অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরীন

অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরীন

পাপিয়া জেরীনের ৬ কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ০২, ২০১৯

দুর্যোগ

ঠোঁট-মেশিনে সেলাই হতে হতে ঠোঁট
হৃদিপদ্ম, নাভিমূল, সরোবর
একে একে নিভে যায় চোখ-চাঁদ-শিখা;

         আমি ভয়ে ভয়ে পাশ ফিরি
অবাঞ্ছিত তিল ঘেষে নামে যুদ্ধবিমান ,
খসে যায় কাঁটাতার, রেডক্লিফ লাইন।

ভাঙে লাইট হাউজ—
বাঁধ ভেঙে লোনাজলে ডুবে যায় নদী!

ঝড়

তোমার চোখের সীমায় জল-সমুদ্র
শিকড় ছুয়ে পালকের ভাসান,

আহ্! ডুবে যায়
একে একে ভিজে যায়
নাভি-নিতম্ব-প্রসূন;

খুলে দাও হাতকড়া—
আমি বরং খুঁজে দেখি
কোথায় উঠেছে ঝড়!

অভিসার

মৃত্যুর মত রাত নেমে এলে
আমি লাশ-ঘুম দিই
তুমি পতঙ্গ হও, ভেদ করো
প্রতিটি দেয়াল
এরপর মধুভাণ্ডে ভাসো

ঘুম ভেঙে গেলে
ভাঙা সিন্দুকে হাত পড়ে
দেখি, পাপড়ির মতো খুলে আছে
প্রতিটা দেরাজ, বিচ্ছিন্ন চন্দ্রহার
আর, ফলেরা নীল...দংশনে!

নদী

কৈলাস, প্রস্রবণের কোনো জলবিন্দুই
তোমার কাছে ফেরত যাবে না জেনে
আমি নদী হয়ে যাই

এ জল বেয়ে উঠে গ্যাছে চর, উভচর
নগরের পর নগর—
এ জলে ভাসে মীন, পরমাত্মা, জড়প্রতিমা

কৈলাস, বরফ কিংবা শিলার জর্জর আহুতির
পরম বিমোক্ষণেই বুক চিরে নামে ঢল,
সেই জল হয়ে আমি এই... এতদূর!

নদী কোনোদিন ফেরে না তার উৎসে
কৈলাস, এ কথা জেনেও আমি নদী হয়ে যাই...

একুশতম আঙুল

ওরা গিয়েছিল ট্রান্সিলভ্যানিয়ান পর্বতে
সমগ্র বল্কান চষে পায়নি তোমার ধাতব হাত
অথচ, আলপাইনে খনির ভিতর
তোমার একুশতম আঙুল আমার শরীরে
গেঁথে ছিল—
ধাতব ছুরির মতো।

ওরা দেখেছিল,
ভেড়ার দাঁতের ভিতর ঘাসের মিহি হাড়
আর আমার সোনালি চুলের শরীরে
তোমার পৌরব রোদ, সভ্যতার কালো ভ্রূণ;
পুরোনো হাড়গোড় আর দিনলিপি দেখে জেনেছিল—
দানিয়ুব আর কাস্পিয়ানের জলেজঙ্গলে আমরা দুজন লবণ ধুয়েছি
মিলিত হয়েছি অধীর সঙ্গমে,
ওরা তখনও সমগ্র ভূমধ্যসাগর চষে পায়নি তোমার
দুইশত সাততম হাড়,

অথচ, সে অদৃশ্য হাড় আমার শরীরে গেঁথে ছিল
ধাতব ছুরির মতো!

উত্থিত উত্থান

দেখেছি ভাস্কর
তোমার শরীরের ভিতর উত্থিত হার্পুন
তাক হয়ে আছে ফঁ-দ্য-গউম এর দেয়ালে দেয়ালে;

নিসর্গ থেকে টেনে তোমাকে করেছি টানটান
প্রতিটা মোচড়ে, ভাঙনে— প্রতিটা বিন্দুর উলম্ব রেখায়,
উৎক্ষিপ্ত জলের পিঠটানে বেঁকে গেছে তোমার চারপায়া জলপোকা!

তোমাকে দাঁড় করায়ে নিচ থেকে দেখেছি, ভাস্কর
চাপা পড়ে আছে পলিযুগ, অমসৃণ ঢেলা, টেরাকোটা নির্মোক, বিরল ফণী
তার উপরে নাভিকণ্টক—
যেন কেশর সমেত ঝুঁকে আছে সবুজ জামরুল;

তোমাকে উপুড় করায়ে দেখেছি
মোসেসের ইশারায় দুই ভাগ হয়ে আছে নাইল
গলেছে ছাতিম দুধের কষ,
সর্পগন্ধার মতো বেঁকে আছে রোম, সেজদায়।

নিসর্গ থেকে টেনে তোমাকে দাঁড় করায়ে রেখেছি, ভাস্কর—
প্রতিটা বিন্দুর উলম্ব রেখায়,
তোমার ভিতর উত্থিত হার্পুন তাক করে আছে
ফঁ-দ্য-গউম এর দেয়ালে দেয়ালে!