কামিনী রায়ের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : অক্টোবর ১২, ২০১৯

কবি কামিনী রায়ের আজ ১৫৫তম জন্মদিন। ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) বাকেরগঞ্জের বাসণ্ডা গ্রামে (বর্তমানে যা বরিশাল জেলার অংশ) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছাড়পত্রের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তার পাঁচটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো:

চাহিবে না ফিরে?

পথে দেখে ঘৃণাভরে          কত কেহ গেল সরে
         উপহাস করি কেহ যায় পায়ে ঠেলে;
কেহ বা নিকটে আসি,        বরষি সান্ত্বনারাশি
        ব্যথিতেরে ব্যথা দিয়ে যায় শেষে ফেলে।
পতিত মানব তরে          নাহি কি গো এ সংসারে
       একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার?
পথে পড়ে, অসহায়         পদতলে দলে যায়
       দু’খানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার?
সত্য, দোষে আপনার       চরণ স্খলিত তার;
       তাই তোমাদের পদ উঠিবে ও শিরে?
তাই তার আর্তরবে          সকলে বধির হবে।
      যে যাহার চলে যাবে— চাহিবে না ফিরে?
বর্তিকা লইয়া হাতে          চলেছিল এক সাথে
      পথে নিভে গেল আলো পড়িয়াছে তাই;
তোমরা কি দয়া করে         তুলিবে না হাত ধরে
       অর্ধদণ্ড তার লাগি থামিবে না ভাই?
তোমাদের বাতি দিয়া          প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া
      তোমাদের হাত ধরি হোক অগ্রসর;
পঙ্কমাঝে অন্ধকারে            ফেলে যদি দাও তারে,
       আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর।

এরা যদি জানে

এদেরও তো গড়েছেন নিজে ভগবান,
নবরূপে দিয়েছেন চেতনা ও প্রাণ;
সুখে দুঃখে হাঁসে কাঁদে স্নেহে প্রেমে গৃহ বাঁধে
বিধে শল্যসম হৃদে ঘৃণা অপমান,
জীবন্ত মানুষ এরা মায়ের সন্তান।

এরা যদি আপনারে শেখে সম্মানিতে,
এরা দেশ-ভক্ত রূপে জন্মভূমি-হিতে
মরণে মানিবে ধর্ম বাক্য নহে— দিবে কর্ম;
আলস্য বিলাস আজো ইহাদের চিতে
পারেনি বাঁধিতে বাসা, পথ ভুলাইতে।

এরা হতে পারে দ্বিজ— যদি এরা জানে,
এরা কি সভয় সরি’ রহে ব্যবধানে?
এরা হতে পারে বীর, এরা দিতে পারে শির,
জননীর, ভগিনীর, পত্নীর সম্মানে,
ভবিষ্যের মঙ্গলের স্বপনে ও ধ্যানে।

এরা যদি জানে
উচ্চ কূলে জন্ম বলে কতদিন আর
ভাই বিপ্র রবে তব এই অহংকার?
কৃতান্ত সে কুলীনের রাখে না তো মান,
তার কাছে দ্বিজ শূদ্র পারীয়া সমান।
তার স্পর্শে যেই দিন পঞ্চভূতে দেহ লীন
বাহ্মণে চণ্ডালে রহে কত ব্যবধান?

স্মৃতিচিহ্ন

ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম
মনোহর হর্ম্মরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিয়াছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারিদিকে ভগ্নস্তূপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে!
মানব হৃদয় ভুমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বোঝা জড় করিবার;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ণ কেমন
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্যসমুজ্জ্বল।

কত ভালোবাসি

জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।

“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”

“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”

“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!

পাছে লোকে কিছু বলে

করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।

হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।