নভেরা হোসেনের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : জুলাই ২৮, ২০১৯
হৃদযন্ত্র
তোমার ঘরের পাশেই আরেকটি ঘর
তার পাশে আরেকটি
তার পাশে আরেকটি
দালানের ফুসফুস গলে রক্ত ঝরছে
তোমরা ভাবছো তোমাদেরই শুধু ফুসফুস আছে
হৃদয়বান শুধু তোমরাই হতে পারো
প্রতিটি ইট-কাঠ, বৃক্ষ-লতা, নদী, সাগর
তারাও তো তোমার মতো বাঁচতে চেয়েছিল
কারখানার রঙিন জলে তাদেরকে করে তুলেছো মৃত্যু-পথযাত্রী
ইটভাঁটার চিমনির ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে সমস্ত আকাশ
এখন সময় হয়েছে
তোমার চোখ উপরে নেয়ার
ধর থেকে মাথা আলাদা করার
কিলোমিটার জুড়ে ইমারতের সারি
তারা আজ সকলেই মৃত
তোমরা যারা ওখানে বাস করো
তারাও কি মৃত—
তোমাদেরও কি আছে একজোড়া হৃদয়যন্ত্র?
বিস্মৃতি
একগুচ্ছ কান্না তোমার জন্য জমা রইল
জারুলের গন্ধহীন স্মৃতি
ধোঁয়া ওঠা টম-ইয়্যাম স্যুপ—
হৃদয় বিদীর্ণ করেছে হৃদয়কে
করতলে উটের হ্রস্ব গ্রীবা,
প্রিয় জয়তুন ফল
তোমাকেও ছুঁড়ে ফেলি
পূর্ণিমার রাতে
প্রিয় মালাকাইটের ঝাঁপি
তোমাকেও ভুলে যাই
ভুলে যাব বলে
ত্রিভূজ সন্ধ্যা
এক.
বনগাঁর পথ ছাড়ল ট্রেন
দু’ধারে চলিষ্ণু বৃক্ষ
সন্ধ্যার ফানুস আকাশে তারা জ্বালছে
আনুবিশ, শেয়ালমুখো দেবতা
শির ম্যাথম্যাটিক্সের লেডি
মাথা খুঁড়ছে কাচের দেয়ালে
আচানক বাস ট্রাম
কিউবেলা কিউবেলা
শুভরাত্রি হার্মাসিস
শুভরাত্রি এরেন্দিরা
দুই.
ঘড়িতে সন্ধে সাত
আরো দু’ঘণ্টা আগে তুমি ছিলে
দু’ঘণ্টা পরেও
একদা সেখানে ছিল নীরবতা
এখনও রাত ঘন হয়ে ওঠেনি
শব্দহীন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে
একমাত্র নিঃশব্দরা
সবুজ আলো একটা জ্বলছিল
নিভছিল তারও আগে...
তিন.
সকাল দশটায় একটা ট্রেন
রাত এগারোতে আরেকটা
ভোর চারটায় শাটল ট্রেন
ইভনিং-এ তূর্ণানিশিথা
কোনো ট্রেন ঢাকার পথে ছাড়ছে না
সব চলছে উত্তরে
শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি
জয়পুরহাট, সৈয়দপুর
কোনো পাখি উড়ছে না আকাশে
ছেঁড়া পাখনায় তুলোর গন্ধ
কোনো সন্ধ্যা আলো জ্বালছে না
শীতল ঘরে জোড়া অক্টোপাস
কোনো কথা তুমি বলছ না
পাঁজরে নীল ধুতরা
সন্ধে সাতে একটা ট্রেন
রাত এগারোতে আরেকটা
সরেনটুডু
সরেনটুডু ধান কাটতে গেল
চারদিক প্রাচীরঘেরা
বড়বড় লোহার শিক
সরেন কিছুতেই প্রাচীর ডিঙোতে পারে না
ঝাঁকে-ঝাঁকে তীর-ধনুক
সাঁওতাল পাড়ার বউরা জেগেছে
মেয়েরা লাঠিতে শান দিচ্ছে
একটা অদৃশ্য দেয়াল তাদের ধান কাটতে দিচ্ছে না
দূর থেকে গুলি এলো
সরেনটুডু মাটিতে লুটিয়ে পড়ল
ঘর পুড়ল, দোর পুড়ল
গরু-বাছুর সব গেল
ক্ষেতের ফসল বেবাক কাইটা নিলো
সরেনের বউ ঘরের দরজায় বিলাপ করে
একটা চাউলের বস্তা নিয়ে রিলিফের লোকেরা হাজির
তেল, নুন, কম্বল
এইসব জোড়াতালি দিয়ে কতকাল আর
সেরেনদের মুখ বন্ধ রাখা যাবে?
ঘরে ঘরে মানুষ জেগেছে
মেয়েরা দায়ে শান দিচ্ছে
ছেলেরা ধনুক বানাচ্ছে
সরেনটুডু জেগে উঠছে...
মুখোশ
শো শো বাতাস বইছে। সারাদিনের কড়া রোডের পর চারদিক থেকে ঝড়ো হাওয়া ছুটে এলো। শাহবাগের রোড-লাইটগুলো জ্বলতে শুরু করেছে, পাবলিক লাইব্রেরিতে অনেক লোক, তাদের চোখে-মুখে আনন্দ চিহ্ন, মুখে উৎসবের রং মেখে ঘুরছে সবাই। তুমি কাউকে চিনতে পারছো না, সবার মুখে একই ধরনের মুখোশ, হলুদের মধ্যে কালো ডোরাকাটা, মাথায় ময়ূরের পালক আর সকলের কোমর থেকে নিচ অব্দি সজারুর কাঁটার মতো গাঁথা। একজন মুখোশওয়ালা তোমার পিছন পিছন ঘুরছে, তার পিছনে আরেকজন। তার পেছনে আরেকজন। পুরো এলাকা জুড়ে ঘন বর্ষণ শুরু হলো, সকলের মুখের রং ধুয়ে যাচ্ছে, গা থেকে খসে পড়ছে সজারুর কাঁটা। তুমি চোখ ঢেকে দৌড়ে চলে এলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে। স্ক্রিনের পুরোটা জুড়ে পুরনো আমলের বেনারসি শাড়ি। তোমার হাত ধরে বসে আছে অশোকনগরের ছেলে। একটা মৃদু সুগন্ধ। তোমরা জলে ভাসছো, চারদিকে নীল-পদ্ম, আমাজান লিলি, শালুক। একটা নাচের ঘূর্ণন জলে, ফরাসি চিত্রকর লা দু মালের পেইন্টিং শোভা পাচ্ছে জলের ফ্রেমে।























