গুলজারের কবিতা
অনুবাদ: সঙ্গীতা দাশপ্রকাশিত : এপ্রিল ১২, ২০১৯
নীম রাণা
এই বিল্ডিং এ ব্লকগুলোকে যদি উপর নীচে সাজিয়ে
জুড়ে দেয়া হয় উঁচু নিচু সিঁড়ি, তবে
নীম রাণার কেল্লা তৈরি হবে।
কিছু কিছু সিঁড়ি তিড়িংবিড়িং লাফায়, চড়ুই যেন
নীচে উপরে লাফাতে থাকে সব যেমন
এ গলি সে গলি জুড়ে দেয়, মিলিয়ে দেয়
এ উঠোন সে উঠোন।
রাণা যখন বেঁচে ছিলেন, এখানে বাস করতেন,
উপরে নীচে দাঁড়িয়ে থাকত মোসাহেব দল
ঢাল তলোয়ার নিয়ে,
যেমন দাবার চালে দাঁড়িয়ে থাকে বোড়ে।
যখন রাণা তলব করতেন, অথবা ডেকে পাঠাতেন রানী,
বোড়ে আপনি চালে উপস্থিত হতো। অন্য ঘরে
দাঁড়িয়ে থাকত হুঁকোর মতো সটান।
প্রতীক্ষায় থাকত— পরবর্তী ফুঁয়ে যেন ধোঁয়া বেরোয়,
আবার কোনো হুকুম জারি হয়।
কেল্লার উপরে দুটি কামান
যেন রাণার সদ্য পাকানো গোঁফ
সাজিয়ে রেখেছেন প্রজা শাসনের উদ্দেশ্যে।
বড় চিত্তাকর্ষক লাগে এই ব্লকগুলোতে ইতিহাস প্রবিষ্ট করে,
তার অলিগলিতে নিজের পা রাখতে, আর হাঁটতে;
তার আতরদানের নীচে শুয়ে পড়তে,
আর বন্ধ চোখে বিলীন স্বপ্ন ভরতে।
এখন কেল্লার আড়ালে এটি একটি হোটেল।
নাচঘর— যা অধিক রাত অবধি অলোকিত থাকত আগে
এখন ডিনারের সময় আমরা প্রায়ই
মোমবাতি অধ্যুষিত টেবিলে বসি
ঠুমরী শুনি রেকর্ডে
আর রাতজাগা মথ নেচে ফেরে!
পাথরের উপর পাথর
পাথরের উপর পাথর রেখে
একটা বাড়ি উপরে ওঠার চেষ্টা করছে খুব।
পাশের ছাদে কনুই রেখেছে,
যদি আকাশের একটি কোনা দেখতে পায়!
আর এক বিল্ডিং
সটান দাঁড়িয়ে সামনে।
ওর পিঠের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে এক ইমারত
উপরে ওঠার চেষ্টায়, হাঁটু মুড়ে বসেছে।
স্টীলের গার্ডার পরছে।
বাঁ দিকের বিল্ডিংয়ের উচ্চতা ওর চেয়ে কম।
কিন্তু পরের ছাদেই তো দাঁড়িয়ে মিনারের দল,
চিমনির মতোই তো মনে হচ্ছে।
এদিকে একটা হোর্ডিং আলোর পোশাকে
চকমকাচ্ছে সারাক্ষণ।
নীচে তাকালে দেখতে পাবে গাড়ি আর গাড়ি।
একে অপরের পায়ের ওপর পা দিয়ে
লাফিয়ে, ডিঙিয়ে চলেছে লোক।
দু’গজ ফাঁকা জায়গাও যদি পাওয়া যেত কোথাও
চোখ মেলে সামনে তাকাবে, এটুকু জায়গা তো থাকুক!
আকাশের এক কোনা যদি দেখতে পায়!
একটা বাড়ি উপরে ওঠার চেষ্টা করছে।
কবি পরিচিতি: সম্পূরণ সিং কালরা। পৃথিবী তাকে গুলজার নামে চেনে। শিখ-পরিবারে জন্মেছেন ১৯৩৬, মতান্তরে ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট দিনায় (ব্রিটিশ ভারতের ঝিলম জেলা, বর্তমানে যেটা পাকিস্তানে অবস্থিত)। দেশত্যাগের সময়ে তার পরিবারকে চলে আসতে হয় দিল্লির রওশন আরা বাগে। সেখানে ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করেন তিনি। বম্বের (মুম্বাই) খালসা কলেজ এবং ন্যাশনাল কলেজ কম্বেতে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন বিদায় জানান প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াকে। সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং অসীম ক্ষুধা তাকে ঈর্ষণীয় পাঠকে পরিণত করে। পরে চলচিত্রের বর্ণাঢ্য জগতে তার কৃতীয় অবদানের জন্যে সকলেই তাকে চেনেন কখনো গীতিকার, কখনো চিত্রনাট্য রচয়িতা, কখনো চলচ্চিত্র-নির্মাতা হিসেবে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি কবি গুলজার। কবিতায় যিনি প্রতিদিন বেঁচে ওঠেন– ভাব ও ভাবনার অনির্ণীত জগৎ যার কবিতার কোমল সংঘাতে পাঠকের কাছে উন্মোচিত হতে থাকে নব-নব রূপে। তা দুটি কবিতা অনুবাদ করেছেন তরুণ কবিত সঙ্গীতা দাশ।























