নবারুণ ভট্টাচার্যের ৫ কবিতা

স্মরণ

প্রকাশিত : জুন ২৩, ২০১৯

কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের আজ জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মারা যান ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই। তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৭) ও বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৬) গ্রহণ করেছেন। হারবার্ট, কাঙ্গাল মালসাট ইত্যাদি তার বিখ্যাত উপন্যাস। তিনি লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী এবং নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র। তার পাঁচটি কবিতা পুনর্মুদ্রণ করে তাকে স্মরণ করছি—

নৈরাজ্য

পাতালে করেছি পাতার সঙ্গে সন্ধি
ঝড়ের সঙ্গে হাত বাঁধা হাতকড়ায়
ভেবেছে জীবন ভিডিও ক্যাসেটে বন্ধি
দ্যাখো না রক্ত কতদূর আরও গড়ায়

হয়তো হাঁটছি নৈরাজ্যের পথেই
দুপাশে ফুঁসছে ক্রুদ্ধ সাগর অথৈ

পৃথিবীর ঘুড়ি ডানদিকে টাল খেলে
হৃদয় কিন্তু বুকেরই বাঁদিকে থাকে
সেখানে এখনও পাওয়া যাবে আলো জ্বেলে
জেলখানা থেকে লেখা চিঠিগুলো মা’কে

যা কিছু ঘটছে সহসা তা হবে তুচ্ছ
এক লহমায় উড়ে যাবে তাস-বাড়ি
শেয়াল শুকন যতই নাচাক পুচ্ছ
কোটি কোটি হাত খুঁজে পাবে তরবারি

কবিদের সঙ্গে আলাপ

এরকম কবিতা লেখো কেন
যা থরথর করে কাঁপে
ও মরতে ভয় পায়

বৃষ্টির সবকটা তীরে
বিষ মাখিয়ে দিচ্ছে চাঁদ
তোমার জন্যে

কাঁটা চামচের চারটে ফলা
তোমার হাঁ-এর মধ্যে এগোচ্ছে
শুধুই ফিরে আসবে বলে ?

এই যখন আয়োজন
তখন কী ছাতামাথা ভাবো

আর কবিতা লিখেই চলো
যাদের মরে যেতে এত ভয়
যে কেবল থরথর করে কাঁপে

কুকুরকোলা

সাম্য এসেছে নির্বিঘ্নে
কারণ সকলেই কোকাকোলা খায়
শোনা যাচ্ছে কুকুরদের জন্যে
কুকুরকোলাও চালু হতে চলেছে

উন্মাদাগার বলে কিছু নেই
গণিকা বা সমকামী বলে কিছু নেই
এইডস বিনিময়ের মহোৎসবেেএক অখন্ড মানবজাতি গড়ে উঠেছে
সামাণ্য এসেছে নির্বিঘ্নে

বৃদ্ধদের পপ-গ্রুপ
বৃদ্ধাদের মিনি স্কার্ট পরা উল্লাস
সকলেই জিনস পরছে
সকলের পায়েই নাইকি অ্যাডিডাসের জুতো
সবাই আত্মরক্ষার জন্যে ক্যারাটে শিখে নিয়েছে
প্রত্যেকের বাড়ি ও গাড়িতে আর. ডি. এক্স
মজুত রয়েছে

সকলেই কেবল টিভির ব্লু-ফ্লিম দেখে
সকলেই শেয়ার কেনে, শেয়ারে বউ বাচ্চাও পায়
সকলেই আর কারোর নাম জানে না
সকলেরই কোন নাম নেই
কিন্তু সকলেরই ফ্যাক্স, ফোন, ক্রেডিট কার্ডের নম্বর আছে

সাম্য এসেছে নির্বিঘ্নে
কারণ সকলেই কোকাকোলা খায়
শোনা যাচ্ছে কুকুরদের জন্যে
কুকুরকোলাও চালু হতে চলেছে

ভাগ্যহীন শহর

এই শহরের ভাগ্যে এমন একটা দিন আছে
যেদিন তোমার আর আমার ছাই
দুজনের শেষ নিশ্বাসে ভর করে উড়বে
অথচ ভাগ্যহীন শহর সেটা বুঝতে পারবে না
আমাদের ঠোঁট, চোখ, আঙুল
নিজেদের জন্যে নিজেদের যে চেনা শরীর
যতটা জায়গা নিয়েছিল
হয়তো সেই জায়গাতেই তৈরি হবে বাড়ি,
ট্রাফিক সিগন্যাল অথবা কোনো কাঠামো
একথা ভাবলে আমার উপহাস করতে ইচ্ছে হয়
শহর, কলকাতা শহর
দুপায়ে কম মাড়াইনি তোমায়
দেখেছি আশ্চর্য দৃশ্য
লোডশেডিংয়ে তুমি যখন অন্ধ
তখন আলো জ্বলা অ্যাকোয়ারিয়ামের মতো
ট্রাম চলছে
রোদ্দুরে ক্ষমাময় বাজছে কুষ্ঠরোগীর বাজনা
তারও ঠোঁট, চোখ ও আঙুল ছিল

ভাগ্যহীন শহর
আমরা তোমাকে অভিশপ্ত করে রাখব
শুধু তুমি সেটা বুঝতে পারবে না

লড়াই যখন হবেই

কে কে সুইস ব্যাঙ্কে টাকা রেখেছ
হাত তোলো
কারা কারা ভালোবাসতে ভুলে গেছ
হাত তোলো
কার কার হাতে কড়ার তলায় ভাগ্যরেখা লুকিয়ে পড়েছে
হাত তোলো
ঘাসের আঙুল দিয়ে কারা শিশির জরিয়েছ
হাত তোলো
গণহত্যার জন্য যারা দায়ী
হাত তোলো
যে প্রজাপতি ধরতে পারো ডানা না-ভেঙ্গে
সেও হাত তোলো
আর যে রেঞ্জ দিয়ে মরচে পড়া নাটবল্টুকে খোলো
সে তো হাত উছিয়ে আছে

পাপী ও নিস্পাপ
শোষক ও শোষিত
আমাদের একটা অ-নিউক্লিয়র জায়গা চাই
লড়াই যখন হবে তখন মানবিক ভাবেই হোক।