প্রণব আচার্য্যের কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৯

ভ্রমর

ভ্রমর কি শুধুই পতঙ্গ?
পূবের ঠাকুর, তুমি তো দেখেছ তারা কীরূপে হাসেন। রক্তজবার কাছে নত হয়ে রাত নামে, ভৈররীও আসে... চলে যায় শরৎ।
এই গোলার্ধে কালোদের গান, ধবল মানুষের স্নান— তুমি তো দেখেছ সবই।
তাঁর হাসি পতঙ্গ বিভ্রাটে পূবে ও পশ্চিমে কোথাও টেনেছে দাগ। কেউ দেখে, কেউ দেখেনি...
শুধু ভ্রমর-কান্নায় কাঁদে বেহুলার বাংলা

পতন

তুমি জমেছো মেঘ— কবে থেকে জমতে শুরু করেছ
গম্ভীর পতনের দিকে সময় কেবলি নির্লিপ্ত দর্শক...
যে মেঘে বৃষ্টি হয় তাকে বর্ষণমেঘ বলে লোকে
আমি বলি পতন তোমাকে—

আমার মাটির বিছানা-বালিশ ধুয়ে মুছে
যাবার আগে নিশ্চিন্তের শেষ নিদ্রা
শেষ কোলাহল শুনে দাঁড়িয়ে থাকবো
তোমার তুমুল আক্রমণে একা অপরাজেয়

তুমি বড় জোর সঙ্গহীন করে বয়ে নিয়ে যাবে
ধুলো-মাটি-সম্পর্কের স্মৃতিদাগ
আমি তবু দাঁড়িয়ে শেষতম জলে
লিখে দেবো মরুদাগ, প্রতিভার ক্রোধ

বিষাদ চোখে এসে পড়ে সূর্যাস্তের রঙে
নতজানু হয়ে অতঃপর শিরদাঁড়া করা
পৃথিবীর বিক্ষুব্ধ প্রণয় যুগল,
মেঘ-মিশ্রিত দেহবাসর,
সবার আগে চাই অবাধ বিধান

তুমি কেন ভাসিয়ে দিতে পারো না
সামাজিক আগাছা-বিধান
নাকি তুমিও অঞ্জন ঝটিকা বলে
কেবলি সঙ্ঘ আর সঙ্গের তফাত ভুলে যাও

 আমার পিতৃত্বের বাসনা ধুয়ে যাক শ্রাবণে
তোমার রজরক্ত রূপকথা হয়ে থাক
ওষ্ঠ অথবা হৃদয়ের কম্পিত চাওয়া
ভিন্ন চিতার ছাই হয়ে ভাসবে জলের
আদরে— এ-ই শেষতম চুম্বনের দীর্ঘ উপায়;

আমাদের পৃথিবীতে বিশুদ্ধ বর্ষা আসেনি এখনো

দি ডার্কেস্ট নুন

সাদা কাশবন ঘেঁষে সব সময় নদী কিংবা
খাল, নিদেনপক্ষে নালা বয়ে যায়;
অথবা এভাবেও বলা যায়—
নদী-খাল-নালার ধারেই কেবল ঘাঁসফুল ফোঁটে;

একদিন চৈত্রের রাতে নিশির ডাক শুনে সেই যে বেরিয়েছি
তারপর আর ফেরা হয়নি;
সেই গাঙচিল—যার গলার স্বর নকল করতে চেয়েছিলাম,
তাকে খুব মনে পড়ছে;

কার জড়ানো বাহু অবহেলায় ছেড়ে এসেছিলাম—মনে পড়ছে না।
কিংবা জননীর মুখচ্ছবিও গেছি ভুলে।

হিজল গাছের নিচে খয়েরি পরাগের মাখামাখি
হিমরাত্রির মতো চুঁইয়ে পড়ছে সহজ অন্ধকার
বিভ্রান্ত শরীরে সূর্য ছড়ায় বিস্বাদ লালা;

জননীর নিকট ফিরে যেতে লোভ হয়
অথচ ভুলে গ্যাছি কাশবনের পথ

তবু ছুটি উত্তর দক্ষিণ—
ফেনিল রৌদ্রের এই উড়োউড়ি থেমে যাক
অথবা, এই দুপুর এত অন্ধকারাচ্ছন্ন কেন?

পাঁজর

 

অশ্বারোহীর বিকেল টগবগিয়ে নামে। এই সন্ধ্যাকাজল ধেয়ে যাবে নিশুতি শেওলার দিকে। আদিম পৃথিবীর ঘাসগুলো— তাদের পাঁজরের ঘ্রাণ— চেয়ে আছে বৃষ্টির মতো মনযোগী বাসনায়।

প্রতিদিন চিহ্ন দিয়ে যাও— রোদ। মাঝি ও জলের অতীতচারী মূল্যবোধ ভেসে উঠবে, ঢাকার গৃহিণীদের মতো, ফুলে-ফেঁপে। বয়স্ক চাঁদের নিকট কার শরীরের রোদ জ্যোৎস্না হয়, কার অন্তর্বাসে লুকিয়ে থাকে আমার পাঁজর?

কাকজাগা রাত

আমি কাকের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি।
প্রতি অন্ধকারে একটি কাক আমার আশে পাশে অবস্থান করে। পিতামহের শবের ভয় যেমন শৈশব ঘিরে থাকতো, তেমনি আমার যৌবন ঘিরে রয়েছে একটি নিশিজাগা কাক। তার উপস্থিতি প্রথম টের পাই কৌশিকী অমাবস্যায়। বয়স্করা এখনও একে আঁবইস্যা বলে। এই রাতে হাড়ের ভেতরে পুরোনো ব্যথাসমূহ জেগে ওঠে। তাই সেইসময় একাকী জমাট অন্ধকারে সেঁধিয়ে যাওয়া রীতি।

এক রাতে এই রীতি পালনের প্রাক্কালে প্রথম কাকের অস্তিত্ব টের পাই। ভয় পেয়ে ব্যথা ভুলে যাই; ভুলে যাই আমি এখন যুবক, পরম বিস্ময়ে নিজের ভেতর বার্ধক্যের মহিমা লক্ষ্য করি। তবে এ বার্ধক্যর স্থায়ীত্ব বেশিক্ষণ ছিলো না, কাকটি স্থায়ী হয়ে গেল।