বাশার মাহফুজের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জুন ২৪, ২০১৯

চিত্রশিল্পীর মুখ

অনেক বছর হয় আমি ছবি আঁকি না
ছবি আঁকতে গেলে ছবি আমাকে এঁকে ফেলে
আর সাদা ক্যনভাসে রঙিন হয়ে ওঠে আমার মুখ।
আমি স্থির হয়ে যায়
তুলির আঁচড় আমাকে বিস্তৃত করে
আমার শরীরের রঙ পাল্টে যায়
ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক-এক করে যাবতীয় পাপনামা!

ইচ্ছেগুলো আমাকে কামড়ে দেয় রোজ
রঙতুলি আমাকে টানে
ক্যানভাস আমার সাথে কথা বলতে চায়
আমি তবু ছবি আঁকতে যাই না
আমি তবু ছবির দিকে যাই না।

বুকেতো সেই কবে করেছি আফিঙের চাষ
আজ তা নেশা হয়ে গেছে সারা শহরময়
গাঞ্জার কলকে থেকে যে ধোঁয়া বের হয়
তার সঠিক মূল্যায়ন করে চলে জলসাঘর
তার সঠিক মাতলামি করে চলে দেশ!
তবু ছবির কাছেই হাত চলে যায়
ছবির কাছেই মগজ চলে যায়
আর ছবি আঁকতে গিয়ে ছবি এঁকে ফেলে আমার মাতলামি
আমার লাম্পট্য
আমার ধোঁকাবাজি
আমার ধর্ষক মুখ!

অনেককাল হলো আমি আর ছবি আঁকতে পারি না
ছবি আমাকেই এঁকে ফেলে!

বাবা

লাটাই ঘুড়ি নিয়ে বাবা আকাশের দিকে হাঁটেন
ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে বাবা নিজেই আকাশ হয়ে যান
আমি তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে
ঘুড়ির দিকে
আর আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে
মেঘ হবি আষাঢ়ের মেঘ
ভাসবি, আয় আকাশ সমুদ্রে ভাসাভাসি খেলি।

লাটাই নিয়ে আমি ফিরে আসি মায়ের কাছে
মা আমাকে ওড়ার মন্ত্র শেখান
তবু আমি উড়তে পারি না।
মই নিয়ে আমি আকাশে উঠতে চাই
বাবা বলে, পড়ে গেলে ব্যথা পাবি খোকা
আমার আর আকাশে ওঠা হয় না।

বহুবার ভেবেছি, দুটো ডানা হলে আমি আকাশ হতে পারবো
বাবার সাথে ছুটে-ছুটে ঘুড়ি ওড়াবো সারাদিন
বাবা গল্প বলবেন, আমাদের রঙিন পাখার গল্প
আমাদের মনুষ্য জন্মের গল্প
আমাদের অমানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

বাবা আকাশে বসে ঘুড়ি বানান লাল নীল বহু রঙের
আর আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে মাকে বলি
বাবাতো আমার জন্য অনেকগুলো ঘুড়ি আনবেন!

মাছ হয়ে যাচ্ছি

বাবা মাছ কিনতে যায় আমি তার আঙুল চেপে ধরি।
বাবা মাছের দাম করতে থাকেন আর পাশ থেকে একজন চেয়ে থাকেন মাছের দিকে। মাছ নিয়ি বাড়ি ফিরি আমি আর বাবা। আমাদের সাথে বাড়ি ফেরে সূর্য। বাড়ি ফেরে অন্ধকার। চোখের নিচে রাত নিয়ে মাছ ভাজে মা। মাছটা কড়াইয়ের ভেতর নড়ে উঠে। মা বাবাকে ডাকেন। মাছটা কড়াই থেকে নদীতে যেতে চায়। বাবা আটকাতে চান। মা চেয়ে-চেয়ে দেখে আমি মাছ হয়ে যাচ্ছি!

সম্পর্ক

সাঁকোটা পুরনো। খসে পড়ছে বাঁশের চাটাই
বয়স্ক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে এক পায়ে
তার পার হবার তাড়া নেই
তবু তাকে ঠেলছে দুজন দুদিক থেকে!

নিচের খাদে জলেরা চলে যাচ্ছে নদীর কাছে
সম্পর্ক জল হতে গিয়ে দেখে, দীর্ঘশ্বাস নেই
বিচলিত পায়চারিও নেই। নেই ঘুম!

সস্তা রঙের মতো প্রলেপ উঠে যাচ্ছে
সস্তা কথার মতো সস্তা হয়ে যাচ্ছে রাস্তা!
সম্পর্ক হাঁটতে চায়
সম্পর্ক সাঁকো পার হতে চায়
সম্পর্ক নদী হতে চায়
তবু ভাঙা চাটাইয়ের মতো খসে যাওয়া শরীর নিয়ে সেও দাঁড়িয়ে থাকে
তারও তো বয়স কম হলো না!

হাত

হাতটা চলে গেছে প্রজাপতির ভাঙা পাখার কাছে
হাতটা চলে গেছে রাস্তায় ফুটপাথে আবর্জনায়
একদিন অবহেলায়
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে
মধ্যরাতে কারো ব্যালকোনিতে ফিসফাসে।

হাতটা চলে গেছে আগুনের কাছে। গোরস্হানে। বেশ্যালয়ে।
আপনি হাত চেয়েছেন
স্পর্শ চেয়েছেন
অধ্যাপিকা, হাতবিহীন এই আমাকে দেখে আপনি আতকে উঠেছেন।

শরীর খুঁজতে গিয়ে হাতকে অসংখ্যবার আপনি ছুঁতে চেয়েছেন মৃত আঙুলপাড়ায়!