‘নীলিমা খাতুন’ থেকে পাঁচটি কবিতা
আবু তাহের সরফরাজপ্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে কবি ও কথাসাহিত্যিক আবু তাহের সরফরাজের কবিতার বই ‘নীলিমা খাতুন’। বৈভব থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ করেছেন তানভীর মাহমুদ গাজী। ৮০ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৫০ টাকা। বইমেলায় বইটি মিলছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৈভবের ৪২২ নম্বর স্টলে।
‘নীলিমা খাতুন’ এর কবিতাগুলো মূলত প্রেমের। কী রকম প্রেম? আবু তাহের সরফরাজ বলেন, “মানুষ বেঁচে থাকে সৌন্দর্যতৃষ্ণা নিয়ে। এর মানে, যার ভেতর সৌন্দর্যতৃষ্ণা নেই, তার ভেতর বাঁচারও কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। পুরুষের চোখে নারী এরকমই একটি সৌন্দর্য, যার টানে পুরুষ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু নারীর শরীর খুঁড়ে শেষমেষ পুরুষ হতাশ হয়। তার মনে হয়, যে সুন্দরের খোঁজে সে নেমেছিল নারীর ভেতর, তা তো মিলল না!”
তবে সে সৌন্দর্য কোথায় থাকে? এ প্রশ্ন চিরন্তন। চলুন পাঠক, ‘নীলিমা খাতুন’ থেকে পাঁচটি কবিতা পড়ে নেয়া যাক—
নীলিমা খাতুন
এক.
নীলিমা খাতুন ছুরি শানাচ্ছে খুন হতে হবে এবার
রক্তের কোষে মেধা আর বোধে ঢেউ তুলবে না সে আর।
খড়কুটো কিছু ঠোঁটে তুলে এনে তৈরি করেছি ঘর
শানিত ছুরির অগ্নিচ্ছটায় পুড়তেছে সেই খড়।
নীলিমা খাতুন আদিমতা বোঝে নীলিমা খাতুন ভালো
আড়াল থাকে না খুনের দৃশ্যে পরদা হলেও কালো।
নীলিমা খাতুন বস্তুত বিবি হাওয়া
গন্ধম তার শেষ হয়ে গেছে খাওয়া
আদমের প্রাণ তাই তার হাতে
থত্থর কাঁপে কুয়াশার রাতে...
নীলিমা খাতুন কুয়াশার নিচে
ছুরিতে দিচ্ছে শান
আর আমি ভয়ে, আর শীৎকারে
ডেকে উঠি, বিবিজান।
আদম হাওয়া
হাওয়া বিবি হাওয়া বিবি... ডাকছে আদম
যেন তা কাতরতা, সৃষ্টি মাতম।
জ্ঞানফল কার্যত দেহ অনুভূতি
দেহে তবু রুহ থাকে, একী বিচ্যুতি!
ইবলিস খিকখিক হাসতেছে দূরে
আদম নাচতে থাকে হাতপা ছুড়ে।
বলছে সে বিড়বিড়, ধেই ধেই ধিন তা
সুন্দর ছাড়া আর নেই কোনো চিন্তা।
এই ঘোরে হাওয়া বিবি
গান গায় হাবিজাবি
আর তার আদমের হাত
ধরে রাখে আলতো
তুলতুলে গালতো
এভাবেই কেটে যায় রাত।
রাত শেষে ভোর হয় অসীমের শূন্যে
গান গেয়ে ওঠে হাওয়া আদমের জন্যে।
নিষিদ্ধ ফল
সুন্দর নাকি আদিপাপ প্রভু? বহন করে যা দেহ
গন্ধম ফল কার্যত জ্ঞান শুরু হলো সন্দেহ।
দেহে দেহে তাই কাঁপুনি ছড়ায় বস্তুত বিদ্যুৎ
সুন্দর যেন দেহের তন্তু কেঁপে ওঠে অদ্ভুত।
ধকধক করে হৃদের পিণ্ড কাঁপে দেহ জলাশয়
গন্ধম খেয়ে ফেলেছিস বলে জীবদেহ পরিচয়।
তাড়না তো কাঁপে গন্ধম খাবে রজঃনিসৃত খুন
শীৎকারে তাই চেটেপুটে খায় মন্থনজাত নুন।
দুধে আলতায় দেহ খোলতায় ভেতরে মুগ্ধ নদী
তীব্র জোয়ারে ভেঙে পড়ে ঢেউ জৈব তাড়নার গতি।
আবার ভাটায় ঢেউ নেমে যায় দেহে আসে স্থিতি
ঢেউহীন নদী বয়ে যেত যদি তবে কারে কিস দিতি?
নদী যা শেখায় আদি সেই ভাষা বিলুপ্ত আজ ভবে
পৃথিবীর নদী ভাষাহীন তাই দেহ আজ ভাষা হবে।
দেহ নিয়ে নদী
নদী নিয়ে দেহ
বারবার তবু
কেন সন্দেহ?
নুনের পুতুল গলে যায় দেহে লীন হয় শূককীট
সুন্দর যদি পাপ তবে প্রভু দেহে কেন দিলে লিক?
দণ্ড লইয়া দণ্ডিত কেন আদম?
গ্রহ থেকে গ্রহে শুনতেছি তাই মাতম
সুন্দর যা যা ইবলিস তা তা সাজিয়ে-গুছিয়ে আরও
সুন্দর করে আদমের চোখে কেন তা বলতে পারো?
ঘটনা তো আদি এবং অনাদি বিভাজিত দুই কোষ
নিউট্রন আর প্রোটন মিলিলে আর কারে দিই দোষ!
হে ভণ্ড রে ভণ্ড
হে ভণ্ড রে ভণ্ড আমারই অণ্ডকোষ
আমারই অচেনা লাগে, তোমার কী আর দোষ!
তুমি তো ভবের মাঠে আমারই হে সাথে
চোখে চোখ রেখে হাত রেখেছিলে হাতে
কেঁপেছিল কাতরতা, বলেছিলে তুমি
পেরিয়ে এলাম নদী, আর নি¤œভূমি।
এরপর বলেছিলে হে ভণ্ড মোর,
আমি তো বসেই আছি
ফুটুক এবার ভোর।
ভোর হলো দোর খুলে এলে তাই তুমি
তোমাতেই লীন হয়ে চুমু খেলো রুমি।
রুমিকে চেনো তো হে, কবি মওলানা
চুপচাপ বসে কেন? কিছু কইলা না।
শেষমেষ কইলা দু’করতল তুলে
মোনাজাত যেন তা, এই ভবকূলে।
সর্বসত্ত্ব দেহে সংরক্ষিত
থত্থর কেঁপে ওঠা ওম শান্তি তো।
হে ভণ্ড রে ভণ্ড কেন তবে আর
আরেক প্রেমিককে ভাগ দিস তার?
সে কী তোকে নদীতীরে
চুমু খেলো ধীরে ধীরে?
এই নদী ছিল তোর, আর শুধু আমার
গোধূলির রঙে আঁকা যৌথ খামার।
হে ভণ্ড রে ভণ্ড আমারই অণ্ডকোষ
সুন্দরে নত, এটি আমারই মুদ্রাদোষ।
প্রলুব্ধমোহন বাগচি
প্রলুব্ধমোহন বাগচি
আমি, তোমার ছবিই আঁকছি
জলরঙে ঝিমধরা আঁকছি দুপুর
মাঠ পাড়ি দিয়ে আমি গিয়েছি সুদূর
সুদূরের নীলরঙে নীলিমার দেহ
ছবি হয়ে দুলতেছে, তবু সন্দেহ
দেহ চিরে ভাগ করে, তবু হে আমি
চিরে যেতে চাই ওগো অন্তর্যামী।
চিরে যেতে, যেতে যেতে
কিছু তাকে বুঝে পেতে
ডেকে উঠি, ‘নীলিমা
চাঁদ কেন ওঠে রোজ
নেই তার কোনো খোঁজ
কত দূর দ্রাঘিমা?
কত দূর ছড়ানো তোমার মোহন?
টের কি পায় কেউ তোমার গহন?’
চোখে চোখ টেনে নেয়, মুগ্ধতা তবু
আমারেই কেন দিলে জগতের প্রভু?
চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন
নীলিমা খাতুন তবু কেন ডাকলেন?
আমি যে তাহার ডাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাই
দেহ থেকে ছায়া খুলে ঘুরিয়া বেড়াই।
আমি যে ছায়ার মানুষ, সে তবে কার?
এই ভেদ বলো কেন বোঝা দরকার?























