প্রদীপ করের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জুন ০৪, ২০১৯

আত্মীয়

বাসযাত্রায় তাকে দূর থেকে দেখি। সবুজ ধানমাঠের বিপ্রতীপে
সে একা। প্রতিদিন যাতায়াতে নিয়তি-নির্দেশের মতো দেখি,
তাকে স্পর্শ করে থাকে রৌদ্র-লাঞ্ছিত ভাঙা হাওয়া
অন্নের বিস্তৃত প্রান্তরে মগ্ন সুফি সাধকের মতো
পোড়োবাড়িটি
নির্বান্ধব। স্বজনহীন। তাকে নিরাশ্রয় করেছে সংসার।

যাত্রা উৎসব ভেঙে দরজা জানলা খুলে নিয়ে গেছে কেউ
অর্গলবিহীন ঘর যেন বা উঠোন। এখানে সুদূর এসে মাঝে মধ্যে
বৃষ্টিতে নাচে।
দূর থেকে দেখি, শরীরে ধ্বংসক্ষত ঢেকে, স্বজন সন্ধানে স্থির
মায়াপতাকার সংকেতে আমাকে সে নিয়মিত ডাকে।

দূর্বাঘাসের কান্না অনুসরণ করে অসমাপ্ত আয়তনে হাজির হয়েছি।
ধ্বংস অবশেষ দেখে চিনেছি তার বিগত বৈভব
সেও তখন, নিগূঢ় অস্ফুটে জানিয়েছে, যা কিছু ঘটেছে কিম্বা এখনো ঘটতে পারে যেসব ঘটনা!

তার ক্ষয়ে যাওয়া স্বরের কিনারে এখনো অহং দেখি, টং শব্দে বাজে
মাঝে মধ্যে, প্রবল বর্ষণরাত্রে, কেঁপে ওঠা বিদ্যুতের আলোয়, এখনও
সত্যস্বরূপ ফিরে পায়।

ঘন ও নিচু স্বরে জিগ্যেস করি, মুক্তি কীসে?

কার্নিশে চোখ যায়, বাহির আশ্রয়ে, একটি অশ্বত্থচারা
শিকড় বিস্তার করে আছে। তার কচিপাতায়
অস্তসূর্যের শান্ত আলো ছুঁয়ে আছে
                                       আহুতির আত্মীয়তায়।

স্বীকারোক্তি

সাতশো বছরের পুরোনো এক আদিবাসী-মুখোশ পরে তোমার সামনে বসে আছি। কথা বলছি অন্তত হাজার বছরের পুরোনো এক চিত্রিত স্বরে। একটু আগে যে গান শোনালাম, তা আসলে শ্যাওলাধরা উত্তরজনপদের, এক মাহুত বন্ধুর প্রাচীন পদাবলি। এই যে, লকেট, গলায় ঝুলছে, তুমি জানো না, এটা প্রায় চারশো বছরের পুরোনো, ফরাসিদের ফেলে দেয়া এঁটো; আমি মেজে ঘষে চকচকে বানিয়ে নিয়েছি।
এতক্ষণ আমার যে কবিতাগুলি নিয়ে কথা বলছিলে, সেগুলি আসলে তুকারামের। বহু বহু বছর আগে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। সামান্য উত্তাপ আর বিদেশি কালিতে টুকে এনে রেখেছি খাতায়। কিছুই আমার নয়।
কলোনি গলিতে এই অল্প আলোর রেস্তোরাঁয় তোমাকে যে এসব বলছি, এসবও বহুপূর্বে উপনিষদে বলা হয়ে গেছে!

আমি শুধু বহন করে বহন করে বহন করে নব্বই দশকে এসে গেছি!

রাজকুমারীর গল্প

বহুদিন বাইরে বেরোওনি তুমি
ঘরভর্তি বই, সিনেমা, গান ও ছবির ভিতর নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছো
                         আলাপে, বিস্তারে।
বাইরে অঝোর বৃষ্টিতে যখন ঝাপসা চারপাশ
রবিঠাকুরের বর্ষার গানে, তখন, খোলা পোশাকে দাঁড়িয়ে রয়েছো
                               তুমি!
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠসব চিত্রকরদের ডেকে নিয়ে এসে
ঘরের ভিতরেই আঁকিয়েছো দীর্ঘশ্বাসে তৈরি এক নদী
মাঝে মাঝেই আকুল হয়ে ঝাঁপ দাও। সাঁতার জানো না
নদীটিই তোমাকে বইয়ে দেয় একটি ভাঙন থেকে সহস্র ভাঙনে।

শুধু আশ্বিনের অদ্ভুত সকালে, আয়নার মতো, যখন ঝকঝক করে
সানাই আকাশ,
                ছন্দ পতনের মতো ভেঙে পড়ো কাঁচের স্বভাবে।

আমি সে ঝনঝন শব্দে ছুটে যাই, দেখি
লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো অমন সোনার অঙ্গে ছোপ ছোপ জমে আছে
শিল্পপোড়া ছাই। চোখে গনগনে শূন্যতা। চুলে
এলোমেলো হয়ে আছে হাসির চিৎকার

এমন উন্মাদিনীর ভয়ে দৌড়ে বাইরে আসি। দেখি
মধুপূর্ণিমার রাত। বায়ু বহন করছে মধু। বৃক্ষের ভাস্কর্য বেয়ে গড়িয়ে নামছে
চন্দ্রের স্নান। ভুবনমৃত্যুর ক্ষতেও গড়িয়ে পড়ছে মধু, মধু, মধু

ভীষণ সুখি ও সামগ্রিক হয়ে রয়েছে পৃথিবী।

নিদাঘ

সকলেই চুপচাপ। শুধু হাওয়া
বইছে গুমোট স্বভাবে। বাঁশপাতা
কাঁপছে তিরতির... অশ্বত্থপাতাও
সকালে বাচ্চা ছেলেটি উঁচু করে ছুঁড়ে
দিয়ে গেল সমস্ত সংবাদ। তবু
মানুষ চুপচাপ। ধু ধু হাওয়া
বুকের ভিতরে। প্রতিদিন আমার শরীরে
জমা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ অপরাধীর লাশ
অগ্নি র্স্পশ করো আমার নিঃশ্বাস...

সনাতনী
উৎর্সগ: সনাতন দাস বাউল

সাধনসমাধির অম্লান দূরত্বে, তাঁর একতারা, একা...
খানিক আগেও অস্তগামী সূর্যের রোদ তাকে ছুঁয়েছিল। এখন কমলা এক আভা
ছড়িয়ে রয়েছে অপরূপ তৃষ্ণার মতো, নির্জন সংগীতের স্নানে।

একটিই তার, এতদিন সহস্র ছন্দে জ্বরা জয় করে আবহমান অসীমে বেজেছে
আজ একা। বারান্দায়।

তিনটি চড়ুই, বসে উড়ে গেল। তাদের কিচির মিচির মিশে গেল
অন্যমনস্ক এই মুহূর্তের ভিতর...
সন্ধের অল্প একটু আগে মাধুকরী সেরে ফিরলো ফাল্গুন বাতাস
তখনই, একাকিত্বে কেঁপে উঠল
             বেজে উঠল সনাতন দাসের একতারা...