গৌতম কৈরীর কবিতা ‘মানবের পদচিহ্ন’

প্রকাশিত : মে ০৩, ২০১৯

এক.
গায়ে রোদ মাখতে মাখতে মৃত নদীটির গায়ে হলুদ আলো ছুঁড়ে মারে নীহার।
পথের কবিতা, পড়ে থাকে পথেই।
ঢেউ এলে নৌকায় পাল তুলবে ভানুকাকা।
সে গল্প বর্ষার যৌবনে ফুল হয়ে ফুটবে।
ভীষণ কৌতুকপ্রিয় লাল চায়ের চুমুকে খালি দুপুর ক্রমে জড়ায়।
ছড়ায় মানবের পদচিহ্ন নদী ও নারী।
যে পৃষ্ঠায় তার নাম লেখা, তারে কেমনে ছাড়ি।
অপর পৃষ্ঠায় গৌতম, মেঘ সরায়।
নির্জন মেঘের নিচে বসে
রামকিংকর বলেন, কোনো সীমা নেই। এখানেই শেষ এখানেই গোড়া।

দুই.
মৃতের সংখ্যার উপর বাজি ধরছে রাষ্ট্র।
ক্যাসিনো টেবিল থেকে ধর্মশালা,
আইয়ামে জাহেলিয়াত থেকে হলি আর্টিজান
চাপা চাপা রক্তের নিচে চাপা পড়েছে ঈশ্বরের বাণী।
কারো মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।
হারমোনিকা হাতে নিয়ে আগুনে মরে গ্যালো হিমালয়।
কুকুরের পাশে শুয়ে যে ঘাসের মানচিত্র আঁকতো আকাশে।
বাতায়ন খুলে দিলে দেখবে,
পৃথিবীর আকাশে ঘাস নেই, নীল নেই, কেবল রক্ত পোড়া ধোঁয়া।
পৃথিবীর মাটিতে ঈশ্বর নেই, প্রেম নেই, কেবল ঝলসানো চোখ।
প্যারা নাই, বলে হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে আগুনে মরে গ্যালো হিমু
কত সহজে মরে যায় মানুষ
কত সহজে মারা যায় মানুষ।

তিন.
ঘটনাচক্রে আমরা একসাথে হলাম।
হাসির ছলে একটা রক্তাক্ত ঘটনা বলে ফেলি আমরা নির্দ্বিধায়।
আমাদের বিস্মিত আত্মায় কোনো আর্তনাদ নেই।
গভীর ক্ষত কোথায় যেন, কোন প্রবাহে হারিয়ে যায়।
জবাফুল আর ফোটে না গাছটায়,
গ্রীষ্মের বাতাসে অস্থির লাগে,
অস্থিরতা বেড়ে গেলে আমরা ব্রীজটার উপর হাজির হই।
আমাদের যৌথজীবনের সংলাপ ক্রমে লাশ হয়ে ভাসতে থাকে...
মনে মনে আর কত লুকাবো অন্তর্গত প্রাণ।

ঘটনাচক্রে আমরা এক হতে পারি না আর
এক হয়েও বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি বিচ্ছন্ন দ্বীপের মতন।

চার.
যে সকল সকাল বিলুপ্ত, তাদের কেন মনে পড়ে বারবার?
তুলা গাছের শরীরে লেখা ছিল পূর্বপুরুষের ভ্রমণকাহিনি।
আমরা উত্তরাধিকার হয়ে ভাসিয়ে রাখতে পারিনি—
পেঁজা তুলার মতো শরীর।
...অপচয়।
পদচিহ্ন করিনি সঞ্চয়।
বলেছি— আমার
বলেছি— আমি
যেদিন থেকে ‘আমার’ বলা শুরু; সেদিন থেকেই টুকরো হলো সকাল।
খেতের মধ্যে আল।
পৃথিবীর সকল বাগান সবার জন্য, এই ছিল ঈশ্বরের বাণী।

ঈশ্বরকে গৃহবন্দি করে, ঠুনকো অনুভূতি করেছি আমদানি।
জ্যোছনায় জল নেই, শুকিয়ে মরুভূমি।

মরুভূমির মাঝে একটা সূর্যমূখি বাগান।
এক বিষণ্ণ কচ্ছপের যাত্রা বিরতি
বৃষ্টির দিন কবে আসবে প্রকৃতি?

কবি পরিচিতি: গৌতম কৌরীর জন্ম ৯ আগস্ট ১৯৮৪, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। অদম্য ভ্রমণের নেশা এবং একইসঙ্গে ঘরকুনো। লেখালেখিতে আত্মপ্রকাশ প্রথম দশকে। প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘অপর পৃষ্ঠাই দ্রষ্টব্য’ ২০০৬ সালে। ২০১৭ সালে প্রকাশ হয় দ্বিতীয় কবিতার বই ‘দৃশ্যের ভেতর দিয়ে যাই’। সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘ঘুড্ডি’। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।

নিজের লেখা ও পরিচালনায় ছোট ছবি ‘রংপেনসিল’ দিয়ে নির্মাণযাত্রা শুরু। ২০১১ সালে নির্মাণ করেন প্রথম টিভি নাটক ‘একটি গল্পের চিত্রনাট্য’। উল্লেখযোগ্য নির্মাণ— কফিন কারিগর, বিশাল রুপালি পর্দা, অথবা রোদের মতো, কাগজের ক্যামেরা, কেন মেঘ আসে, হ্যালো ইয়েলো, বেনীআসহকলা, চন্দ্রবিন্দু, ৫ বছর ৭ মাস ২ দিন, সুবর্ণরেখার বাঁশিওয়ালা, অসময়ের লিরিক, এক যে ছিল গল্প, ফড়িংজীবন, বারান্দায় নয়নতারা, আবারো তোমার গল্প, শেষটা একটু অন্যরকম।