে
চেয়ে দেখো হচ্ছে প্রতিদিন
কেবলি মৃত ফুলের চাষ।
শ্মশানকুলি পাখির কণ্ঠস্বরে গীত
প্রত্যহ অজস্র মৃত্যুর খবর আর
আরও আরও নিশীথের ইংগিত,
অশ্রুত অনেক দুঃখের পদাবলি
দেখো দীর্ঘতা পায় এখানে ক্রমাগত
আরো সারি সারি অন্ধকার
ইতিহাসকে পেছনে টেনে ধ`রে:
বুঝি কোনো শত্রুর অশ্বের খুরে আজ
বাঁধা পড়ে আছে অধোঃমুখ
আমাদের সকলের স্বাধীন জীবন,
বহুদূর পাড়ির সংকল্পই যেনো বন্দী
কালো কোনও যাদুপাত্রের হাতে!
বোধের সঙ্গীত
মনোরম আবহ ধরে রাখতে নিয়ত এখানে
আপন হৃদমাজারে নিত্য নিত্য অমূল্য কতো যে
আরতী আর পুষ্প অর্পণ আর বোধের সঙ্গীত
যেনবা আরও একটি বিগত সকালের মমি
খুঁড়ে তোলে সূর্য ওঠা শস্যদের নিবিড় গুঞ্জনে
ভাবি অতল নিরাভয় গভীর দূর অতীতের
হারানো হাসিকান্নাদেরই ফটোগ্রাফ যেন কোনো
চির বসন্তের হলুদ বাসনাগুলোর বাসনা
পর্যন্তই হেঁটে গিয়ে অনেকের মতো ভুলে যেতে
হা ঈশ্বর পারবো না নিজেকে একবারও আর
অশেষ স্তবের সুউঁচু পাহাড়ে বসে ম্রিয়মাণ
অসীম শূন্যতা অবধি কোনও অবয়ব আমি
কোনোদিনও অবলোকন করে নিচে আসতে
চাইনি নেমে কখনো আর সকলের মতো ন্যুব্জ
অসহায় হাঁটু গেড়ে বসে চলৎশক্তিবিহীন
আমি ভুলে যেতে চাই শূন্যতার ছায়াদের আর
দূর বহুদূরের শূন্যতাদের বিশ্বাস করি না
ফিরিয়ে দেবে বলেও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছে যারা
আর ফিরিয়েও দিয়েছে তারা শত সহস্রবার
মৃত্যু হয়েছে যাদের তাদের নিজের গড়া গর্তে
ভাবছি আজ এই ভোরের মাঠে ঘাসের মতোই
শিশিরে ধুয়ে নিয়েই ময়লাক্ত গা মুখের ঘাম আর
পরিত্যক্ত হাসিটি নিজের চলে যেতে চাই আমি
ফিরে পেতে চাই না কখনো একটিবারও তাই
উঠে যাই কে জানে কোথায় সীমানাবিহীন তলে
চেতনার অকূল প্রবাহে ভেসে ভেসে নিঃসঙ্গ
নগন্য সামান্য অতি খড় জলে মিশে তারপর!
ভুলিনি
ভুলিনি ঔদ্ধত্য হিংস্র ঐ বুনো হাতিদের
পাহাড় থেকে সহসা নেমে এসে সমতলে যারা
অবলীলে আমার ফসল নষ্ট করে গেছে,
তাই মনে হয় আজও তাদের দৌরাত্ম্যের
কালো কালো যন্ত্রণার স্মৃতিই গোপনে
নীরবে এসেই দলেপিষে যায় আর
আমার অন্তরে নেমে আসে
কালো আস্তিনের ভাঁজের মতো রাত
যখন আঁধারে দেখাও যায় না কিছু
আগের মতোই যেন বা আলোর সান্নিধ্য হারিয়ে
আবারও আলোর প্রতীক্ষাতেই জেগে সারাক্ষণ
কখনও যেনো বিশ্বস্ত এমন সবুজ মাড়াতে
একবারও আসতে না পারে আর
এখানে বুনো হিংস্র হাতিগুলি!
দেয়াল
আমি তাকে হারিয়েছি জনারণ্যে আর
সকলে দেখেছে জানতোও ব্যাপারটা
মধ্যগগনের সূর্য কারো না দেখার কথা নয়
যারা আড়াল করতো নিজেদের আর
বাইরে এসে দেখাতো না একবারও
কখনো হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে
হয়তো এক হতে দিতো না
বিষয়ের বিষম দেয়াল তুলে দিতো
আমাদের প্রণয়ের মাঝখানে যারা চিরকাল
তাদের সন্মুখে এনে হারিয়ে ফেলেছি আজ তাই
(যদিও ইচ্ছে করে কখনো কেউ হারাতে চায় না)
আর মনে হয় তাকে না দেখেই হারালাম আমি
যদি-বা তার দিকেই সারাক্ষণ তাকিয়েছিলাম।
বিশ্লেষণ
শুনতে পাচ্ছি না রবি শাস্ত্রী যা বলছেন আপনি,
আমার কানে আসে অহেতু
গ্যালারির উচ্ছ্বাসের শব্দ-কলরব;
শুনতে পাচ্ছি না প্রিয় শাস্ত্রী মহোদয়
আপনার প্রত্যেকটা শাস্ত্রীয় বাক্যের অসামান্য বিশ্লেষণ:
বার বার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে আমারই
দাঁড়াতে পারি না এক ঠায়,
আলোর সাথে দূরত্ব বাড়তে দেখেই আপনার।
সমর্পণ
আগুনের কণ্ঠস্বরগুলো আমাকে শুনতে পায়,
ভয় নেই আমারও জলের শরীর;
অভাবিত শিখাগুলি ওই
আগুনের জিভের লালসাদের:
ভিজিয়ে দিতে নেই কোনও কুণ্ঠা নেই।
ভাবি সমর্পণ করবো নিজেকে আগুনের কাছে,
যে রকম সন্ধ্যার কাছেই সমর্পিত হয় সূর্য
ভেবে নিত্য নিজের বিরল অবকাশ;
আগামী কালের নিশ্চিত প্রত্যাবর্তন।
কতোদূরে যাই, চলে আসি
কাছেই ছিলাম এতোকাল
তোমারই চোখের সমুদ্রে
ডুবেছিলাম আনন্দে কতো
সাঁতার কেটে মাছের মতো
ভেসেও ওঠেছি কতোবার
মনে হয়নি একবারও
ফিরে চলে যেতে হবে দূরে
চেনা সমুদ্র ছেড়ে অচেনা
কোন আকাশের অস্তপাড়ে
যেখানে যাই নি কোনোদিন
যাবো বলে করিনি কল্পনা
নমিত তোমার স্পর্শ ফেলে
দুর্বিনীত শহরে কোথাও
পাষাণ প্রাচীরে হবো বন্দী
বিরল নৈকট্য দূরে রেখে
ভাবি নি হবো যে দূরগামী
যে রকম দূরে চলে যায়
কখনো কাছে এসে সময়
পাড়ি দিয়ে দুরুহ বিষম
সে রকম ছেড়ে যেতে হবে
একবারও ভাবেনি মন
সবুজ ছায়া ফেলে রেখে
নিরানন্দে যাবে ফিরে একা
যেখানে নেই সবুজ নেই
শূন্যতায় অন্ধকারে ঢাকা
সনির্বন্ধ তোমার হাসির
সামান্যও নেই শব্দ নেই
মনে হয় গরাদের মতো
আচ্ছন্ন নিঃসঙ্গতা হানে
মর্মে পড়ে এসে কালো ছায়া
মায়াবী তোমাকে একা রেখে
কতোদূরে যাই চলে আসি।























