তবুও ফিরে এসো

শাহরুখ পিকলু

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৯

১২ই ফেব্রুয়ারি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন, বেঁচে থাকলে বয়স হতো মধ্য-সত্তর, মারা গেছেন ৫৪ ছুঁই ছুঁই (নব্বই দশকের মাঝামাঝি)। অকালে চলে গেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমার স্বল্প পড়ালেখার উপর সাহস করে এটা বলতে পারি যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু`টি উপন্যাসের রচয়িতা তিনি- `চিলেকোঠার সেপাই` আর `খোয়াবনামা`। ওনার ছোট গল্পগুলোও অত্যন্ত ক্ষুরধার। উনি যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কত কাছাকাছি ছিলেন, তাদের সংস্কৃতিকে এতই প্রবলভাবে ধারণ করেছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর ছোট গল্পগুলোতে। বাম ভাবধারায় বিশ্বাসি ইলিয়াস যে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ ও পত্তনকালীন আদর্শ থেকে সেদেশের স্খলনে অত্যন্ত ব্যথিত ছিলেন তা তাঁর লেখায় ফুটেছে বার বার। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ ইলিয়াসের উপর লেখা স্মরণীতে লিখেছেন - "চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে কৃষককর্মী চেংটু নিহত হয়, মিছিল সভা সমাবেশ দখল হয়ে যায়, হাড্ডি খিজির বুকে গুলি খায়। কিন্তু এখানেই তো জগৎ শেষ হয় না। চেংটু, খিজির থেকে যায় কোথাও না কোথাও। খোয়াবনামায় ব্রিটিশদের হাতে গুলি খাওয়া মুন্সী যেভাবে পাকুড়গাছে গিয়ে বসে, তার মরণ হয় না। তেভাগা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কিন্তু তমিজ তার ডাকেই অনির্দিষ্ট পথে পা বাড়ায়। ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিয়ে শক্ত মাটির ওপর দাঁড়ায় তমিজ-ফুলজানের মেয়ে সখিনা। সামরিক শাসন ভেঙে বুকে গুলি নিয়ে হাড্ডি খিজির যখন রাস্তায়, তখন দেখা-অদেখা অসংখ্য মানুষের মিছিল মুক্তির এক প্রবল মানবিক স্রোত তৈরি করে।"

 

আমি ইলিয়াসকে নিয়ে একটা কবিতা লেখার দুঃসাহস করেছিলাম কয়েক বছর আগে, খোয়াবনামা পড়া শেষ করে।

 

ইলিয়াস বন্দনা

চুয়ান্ন কি পঞ্চান্ন-

সে কোন মরার বয়স হলো?

আজকের বুড়ো গর্দভগুলো আশির উপরে বেঁচে থাকে,

সাত সকালে এক নামাজ হাঁকিয়ে

সারা সকাল পড়ে পড়ে ঘুমায়-

চুরির পয়সায় হজ্ব করে

হালুয়া রুটি খেয়ে কিডনির বিনাশ করে

তাও খেয়েই চলে চিনি দেওয়া রসের মালাই

কিন্তু কিন্তু কিন্তু, মাগো

ইলিয়াসের পাটা যে কাটা পড়লো।

 

 

খোয়াবনামার তমিজের বাপ বা

চিলেকোঠার সেই পাগলা সেপাই

ইংরেজি আওড়ানো বামপন্থি

যে কিনা বুলেটের ভয়ে কাতর-

সম্মুখ যুদ্ধে নেই কিন্তু

মদ আর বিরিয়ানির আসরে বিভোর।

সেই রিকশা মেকানিক-

প্লাস আর স্ক্রু-ডাইভার অস্ত্র তার;

গলায় উচ্চকিত হুঙ্কার-

আইউবের মায়রে চুদি বা

ইহায়িয়ার মায়রে বাপ।

নিজের সন্তান নেই তাও

বউয়ের সন্তানকে ভালোবাসে,

গুলি খেয়ে মরে থাকে রাস্তার মোড়ে।

মরুকগা হালায় নপুংশক

কার কি এসে যায়।

 

 

ঐযে তেভাগার লোভ দেখিয়েছিলো

জিন্নাহর নাম ভাঙ্গিয়ে-

সব শালা বেঈমান।

সাতচল্লিশ বা একাত্তরের পরেও

সেই একই শোষণ-

শ্রেণী ভেদ রইলো বহাল,

অস্ত্রের বিপরীতে আরো বড় অস্ত্র।

 

সেই দুঃখেই কী এই পচন-

অভিমান করে চলে গেলে

হে ক্ষণজন্মা ইলিয়াস।

 

 

তোমার শেষ উপন্যাসের পাতাগুলো

যে সব হলুদ হয়ে গেলো,

কিন্তু যে দেশের জন্য তুমি

প্রাণাতিপাত করেছিলে

সেথায় এখন রাক্ষশ জন্মেছে আরো বেশি।

তারা পয়সার দম্ভে মানুষকে গাড়ি চাপা দেয়

মদ্যপ হয়ে রঙ-রস করে, গুলি চালায়

গ্রামের পথে হেঁটে যাওয়া নিরীহ বালককে

বা নিজেই গুলি খেয়ে ড্রেনের পানিতে স্নান করে।

তদন্ত হবে- সব শালাকে ধরা হবে চব্বিশ ঘন্টায়

হয়না চব্বিশ মাসেও, বছরেও।

শামসুর রহমানের উটটা যেন পিছু ছাড়বে না কোনদিন।

 

 

জেগে ওঠো ইলিয়াস, জাগো

তোমার জেদ নিয়ে-

সব শালা খানকি মাগীর পুত বলে

আলুবাজারের ভাষায় গাইল পাড়ো,

এদেশের যে তোমায় বড় দরকার ছিলো আজ।

 

 

তুমি ঘুমিয়ে থাকলে

কে আমাদের খিজির আলির হুঙ্কার শোনাবে

কেমনে চিনবো ধূর্ত রিকশার মালিককে-

চিলেকোঠার সৈনিক কী আজও পাগলামি করবে?

তমিজের বাপ কী মুন্সিকে ছেড়ে সাধারন হয়ে যাবে?

তমিজের রক্ত কী ঠান্ডা হয়ে যাবে?

জেগে ওঠো ইলিয়াস, আর ঘুমিয়ো না-

ঐ ল্যাংড়া পা নিয়েই কলম ধরো,

ক্যান্সারে পচে যাওয়া পায়ের ব্যথা দিয়ে

সমাজের ক্যান্সারকে তুলে ধরো,

আধ-মরাদের শেষ একটা ঘা দাও

উঠে এসো ইলিয়াস।

 

 

তোমার পুরান ঢাকায় যে এখন

বাংরেজি রেডিও বাজে-

দরবার হোটেলে আর রেডিও

সিলোনের গান বাজে না।

তোমার সেই স্বপ্নে দ্যাখা দেশটার

পরিণাম দেখলে আজ

তুমি বলতে গণতন্ত্র না আমার লেউড়া।

আজ লেউড়াকে মানুষ বলে শিশ্ন-

ছোটলোকের ভাষা ছোটলোকই ভুলতে বসেছে,

সংস্কৃতি হিজাবের আগুনে পুড়ছে।

ছিড়ে দাও, টুকরো টুকরো করে দাও

তাই ফিরে এসো ইলিয়াস

সে তোমার প্রেতাত্মাই হোক,

তবুও ফিরে এসো।